প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৪ জুলাই, ২০২৬
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল বর্তমান জুলাই ২০২৬-এ এক অভূতপূর্ব ও বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। অবিরাম জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলাসহ সমগ্র চট্টগ্রাম বিভাগে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এই আকস্মিক বন্যা ও পাহাড় ধসের ঘটনায় এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৪৪ জন মানুষ এবং প্রায় ১০ লাখের বেশি নাগরিক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত বা পানিবন্দি অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। এই চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের সমান্তরালে অঞ্চলটির দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভূমি বিরোধ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও সংবেদনশীল করে তুলেছে। বর্তমান সময়ের প্রধান দৃশ্যমান সংকটটি হলো আকস্মিক বন্যা ও এর অবধারিত ফলশ্রুতি হিসেবে সৃষ্ট ব্যাপক পাহাড় ধস। মাত্র কয়েক দিনে কয়েক শত মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছ। এই অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ছে এবং পাহাড়ের পাদদেশে বা ঢালু অংশে বসবাসকারী শত শত পরিবার মাটির নিচে চাপা পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সমতল ও উপত্যকা অঞ্চলগুলো সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়ে পড়েছে, যা পাহাড়ি জনপদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ভয়াবহতায় পার্বত্য অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ আজ সম্পূর্ণ আশ্রয়হীন ও গৃহহারা হয়ে পড়েছেন। আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে মাটির ঘর ও কাঁচা বাড়িগুলো নিমেষেই ভেসে গেছে, যার ফলে দুর্গতরা খোলা আকাশের নিচে বা স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জরুরি ভিত্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম বিপর্যয় এই সামগ্রিক সংকটকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, কারণ পাহাড় ধসের ফলে প্রধান প্রধান সড়কগুলো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক এবং সাজেকগামী সড়কের বিভিন্ন অংশ মাটির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বা ধসে যাওয়ায় দূরবর্তী অঞ্চলের সাথে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার অবধারিত ফল হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম উপজেলা ও পাড়াগুলোতে এখন তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় চার-পাঁচ দিন ধরে ঘরের চুলা জ্বলছে না এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে মানুষ অনিরাপদ উৎসের পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে, যা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জরুরি খাদ্য সহায়তা এবং শুকনো খাবার দ্রুততম সময়ে পৌঁছানো না গেলে এই অঞ্চলে অনাহারজনিত মানবিক বিপর্যয় আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সমান্তরালে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী ও ঐতিহাসিক সমস্যা হলো জট পাকিয়ে থাকা ভূমি বিরোধ। পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা এবং আইনি লড়াই দশকের পর দশক ধরে এই অঞ্চলের সামাজিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করছে। দুর্যোগের সময়ে যখন মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়, তখন এই ভূমি বিরোধের বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, কারণ অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের পৈতৃক জমি বা ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় ভোগেন।
পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং দুর্গম সীমানার কারণে এখানকার সার্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকি সব সময়ই অত্যন্ত উচ্চ ও স্পর্শকাতর। চলমান দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহল দুর্গম সীমান্ত এলাকায় তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতে পারে, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সামরিক বাহিনীকে যখন জানমাল রক্ষা ও উদ্ধার কাজে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে, তখন এই অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতি বজায় রাখা একটি দ্বিগুণ চ্যালেঞ্জ। সংকটকালীন এই পরিস্থিতিতে পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা ও প্রবণতা অনেকাংশে বেড়ে যায়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষরা অনেক সময় মূলধারার ত্রাণ ও পুনর্বাসন সুবিধা থেকে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বঞ্চিত হন, যা এক ধরনের পরোক্ষ মানবাধিকার সংকট তৈরি করে। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ, নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই মানবিক সংকটের সঠিক সমাধান সম্ভব।
চলমান বন্যা ও পাহাড় ধসের ফলে পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতির মূল ভিত্তি তথা কৃষি খাতের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। জুম চাষের খেত, উপত্যকার আমন ধানের বীজতলা এবং বিস্তীর্ণ শাকসবজির বাগান বন্যার পানিতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত বা পাহাড়ের মাটিতে চাপা পড়েছে। যা স্থানীয় কৃষকদের সম্পূর্ণ নিঃস্ব করে দিয়েছে। এই বিশাল কৃষি ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে কৃষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণ, বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ এবং বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।
এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণের প্রথম ও প্রধান করণীয় পদক্ষেপ হলো অত্যন্ত দ্রুত গতিতে জরুরি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড এবং ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের দক্ষ দলগুলো ইতিমধ্যে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় উদ্ধার কাজে নিয়োজিত হয়েছে। প্রতিটি দুর্গম পাড়ায় উদ্ধারকারীদের পৌঁছানো নিশ্চিত করতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও যুব সমাজকে এই প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
উদ্ধার কাজের পরপরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো দ্রুত এলাকায় পর্যাপ্ত ও সুষম ত্রাণ বিতরণ নিশ্চিত করা। ত্রাণ কার্যক্রমে যেন কোনো ধরনের অনিয়ম বা রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব না ঘটে এবং দুর্গম পাহাড়ের প্রতিটি অভাবী পরিবার যেন শুকনো খাবার, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানি পায়, তা কঠোরভাবে মনিটর করতে হবে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও), করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সাধারণ সামর্থ্যবান নাগরিকদেরও এই ত্রাণ কার্যক্রমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসা উচিত। দুর্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যাপ্ত এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত স্থায়ী ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সংকটে হাজার হাজার মানুষ বিদ্যালয়গুলোতে আশ্রয় নিলেও দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে পৃথক এবং টেকসই আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজন। এই কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত স্যানিটেশন, নারী ও শিশুদের জন্য পৃথক কক্ষ এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে যেন মানুষ চরম বিপদের সময়েও একটি মানবিক পরিবেশে থাকতে পারে।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক