ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

৩৬ শতাংশের নীরব বিদায় : কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীরা

জুবাইয়া বিন্তে কবির
৩৬ শতাংশের নীরব বিদায় : কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীরা

কোনো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার তরুণ প্রজন্মের জ্ঞান, দক্ষতা ও স্বপ্নের ওপর। যে জাতি তার শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধরে রাখতে পারে, সেই জাতিই আগামী দিনের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সভ্যতার নেতৃত্ব দেয়। আর যে রাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা মাঝপথেই শিক্ষার মূলধারা থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে, সেখানে উন্নয়নের সুউচ্চ অট্টালিকাও একসময় নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সামনে এমনই এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটের দরজা খুলে দিয়েছে। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। সংখ্যার ভাষায় এটি প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ তরুণ-তরুণি; কিন্তু বাস্তবে এটি সাড়ে পাঁচ লাখ অসমাপ্ত স্বপ্ন, সাড়ে পাঁচ লাখ সম্ভাবনার অপচয় এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।

পরিসংখ্যান কখনও কখনও খুব নির্মম হয়। সেখানে চোখের জল, অপূর্ণ স্বপ্ন কিংবা একটি পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প ধরা পড়ে না। দুই বছর আগে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। অথচ এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে মাত্র সাড়ে ৯ লাখ। অর্থাৎ পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগেই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে গেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী। এরপর যারা ফরম পূরণ করেছে, তাদের মধ্যেও প্রতিদিন হাজার হাজার পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত থেকেছে। প্রতিটি অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর পেছনে রয়েছে একটি আলাদা গল্প—কোথাও দারিদ্র্য, কোথাও বাল্যবিবাহ, কোথাও পরিবারের উপার্জনের দায়, কোথাও আবার হতাশা, মানসিক চাপ কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা। তাই এই সংকটকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বিচার করলে চলবে না; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় অগ্রগতির প্রশ্ন। কেন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীরা? কোনো শিক্ষার্থী একদিনে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। তার ঝরে পড়ার পেছনে দীর্ঘদিনের আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংকট কাজ করে। মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে সন্তানের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক পরিবারে কলেজে পাঠানোর চেয়ে সন্তানকে কাজে পাঠানোকে বেশি প্রয়োজনীয় মনে করা হচ্ছে। কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে, কেউ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আবার কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যে পরিণত হচ্ছে। এভাবেই ধীরে ধীরে বইয়ের ব্যাগের জায়গা দখল করে নিচ্ছে শ্রমের বোঝা। সবচেয়ে বড় কথা, বহু তরুণের কাছে শিক্ষা আর নিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার দায় শুধু পরিবার বা অর্থনৈতিক বাস্তবতার নয়; শিক্ষাব্যবস্থারও রয়েছে বড় দায়। আমাদের শিক্ষা এখনও অতিমাত্রায় পরীক্ষাকেন্দ্রিক, মুখস্থনির্ভর এবং নম্বরপ্রধান। শেখার আনন্দ, সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশের চেয়ে পরীক্ষার ফলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টেস্ট পরীক্ষাকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যে দুর্বল শিক্ষার্থীরা মূল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগই হারিয়ে ফেলে। অথচ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়া নয়; তাকে শেখার উপযোগী করে গড়ে তোলা। শিক্ষা যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়, তবে ঝরে পড়ার এই মিছিল আরও দীর্ঘ হবে।

উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা উচ্চশিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের অন্যতম প্রধান সোপান। এখান থেকেই একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা কিংবা পেশাগত জীবনের পথে এগিয়ে যায়। ফলে এই স্তরে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া মানে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি তৈরি হওয়া। একটি দেশ তখনই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে পারে, যখন তার তরুণ জনগোষ্ঠী শিক্ষিত, দক্ষ ও উৎপাদনশীল হয়। কিন্তু যদি প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী মূলধারার শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে জনসংখ্যাগত সুবিধা (Demographic Dividend) একসময় জনসংখ্যাগত চাপেই পরিণত হবে। উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন তখন শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে । বাংলাদেশে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম বড় কারণ এখনও দারিদ্র্য ও বাল্যবিবাহ। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে বহু কিশোরীর শিক্ষাজীবন থেমে যায় বিয়ের পিঁড়িতে বসার মধ্য দিয়ে। গত বছর অনুপস্থিত এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য অংশের পরীক্ষার্থী বাল্যবিবাহের কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। একটি মেয়ে যখন অল্প বয়সে বিদ্যালয় ছেড়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হয়, তখন হারিয়ে যায় শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়; হারিয়ে যায় একজন সম্ভাব্য শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী কিংবা দক্ষ উদ্যোক্তা। একইভাবে অর্থনৈতিক সংকটে বহু ছেলে শিক্ষার্থীও বই ছেড়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কেউ গ্যারেজে, কেউ দোকানে, কেউ নির্মাণশ্রমিক, আবার কেউ বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নে শিক্ষার পথ থেকে সরে যাচ্ছে। এভাবে দারিদ্র্য ও সামাজিক বাস্তবতা মিলেই শিক্ষার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে হাজারো স্বপ্নের।

একসময় উচ্চশিক্ষা ছিল সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সাফল্যের সবচেয়ে বড় সোপান। কিন্তু আজ বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেও দীর্ঘদিন চাকরি না পাওয়ার অসংখ্য উদাহরণ তরুণদের মনে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি করেছে।

অনেকের কাছে প্রশ্ন জাগছে- দীর্ঘ ১৬ বা ১৮ বছর লেখাপড়া করেও যদি কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হয়, তবে এত দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রার মূল্য কোথায়? শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে এই বিচ্ছিন্নতাই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থীকে নিরুৎসাহিত করছে। ফলে তারা উচ্চশিক্ষার পরিবর্তে দ্রুত আয়ের পথকেই বেশি বাস্তবসম্মত মনে করছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসের সংকটও।

বর্তমান প্রজন্ম এমন এক সময়ে বেড়ে উঠছে, যেখানে প্রতিযোগিতা, সামাজিক প্রত্যাশা এবং ডিজিটাল বিভ্রান্তি একসঙ্গে তাদের মানসিক জগতে প্রভাব ফেলছে। পরীক্ষার চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং সামাজিক তুলনার সংস্কৃতি বহু শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম এবং দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের কারণে মনোযোগ ও পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। অথচ দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয় ও কলেজে এখনও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং কিংবা মনোসামাজিক সহায়তার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নীরবে ভেঙে পড়ছে, আর সেই ভাঙনের শেষ পরিণতি হচ্ছে শিক্ষার মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়; বিশ্বের অনেক দেশই এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। তবে তারা সমস্যাটিকে শুধু শিক্ষা খাতের বিষয় হিসেবে দেখেনি। ভারত দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও ডিজিটাল শিক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছে; নেপাল ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের আগেভাগে শনাক্ত করার ব্যবস্থা চালু করেছে; শ্রীলঙ্কা তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষা সংস্কারে জোর দিয়েছে; পাকিস্তান কারিগরি শিক্ষা ও শিক্ষা ভাউচার কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেছে।

এসব অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা হলো- শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ করতে হলে শিক্ষা, অর্থনীতি, সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানসিক স্বাস্থ্য- সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী যখন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না, তখন শুধু একটি পরীক্ষার খাতা ফাঁকা থাকে না; ফাঁকা হয়ে যায় একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্র হারায় একজন দক্ষ নাগরিক, পরিবার হারায় উন্নত জীবনের আশা, আর সমাজ হারায় একটি উৎপাদনশীল শক্তি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই সম্পদকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে উন্নত, জ্ঞানভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন পূরণ হবে না। তাই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রতিটি ঘটনা শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্বেগের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, সমাজনীতি এবং জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। কারণ, আজ যে শিক্ষার্থী হারিয়ে যাচ্ছে, আগামীকাল তার অভাবই দেশের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই সংকট মোকাবিলায় প্রথম প্রয়োজন প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান। জাতীয় পর্যায়ে একটি তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা (Early Warning System) চালু করে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের আগেভাগেই শনাক্ত করতে হবে।

জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত