ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আরণ্যক

প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানুষের লোভ ও সভ্যতার আত্মবিরোধ

জহিরুল ইসলাম
প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানুষের লোভ ও সভ্যতার আত্মবিরোধ

একটি অরণ্য ধীরে ধীরে মানুষের বসতিতে পরিণত হচ্ছে। গাছ কাটা হচ্ছে, জমি তৈরি হচ্ছে, নতুন জীবিকার সম্ভাবনা উন্মুক্ত হচ্ছে। মানুষের চোখে সেখানে উন্নয়নের একটি দৃশ্যমান হিসাব আছে। কিন্তু যে পাখি তার পুরোনো আশ্রয় হারাল, যে প্রাণীটি পরিচিত পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হলো, যে বৃক্ষ বহু বছরের নীরবতায় একটি জীবন্ত পরিবেশ তৈরি করেছিল— তাদের হারিয়ে যাওয়ার হিসাব কোথায়? উন্নয়নের এই দৃশ্যমান আয়োজনের বাইরে প্রকৃতির যে অদৃশ্য ক্ষয়, তার মূল্য কে নির্ধারণ করবে?

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক উপন্যাস পড়তে গিয়ে এমন প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে। অরণ্যের সৌন্দর্য, মানুষের জীবনসংগ্রাম, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং প্রকৃতি ধ্বংসের নৈতিক দ্বন্দ্ব— সবকিছু মিলিয়ে উপন্যাসটি কেবল একটি সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা নয়; এটি মানুষের সভ্যতাবোধেরও এক গভীর আত্মসমালোচনা।

১৯৩৯ সালে প্রকাশিত আরণ্যক বাংলা কথাসাহিত্যে প্রকৃতিকে দেখার একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। এখানে অরণ্য কোনো নিছক পটভূমি নয়। তার নিজস্ব সৌন্দর্য, রহস্য, জীবনপ্রবাহ ও অস্তিত্ব রয়েছে। মানুষ সেই জগতের দর্শকও, অংশগ্রহণকারীও আবার অনেক সময় তার বিনাশের কারণ। এ দ্বৈত সম্পর্কই উপন্যাসটির অন্যতম গভীর তাৎপর্য।

সত্যচরণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা এমন এক মানুষের মুখোমুখি হই, যিনি জীবিকার প্রয়োজনে অরণ্যের সঙ্গে যুক্ত হন, কিন্তু ক্রমে সেই অরণ্যের সৌন্দর্য ও জীবনের প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করেন। জমি বন্দোবস্তের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাকে অরণ্য উজাড় করে মানুষের বসতি ও চাষের জমি তৈরির প্রক্রিয়ার অংশ হতে হয়। অথচ যে প্রকৃতির সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করে, সেই প্রকৃতির ধ্বংসের সঙ্গে তার নিজের কাজের সম্পর্কও অস্বীকার করার উপায় থাকে না।

এখানেই সত্যচরিত্রের অভিজ্ঞতা একটি সাধারণ কাহিনির সীমা ছাড়িয়ে নৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়। মানুষ কখনো কখনো এমন কাজের অংশ হয়ে যায়, যার পরিণতি সম্পর্কে তার নিজের মনই তাকে প্রশ্ন করে। ব্যক্তিগত অনুভূতি ও সামাজিক— অর্থনৈতিক দায়িত্বের মধ্যে এ দ্বন্দ্ব মানুষের জীবনে নতুন নয়। কিন্তু আরণ্যক সেই দ্বন্দ্বকে অরণ্যের পটভূমিতে এমনভাবে হাজির করে, যেখানে মানুষের সিদ্ধান্তের পরিণতি শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক মূলত নির্ভরতার। খাদ্য, পানি, বায়ু, আশ্রয়— মানুষের অস্তিত্বের প্রায় প্রতিটি মৌলিক শর্ত প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত। অথচ সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজেকে প্রকৃতির অংশ হিসেবে দেখার পরিবর্তে অনেক সময় তার মালিক ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। ফলে প্রকৃতি হয়ে উঠেছে ব্যবহারযোগ্য সম্পদ, অরণ্য হয়ে উঠেছে জমি, নদী হয়ে উঠেছে পানির উৎস, আর পাহাড় হয়ে উঠেছে আহরণের সম্ভাবনা।

এ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটি মৌলিক আত্মবিরোধ রয়েছে। মানুষ প্রকৃতির ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ভুলে যায়, তার নিজের জীবনও প্রকৃতির নিয়মের অধীন। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়লেই প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্ভরতা কমে যায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে সেই সক্ষমতা মানুষের ধ্বংসক্ষমতাকেও বাড়িয়ে দেয়।

তবে আরণ্যক পড়ার সময় একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। অরণ্য ধ্বংসের পেছনে শুধু মানুষের ব্যক্তিগত লোভ কাজ করে না; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে জীবিকার প্রয়োজন, ভূমির মালিকানা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক বাস্তবতা। যারা অরণ্যের জমিতে বসতি গড়ে, তাদের সবার উদ্দেশ্য প্রকৃতিকে ধ্বংস করা নয়। কারও কাছে জমি মানে খাদ্য, কারও কাছে জীবিকার নিরাপত্তা, কারও কাছে ভবিষ্যৎ। তাই প্রকৃতি সংরক্ষণের আলোচনা মানুষের জীবনসংগ্রামকে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ হতে পারে না।

বিভূতিভূষণের কৃতিত্ব এখানেই যে, তিনি অরণ্য ও মানুষকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে কোনো সহজ নৈতিক সিদ্ধান্ত দেননি। তার অরণ্যে প্রকৃতির সৌন্দর্য যেমন আছে, তেমনি আছে মানুষের দারিদ্র্য, আকাঙ্ক্ষা, অসহায়ত্ব ও বেঁচে থাকার চেষ্টা। ফলে প্রকৃতি রক্ষার প্রশ্নটি শুধু গাছ বাঁচানোর প্রশ্ন থাকে না; হয়ে ওঠে মানুষ ও তার পরিবেশের মধ্যে ন্যায়সংগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন।

উপন্যাসের অরণ্যজীবনে সত্যচরণের পরিচয় ঘটে নানা শ্রেণি ও স্বভাবের মানুষের সঙ্গে। দোবরু পান্না, ভানুমতী, যুগলপ্রসাদসহ বিভিন্ন চরিত্রের মধ্য দিয়ে অরণ্যনির্ভর মানুষের জীবন, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, সম্পর্ক ও প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সংযোগের পরিচয় পাওয়া যায়। এ মানুষদের জীবনকে শুধু সভ্যতার প্রচলিত মাপকাঠিতে বিচার করলে তাদের অস্তিত্বের অনেকখানি অজানা থেকে যায়। তাদের কাছে অরণ্য কেবল সম্পদ নয়, পরিচিত পৃথিবী; জীবিকার ক্ষেত্র, স্মৃতির আশ্রয় এবং জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: উন্নয়ন কার জন্য এবং কোন জীবনকে কেন্দ্র করে? যে উন্নয়ন একদল মানুষের জীবিকার সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু অন্যদিকে কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচিত পরিবেশ ও জীবনভিত্তি বদলে দেয়, তার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন কীভাবে সম্ভব? উন্নয়নের হিসাব যদি শুধু জমির উৎপাদন, সম্পদের পরিমাণ কিংবা অর্থনৈতিক মুনাফায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে মানুষের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব ও প্রকৃতির নিজস্ব মূল্য অদৃশ্য থেকে যায়।

আরণ্যক-এর প্রকৃতিচেতনা এই অদৃশ্য জগতের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরায়। বিভূতিভূষণ অরণ্যের সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন গভীর মমতায়। কিন্তু তার প্রকৃতি কেবল মনোরম দৃশ্যের সমষ্টি নয়। সেখানে ঋতুর পরিবর্তন, বৃক্ষলতা, পাখি, প্রাণী, আলো-ছায়া এবং নিস্তব্ধতার মধ্যে এক বিশাল জীবনের উপস্থিতি রয়েছে। মানুষ সেই জীবনের একটি অংশমাত্র। এ উপলব্ধি মানুষের অহংকারকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

প্রকৃতিকে ভালোবাসা আর প্রকৃতির সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করা এক বিষয় নয়। মানুষ কোনো বনভূমির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে পারে, তার ছবি তুলতে পারে, সেখানে অবকাশযাপন করতে পারে; অথচ নিজের ভোগের প্রয়োজনে সেই বন ধ্বংসের প্রক্রিয়াতেও অংশ নিতে পারে। অর্থাৎ সৌন্দর্য অনুভবের ক্ষমতা থাকলেই সংরক্ষণের নৈতিক দায়িত্ব তৈরি হয় না। সেই দায়িত্বের জন্য প্রয়োজন নিজের প্রয়োজন, সুবিধা ও আকাঙ্ক্ষার সীমা সম্পর্কে সচেতন হওয়া।

এ জায়গায় সত্যচরণের অভিজ্ঞতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অরণ্যের প্রতি তার আকর্ষণ এবং অরণ্য ধ্বংসের কাজে তার সম্পৃক্ততা পরস্পরকে অস্বীকার করে না; বরং একটি জটিল মানবিক সত্য প্রকাশ করে। মানুষ সব সময় নিজের বিশ্বাস ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে পারে না। কখনো জীবিকার প্রয়োজনে, কখনো সামাজিক দায়িত্বে, কখনো প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার অংশ হয়ে সে এমন কাজ করে, যার নৈতিক পরিণতি পরে তাকে ভাবায়। আরণ্যক এ আত্মজিজ্ঞাসাকে সাহিত্যের গভীরে নিয়ে গেছে।

আজকের পৃথিবীতে এ প্রশ্ন আরও বিস্তৃত। বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট, পাহাড় কাটা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ঘটনা আমাদের উন্নয়নচিন্তার সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে আসে। জলবায়ু পরিবর্তনও দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃতির ক্ষতি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে আটকে থাকে না। এক স্থানের পরিবেশগত বিপর্যয় অন্য স্থানের মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তাই স্থানীয় অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বৈশ্বিক দায়িত্বেরও বিষয়।

প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অগ্রগতি মানুষের জীবনকে অনেক ক্ষেত্রে সহজ করেছে। চিকিৎসা, যোগাযোগ, কৃষি ও উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিজে থেকেই নৈতিক প্রজ্ঞা নিশ্চিত করে না। মানুষ কী করতে পারে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— কী করা উচিত, কতটুকু করা উচিত এবং তার পরিণতির দায় কে বহন করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া উন্নয়ন কেবল সক্ষমতার বিস্তার হয়ে থাকতে পারে; মানবিক অগ্রগতি হয়ে ওঠে না।

এখানে প্রকৃতিকে রক্ষা করার অর্থ অতীতে ফিরে যাওয়া নয়। মানুষের প্রয়োজন অস্বীকার করে অরণ্যকে অপরিবর্তনীয় করে রাখাও বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। প্রয়োজন এমন উন্নয়নচিন্তা, যেখানে মানুষের জীবিকা, সামাজিক ন্যায়, পরিবেশের ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার একসঙ্গে বিবেচিত হবে। প্রকৃতি সংরক্ষণের নামে স্থানীয় মানুষের জীবনকে উপেক্ষা করা যেমন অন্যায়, তেমনি জীবিকার প্রশ্নকে অজুহাত করে সীমাহীন সম্পদ আহরণও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বিভূতিভূষণের আরণ্যক আমাদের কোনো সরল পরিবেশবাদী স্লোগান দেয় না। বরং মানুষের ভেতরের এমন এক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যার সহজ সমাধান নেই। মানুষ প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভব করে, তার ওপর নির্ভর করে, আবার নিজের স্বার্থে তাকে পরিবর্তন ও ধ্বংসও করে। এ দ্বৈততার মধ্যেই মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের একটি গভীর আত্মবিরোধ লুকিয়ে আছে।

বিভূতিভূষণের মৃত্যুর এত বছর পরও আরণ্যক আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে এই কারণে যে, উপন্যাসটি কেবল হারিয়ে যাওয়া একটি অরণ্যের স্মৃতি বহন করে না; মানুষের হারিয়ে যেতে থাকা সংবেদনশীলতার কথাও মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃতিকে হারানো মানে শুধু কিছু গাছ, প্রাণী কিংবা ভূখণ্ড হারানো নয়; মানুষের নিজের অস্তিত্বকে ধারণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর হারানো।

সভ্যতার অগ্রগতি আমরা সাধারণত মানুষের অর্জন দিয়ে পরিমাপ করি। কিন্তু সেই অর্জনের বিনিময়ে কী হারাচ্ছি, সে হিসাবও কি সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা নয়? যে উন্নয়ন মানুষের বসবাসের পৃথিবীকে ক্রমশ বসবাসের অযোগ্য করে তোলে, তাকে কি নিঃশর্তভাবে অগ্রগতি বলা যায়? প্রকৃতির ওপর মানুষের জয় যদি শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজের পরাজয়ের কারণ হয়ে ওঠে, তাহলে সভ্যতার এ জয়গাথা আসলে কাদের জন্য?

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত