ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

এলডিসি মারপ্যাঁচে বাণিজ্যিক ফাঁদে বাংলাদেশ

মোছা. মিথিলা খাতুন
এলডিসি মারপ্যাঁচে বাণিজ্যিক ফাঁদে বাংলাদেশ

বাঙালি জাতি হয়তোবা বর্তমান দুনিয়ার বুকে নিজেদের স্বার্থ সম্পর্কে সবচেয়ে অসচেতন একটি জাতি। এরা কোনো ঝামেলায় জড়াতে চায় না, শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে ইহকালীন জীবন পার করতে চায়। পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে ভাবার অবকাশও যেন তাদের নেই। অথচ এই জাতির ইতিহাস সাহসিকতায় ভরপুর! ভাবতে অবাক লাগে, আমরাই পৃথিবীর বুকে একমাত্র দেশ, যারা সম্মুখযুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলাম। মানতেই হবে, আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন অত্যন্ত আত্মসচেতন এবং দেশপ্রেমিক- যে গুণাবলি আমরা উত্তরসূরিরা অনেক আগেই ত্যাগ করেছি।

বাংলাদেশ নাকি ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ করবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উত্তরণ কি বাংলাদেশের আদৌ প্রয়োজন আছে? বাস্তবতা কী বলে? জাতিসংঘের মাপকাঠিতে বিশ্বের যেসব দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন তুলনামূলকভাবে কম, তাদের এই তালিকায় রাখা হয়। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ প্রথম এই ক্যাটাগরি তৈরি করে। মূলত এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য প্রধান তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়: উন্নত মানবসম্পদ, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। কাগজে-কলমে এই শর্তগুলো পূরণ করার দাবি করা হলেও, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনই চাল-ডাল কিনে সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে।

২০২৫-২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুষ্টিহীনতার তালিকায় আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছি। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (এঐও) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ১২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৮৪তম অবস্থানে রয়েছে। দেশে স্বাক্ষরতার হার বাড়লেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্ব। অন্যদিকে, কর্পোরেট কোম্পানিগুলোতে দক্ষ জনবলের অভাবে বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ দিতে হচ্ছে। আমাদের মাথাপিছু আয় কাগজে কলমে ২০০০ ডলার দেখানো হলেও, দেশের নিম্নস্তরের মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদাই পূরণ করতে পারছে না।

তাহলে কেন এই মিথ্যা তথ্য সাজিয়ে উত্তরণের জন্য সরকারি মহলে এত তোড়জোড়? আন্তর্জাতিক মহল থেকে কি কোনো চাপ দেওয়া হচ্ছে উত্তরণের জন্য? না, জাতিসংঘ বা অন্য কোনো সংস্থা এমন কোনো চাপ দিচ্ছে না।

মেধাস্বত্ব বা ‘ট্রিপস’-এর ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এলডিসি দেশগুলো ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ছাড় পাবে। এত লম্বা সময় পেয়ে অন্য দেশগুলো যখন ধীরে-সুস্থে প্রস্তুতি নিচ্ছে, বাংলাদেশ তখন হাঁটছে উল্টো পথে। এছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য ২০ থেকে ৩০ বছর সময় নিয়েছে, অথচ বাংলাদেশের এত তাড়াহুড়ো কেন? প্রশ্ন থেকেই যায়!

আর তড়িঘড়ি উত্তরণে বা আমরা কী হারাচ্ছি? উত্তরণের পর বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কম সুদের সুবিধাগুলো আর পাওয়া যাবে না।

বিনিয়োগ না বাড়লেও ঋণের বোঝা ঠিকই বড় হবে আমাদের। বলা হচ্ছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আমরা মুক্তবাজার বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের নানা সুবিধা পাব।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের ভুল পথে পরিচালিত করা হচ্ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, আরব আমিরাত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো শক্তিশালী অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে একের পর এক অসম বাণিজ্যিক চুক্তি করা হচ্ছে, যা আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়ার নামান্তর। গ্র্যাজুয়েশনের অলিক সুবিধার প্রচার চালিয়ে অপরিহার্য বাণিজ্য সুবিধাগুলো তুচ্ছ করা হচ্ছে এবং শুধু গার্মেন্টস খাত বাঁচানোর দোহাই দিয়ে বিশ্বের ধনী দেশগুলোর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক চুক্তি করা হচ্ছে। এসব চুক্তির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কোনোটিই সমান অংশীদারত্বের ভিত্তিতে নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো নিছক বিদেশি পণ্যের বাজার নিশ্চিত করার বা বাধ্যতামূলক ক্রয়ের বন্দোবস্ত মাত্র।

এক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের এলডিসি উত্তরণের ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তারা শুরুতে নিজেদের সমপর্যায়ের বা ছোট কোনো অর্থনীতির দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি (যেমন- পাকিস্তান প্রথম স্বাক্ষর করেছিল শ্রীলঙ্কার সাথে), যাতে করে তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়। কিন্তু বাংলাদেশ কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে এসব সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছে। এর ফলে আমাদের ভঙ্গুর অর্থনীতি সুরক্ষা কবজ হারাচ্ছে এবং শিল্পোন্নত দেশগুলোর সঙ্গে একের পর এক অসম চুক্তি করার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক নীতি-নির্ধারণী স্বাধীনতাকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হচ্ছে। এছাড়াও বারবার যে বলা হচ্ছে উত্তরণ হলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু যেকোনো দেশে বিদেশি বিনিয়োগ নির্ভর করে সে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রাকৃতিক ও জ্বালানি সম্পদের সহজলভ্যতা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর। আমরা কি এগুলোতে স্বয়ংসম্পূর্ণ?

বৈশ্বিক সূচকে আমাদের প্রকৃত অবস্থান খুবই উদ্বেগজনক। ব্যবসায়িক পরিবেশের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ‘বিজনেস রেডি’ (বি-রেডি) সূচকে আমাদের অবস্থান তলানিতে। উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৫-এ ১৩৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম, যেখানে ভিয়েতনামের অবস্থান ৪৪তম। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত বলতে আমাদের আছে শুধু তৈরি পোশাক শিল্প, যা উত্তরণের পর হয়তো হুমকির মুখে পড়বে। এর পাশাপাশি আমরা হারাবো ওষুধ শিল্পের সুবিধা। ট্রিপস-এর মতো কঠোর মেধাস্বত্ব চুক্তি আমাদের ওপর আরোপিত হবে। যে দেশের পাঁচ কোটির বেশি মানুষ চরমদরিদ্র এবং অসংখ্য শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, চিকিৎসা গ্রহণের সামর্থ্য না থাকার কারণে মানুষ মারা যাচ্ছে। সেই দেশের পেটেন্ট আইনকে স্বাগত জানিয়ে ওষুধের দাম বাড়ানোর বিলাসিতা আছে কি? অরক্ষিত কৃষি খাতকে পশ্চিমাদের ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষিপণ্যের সামনে ছুড়ে ফেলার মতো পরিস্থিতি কি আমাদের আছে? ভবিষ্যতে যে আমরা সিড পলিটিক্সের শিকার হবো না তার নিশ্চয়তাই বা দিবে কে? অথচ ফিল্টার করা কিছু পরিসংখ্যানের ওপর দাঁড়িয়ে, শীর্ষ জলবায়ু বিপর্যয়ে থাকা বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের টাইটেল অর্জনের নেশায় মত্ত। একটি সম্ভাবনাময় ওষুধ শিল্প দাঁড়িয়েছিল, সেটাকেও আমরা মেধাস্বত্ব আইনের জটিল মারপ্যাঁচে ঠেলে দিচ্ছি।

আমার দেশীয় শিল্প দাঁড় করানোর বদলে পরিকল্পিতভাবে যেন ‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’ (বি-শিল্পায়ন) করা হচ্ছে। তাই হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে উদ্ভূত এই দুর্যোগ এড়াতে এখনই সংশ্লিষ্টদের মহলের দূরদর্শিতার সঙ্গে এবং আবেগ পরিহার করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে সর্বস্তরের মানুষকেও সচেতন হতে হবে।

মোছা. মিথিলা খাতুন

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি আজিজুল কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত