ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

প্রাথমিকের পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে খেলাধুলা

প্রাথমিকের পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে খেলাধুলা

২০২৭ সাল থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলাকে জাতীয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করছে সরকার। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ দেশে প্রায় ১১ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনও খেলার মাঠ নেই। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৫২টিরই নিজস্ব মাঠ নেই। মাঠবিহীন এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার ব্যবস্থা কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৯টি এবং বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৫৩ হাজার ৩৮টি। সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ১০ হাজার ৭৪০টিতে কোনো খেলার মাঠ নেই। আর রাজধানী ঢাকার ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৯০টিতে নিজস্ব মাঠ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাতীয় পাঠ্যক্রমে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক বিকাশ, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং দলগত কাজের দক্ষতা বাড়বে। একইসঙ্গে বিদ্যালয়ভিত্তিক খেলাধুলার সংস্কৃতিও আরও শক্তিশালী হবে।

গত ১৫ মে বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ না থাকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘর। জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত ‘শিশুর নিরাপদ জীবন : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে সংগঠনটি জানায়, খেলার মাঠের অভাবে শিশুরা মুঠোফোনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ছে এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারছে না। এর ফলে তারা মানসিক বৈকল্য নিয়ে বেড়ে উঠছে। পাশাপাশি ধর্ষণ, পাচার, মানসিক নির্যাতন, অপুষ্টি ও শিশুশ্রমের মতো নানা ঝুঁকির মুখেও পড়ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, শিশুদের ক্রীড়ামোদী করে গড়ে তুলতে খেলাধুলাকে জাতীয় পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

গত ৪ জুন মিরপুরের ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট (বালক-বালিকা) ২০২৬’-এর জাতীয় পর্যায়ের খেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশুদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই শিশুদের ক্রীড়ামোদী করে গড়ে তুলতে খেলাধুলাকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

গত ২৮ জুন সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চতুর্থ শ্রেণি থেকে জাতীয় পাঠ্যক্রমে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে মাঠের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাসহ একগুচ্ছ নির্দেশনা দেয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। এর আগে গত ১৬ মার্চ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্তের আলোকে দেশের সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেয় অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়, যেসব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ রয়েছে, সেগুলো খেলাধুলার উপযোগী করে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় চাহিদা নিরূপণ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ পাওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি যেসব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাঠ নেই, সেগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে বিস্তারিত তথ্যসহ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।

যেসব বিদ্যালয়ের নিজস্ব মাঠ নেই, সেসব ক্ষেত্রে আশপাশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি মালিকানাধীন মাঠ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবহারে সমঝোতা বা চুক্তির উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া মন্দির, মসজিদ, খালি জায়গা, পতিত জমি কিংবা অন্য কোনো সরকারি সংস্থার মাঠ থাকলে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় যৌথভাবে খেলাধুলার আয়োজনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অধিদফতর জানিয়েছে, যেসব বিদ্যালয়ে মাঠের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়, সেখানে বরাদ্দ করা অর্থ দিয়ে দাবা, ক্যারামসহ বিভিন্ন ইনডোর গেমসের সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং প্রতিদিন পাঠদান শেষে ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে বিদ্যালয়ের মাঠ শিশুদের খেলাধুলার জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর বলেন, ‘২০২৭ সাল থেকে এটি পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে, বিশেষ করে শহরের বেশিরভাগ স্কুলে খেলার মাঠ নেই। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনা হবে। বইয়ের মাধ্যমে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি বাস্তব অনুশীলনের বিষয়টিও নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে। তবে ২০২৭ সালের মূল বই এরই মধ্যে প্রস্তুত হয়ে গেছে। তাই এবার মূল বইয়ের সঙ্গে এটি যাচ্ছে না। কিছুটা সময় নিয়ে পরে একসঙ্গে বা আলাদাভাবে সংযোজন করা হবে।’ প্রায় ১১ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ না থাকলে সরকারের সিদ্ধান্ত কীভাবে বাস্তবায়ন হবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, ‘এটি নীতিগত সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই। এটি মন্ত্রণালয়ের বিষয়। অধিদপ্তর বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে।’

গত ৮ জুন জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ দিয়ে খেলার মাঠ দখলমুক্ত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, ইট-পাথরের ব্যস্ত নগরে বন্দি শিশু-কিশোরদের মোবাইলের ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে বের করে খেলার মাঠের মুক্ত পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সব বিভাগীয় ও জেলা শহরের খেলার মাঠ ও পার্ক দখলদার এবং মাদকসেবীদের কবল থেকে মুক্ত করে জনসাধারণের জন্য নিরাপদ করার প্রস্তাব দেন। জবাবে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মাঠ ও পার্ক পুনরুদ্ধার এবং আধুনিকায়নে সরকার বদ্ধপরিকর। ইতোমধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে উচ্ছেদ ও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে আন্তঃবিদ্যালয় ফুটবল ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার গতি বাড়িয়েছে। ২০১৮ সালের ২৯ মে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ খেলাধুলার উপযোগী করতে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এর আগে ২০১৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ দখলমুক্ত করে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার উপযোগী করে গড়ে তুলতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) প্রস্তাব দেয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ খেলাধুলার উপযোগী করে গড়ে তুলতে নির্দেশনা জারি করলেও তার সুফল পাওয়া যায়নি। গত ১৬ জুন জাতীয় সংসদে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক জানান, দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ৮ থেকে ১০ বিঘার একটি উন্মুক্ত খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি জানান, ঢাকা মহানগরীসহ সারা দেশে অবৈধ দখলকৃত খেলার মাঠ উদ্ধার ও খেলাধুলার উপযোগী করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং সদস্য হিসেবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীরা রয়েছেন।

এই কমিটি এরইমধ্যে দুটি সভা করেছে এবং ঢাকার মাঠগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করেছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদেরও চিঠি দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত