
পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মধ্যকার সংঘাতে এ পর্যন্ত ৩২৯ জন নিহতের তথ্য পাওয়া গেছে। পাকিস্তান দাবি করছে, তাদের সামরিক বাহিনীর অভিযানে ২৭৪ তালেবান সেনা ও জঙ্গি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের ৫৫ জন সেনা নিহত হয়েছে বলে দাবি করছে আফগানিস্তান। তবে, আফগানের এ দাবি উড়িয়ে দিয়ে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেছেন, গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ১২ পাকিস্তানি সেনা নিহত ও ২৭ সেনা আহত হয়েছেন। আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, আফগানিস্তান সংলাপের মাধ্যমে সমাধান চায়। জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, পাকিস্তান হামলা চালিয়ে যেতে থাকলে তার কঠোর জবাব দেওয়ার সামর্থ্য আফগানিস্তানের আছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছি। এতে বার্তা দেওয়া হয়েছে- আমাদের হাত তাদের গলা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।’
জাবিউল্লাহ মুজাহিদ আরও বলেন, তেহরিক ই তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) বিষয়টি এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির একটি ‘পূর্বপরিকল্পিত অজুহাত’। আর এ বিষয়টি পাকিস্তানের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’। তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু এটি কখনোই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয়।’ আফগান সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে চলমান পরিস্থিতির সমাধান করতে চায় বলেও উল্লেখ করেন জাবিউল্লাহ মুজাহিদ। তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর জোর দিয়েছি এবং এখনও সমস্যা সংলাপের মাধ্যমে সমাধান চাই।’
আফগানিস্তানজুড়ে ভয়াবহ বোমা হামলা, ‘ধৈর্যের সীমা শেষ’ বলছে পাকিস্তান : প্রতিবেশী আফগানিস্তানে তালেবান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে পকিস্তান। সীমান্তে সংঘর্ষের জেরে পাকিস্তান আফগানিস্তানজুড়ে বিমান হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আর ধৈর্য ধরার সুযোগ নেই এবং এখন পাকিস্তান খোলামেলা যুদ্ধ চালাবে। জানা গেছে, স্থানীয় সময় রাত ১টা ৫০ মিনিটে কাবুলে প্রথম বিমান হামলা হয়, এরপর দ্বিতীয় দফা হামলা চালানো হয়। আফগানিস্তানও সীমান্তে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।
আফগান সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, কাবুলে বিমান হামলা হয়েছে। এছাড়া পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান দক্ষিণ আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশের একটি সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ দাবি করেন, আফগানিস্তানের আগ্রাসনের জবাব দিতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আফগান বাহিনী দুই দেশের সীমান্তবর্তী পাকিস্তানি সামরিক অবস্থানে হামলা চালায়।
আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধের ঘোষণা পাকিস্তানের : সীমান্তে হামলার জেরে আফগানিস্তানজুড়ে বোমা হামলা চালাচ্ছে পাকিস্তান। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন এখন প্রকাশ্য যুদ্ধ চলবে। এরই মধ্যে দুই পক্ষই ব্যাপক হতাহতের কথা জানিয়েছে। আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দাবি করেন, পাকিস্তান আবারও কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়া প্রদেশে বোমা হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের মধ্যে এখন প্রকাশ্য যুদ্ধ চলছে। আফগান তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেন, আফগানিস্তান ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক আক্রমণাত্মক অভিযান চালাচ্ছে। ডুরান্ড লাইনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা রয়েছে।
পাকিস্তানে হামলা চালিয়েছে আফগানিস্তান, সীমান্তে তীব্র সংঘর্ষ : গত সপ্তাহে পাকিস্তানের বিমান হামলার জবাবে সীমান্তে পাকিস্তানি সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে আফগানিস্তান। তালেবান কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। পাকিস্তান বলেছে, তাদের বাহিনীও পাল্টা জবাব দিয়েছে। আফগানিস্তানের একটি সামরিক কোরের গণমাধ্যম দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে ‘তীব্র সংঘর্ষ’ শুরু হয়। এতে বলা হয়, নানগারহার ও পাকতিয়া প্রদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাব হিসেবে এই লড়াই শুরু হয়েছে। তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পুনরাবৃত্ত উসকানি ও লঙ্ঘনের জবাবে ডুরান্ড লাইনের অপর পাকিস্তানি সামরিক অবস্থান ও স্থাপনায় ব্যাপক আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু করা হয়েছে। ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত ডুরান্ড লাইন নামে পরিচিত। তবে আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এই সীমান্তকে স্বীকৃতি দেয়নি। মুজাহিদ আরও দাবি করেন, আফগান বাহিনী ‘অসংখ্য সৈন্য’ হত্যা করেছে এবং কয়েকজনকে জীবিত বন্দি করেছে। তিনি বলেন, শত্রুপক্ষের ১৫টি চৌকি দখল করা হয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এক্সে এক পোস্টে জানায়, খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বিভিন্ন সেক্টরে তালেবান বাহিনীর গুলির জবাবে পাকিস্তানি সেনারা তাৎক্ষণিক ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, চিত্রাল, খাইবার, মোহমান্দ, কুররাম ও বাজাউর সেক্টরে তালেবান বাহিনীকে ‘শাস্ত ‘ দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে আফগান পক্ষের ব্যাপক হতাহতের খবর নিশ্চিত হয়েছে এবং একাধিক চৌকি ও সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয়েছে। তবে পূর্বাঞ্চলীয় আফগান সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ওয়াহিদুল্লাহ মোহাম্মাদি বলেন, আফগান পক্ষের এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আখুন্দজাদা নিহত : আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পরিচালিত ‘অপারশন গজব-লিল হক’ অভিযানে নিহত হয়েছেন কাবুলে ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা থিঙ্কট্যাংক সংস্থা ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (ওসিন্ট)- এর ইউরোপ শাখা এক বার্তায় এ দাবি করেছে। শুক্রবার ভোর ৬ টা ৩ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় ওসিন্ট ইউরোপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর হামলায় কাবুলে ইসলামিক এমিরেত অব আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা কয়েকজন শীর্ষ তালেবান কমান্ডার-সহ নিহত হয়েছেন। ২০২১ সালে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান ত্যাগের পর দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা দখল করে সরকার গঠন করে তালেবান বাহিনী। বাহিনীর শীর্ষনেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা হন সেই সরকারের সর্বোচ্চ নেতা। তালেবান সরকার মূলত তার নির্দেশ ও দিকনির্দেশনা অনুযায়ী চলে।
পাকিস্তানের ৫৫ সেনাকে হত্যা, কয়েকজনকে আটকের দাবি আফগানিস্তানের : সীমান্ত সংঘাতে পাকিস্তানের ৫৫ সেনাকে হত্যা ও কয়েকজনকে জীবিত আটকের দাবি করেছে আফগানিস্তান। পাশাপাশি, পাকিস্তানের কয়েকশ’ অস্ত্র জব্দ করার কথাও জানিয়েছে তালেবান সরকার। আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সীমান্তে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পোস্টের বিরুদ্ধে পরিচালিত পাল্টা অভিযান শেষ হয়েছে। সেনাপ্রধান ফাসিহউদ্দিন ফিতরাতের নির্দেশে গতকাল রাত ১২টায় (স্থানীয় সময়) অভিযান সমাপ্ত করা হয়। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, অভিযানে পাকিস্তানের ৫৫ জন সেনা নিহত হয়েছেন। এছাড়া আফগান বাহিনী কয়েকজনের মরদেহ ও কয়েকশ হালকা ও ভারী অস্ত্র জব্দ করেছে এবং কয়েকজন সেনাকে জীবিত আটক করেছে। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও জানায়, অভিযানের সময় পাকিস্তান বাহিনীর দুটি সদরদপ্তর ও ১৯টি চেকপোস্ট দখল করা হয়েছে। অন্যদিকে, সংঘর্ষে আটজন আফগান সেনা নিহত এবং আরও ১১ জন আহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তোরখাম এলাকায় প্রত্যাবাসনপ্রত্যাশীদের একটি অস্থায়ী শিবিরে পাকিস্তান বাহিনীর বিমান হামলায় নারী ও শিশুসহ ১৩ জন আহত হয়েছেন। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাব হিসেবেই এ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অন্যদিকে, চলমান সংঘর্ষে আফগান তালেবানের ৭২ যোদ্ধাকে হত্যার দাবি করেছে পাকিস্তান। অভিযানে পাকিস্তানের দুই নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছে ইসলামাবাদ। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে বলা হয়েছে, পাকিস্তান বিমানবাহিনী আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশে একটি গোলাবারুদ গুদাম ধ্বংস করেছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি কাবুলে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বৈদেশিক গণমাধ্যমবিষয়ক মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি বলেন, আফগান দিক থেকে হামলার জবাবে পাল্টা আঘাতের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং একাধিক দফায় তা কার্যকর করা হয়েছে। তার দাবি, ‘মোট ৭২ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ১২০ জনের বেশি আহত হয়েছে। ১৬টি পোস্ট ধ্বংস এবং সাতটি পোস্ট দখল করা হয়েছে।’
নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা নিয়ে আপসহীন থাকবে পাকিস্তান- শাহবাজ শরিফ : সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ড ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি। আফগান তালেবান বাহিনীর সঙ্গে সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তারা এ বক্তব্য দেন। পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনী একাধিক পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে নিরাপত্তা সূত্রে জানা গেছে। তাদের দাবি, আফগান তালেবান বাহিনীর উসকানিমূলক হামলার জবাব হিসেবে এসব অভিযান পরিচালিত হয়। নিরাপত্তা সূত্র আরও জানায়, এসব হামলায় আফগানিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড পোস্ট ও গোলাবারুদের গুদাম লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং এতে বিদ্রোহীদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
শুক্রবার দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, দেশের প্রতিরক্ষা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। যে কোনো আগ্রাসনের জবাব কঠোর ও উপযুক্তভাবে দেওয়া হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনী দেশের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সামরিক বাহিনীর পেশাদার দক্ষতার প্রশংসা করে তিনি জানান, চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ও চিফ অব আর্মি স্টাফ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে বাহিনী জাতীয় চেতনায় দায়িত্ব পালন করছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, উন্নত প্রশিক্ষণ ও কার্যকর প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে বাহিনী অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত- উভয় ধরনের হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি বলেন, শান্তি ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রশ্নে পাকিস্তান কোনো আপস করবে না। তিনি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
পাক-আফগান উত্তেজনা ঘিরে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ- মধ্যস্থতায় আগ্রহী ইরান-রাশিয়া : পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সীমান্তে পাল্টাপাল্টি হামলা ও বিমান অভিযানের পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাওয়ায় জাতিসংঘ, চীন, রাশিয়া, ইরান ও সৌদি আরব কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, সংযম ও সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। আফগানিস্তানে মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদনকারী রিচার্ড বেনেট ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান বজায় রাখার ওপর জোর দেন এবং সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে সাধারণ মানুষের ওপর এর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, ইসলামাবাদ ও কাবুল চাইলে তেহরান সংলাপের আয়োজন করতে প্রস্তুত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের উচিত আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসন করা।
রাশিয়াও দুই দেশকে অবিলম্বে সীমান্তপারের হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আরআই-এর বরাতে জানানো হয়, মস্কো উভয় পক্ষকে দ্রুত কূটনৈতিক চ্যানেলে বিরোধ মেটানোর আহ্বান জানিয়েছে। প্রয়োজন হলে এবং দুই পক্ষ সম্মত হলে রাশিয়া মধ্যস্থতার বিষয়টি বিবেচনা করবে বলেও জানানো হয়েছে। এদিকে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তের উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা হয়। দার সৌদি মন্ত্রীকে ‘উসকানিবিহীন আফগান আগ্রাসনের’ জবাবে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করেন এবং জানান, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী অপারেশন গজব লিল হক-এর আওতায় লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান চালিয়েছে। উভয় নেতা অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার গুরুত্বের ওপর জোর দেন এবং ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্মত হন। চীনও পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘প্রতিবেশী ও মিত্র দেশ হিসেবে চীন এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সংঘাতের ফলে হতাহতের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করছে। যেকোনো উত্তেজনা উভয় পক্ষের জন্য ক্ষয়ক্ষতি বয়ে আনবে।’ তিনি উভয় পক্ষকে শান্ত ও সংযত থাকার আহ্বান জানান এবং যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর মাধ্যমে আরও রক্তপাত এড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। চীন জানিয়েছে, তারা দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
পাকিস্তানকে মোকাবিলায় ‘সুইসাইড স্কোয়াড’ গঠন করছে আফগানিস্তান : পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে আফগানিস্তানের সেনাবাহিনী। সেসবের মধ্যে একটি হলো ‘সুইসাইড স্কোয়াড’। আফগানিস্তানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম বখতার নিউজ এজেন্সি আজ শুক্রবার একটি সেনা ব্যাটালিয়নের ছবি প্রকাশ করেছে এবং আফগান সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, এটি আফগান সেনাবাহিনীর সুইসাইড স্কোয়াড। এই স্কোয়াডের সেনারা এক্সপ্লোসিভ ভেস্ট এবং গাড়ি বোমায় সজ্জিত এবং শত্রুর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে যুদ্ধ শুরু হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ায় পাক-আফগান সীমান্তবর্তী ডুরান্ড লাইন এলাকায় পাক সেনাচৌকিগুলো লক্ষ্য করে অতর্কিত হামলা চালিয়ে অন্তত ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করে আফগানিস্তানের সেনাবাহিনী। সেই সঙ্গে আরও কয়েকজন সেনাকে ধরে নিয়ে যায় তারা। রাত ১২ টার দিকে আফগানিস্তানে ফিরে যায় তারা। অতর্কিত এই হামলার পর আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে পাকিস্তান এবং রাত ৩ টা ৪৫ মিনিটে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন গজব-লিল হক’ শুরু করে। পাকিস্তানের এ অভিযানে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ১৩৩ জন আফগান সেনা এবং আহত হয়েছেন আরও দুই শতাধিক।
আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা কমিয়ে আনতে সৌদি-পাকিস্তান আলোচনা : পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিয়ে পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল-সৌদ। এক বিবৃতিতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। আল-সৌদ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে এই অঞ্চলের উন্নয়ন এবং উত্তেজনা কমানোর উপায় নিয়ে কথা বলেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি অ্যাকাউন্টে বিবৃতিটি প্রকাশ করা হয়েছে। এদিকে, উত্তেজনা কমিয়ে শান্তি বজায় রাখতে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সীমান্ত সংঘর্ষ ও সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। এ সময় গুতেরেস উভয় দেশকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাদের বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। শুক্রবার ভোরে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিকমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে এ প্রস্তাব দেন।
আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলার কঠোর নিন্দা ভারতের : আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলার ঘটনায় কঠোর নিন্দা জানিয়েছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুক্রবার বলেছেন, আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলার কঠোর নিন্দা জানায় ভারত। মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্সে তিনি লিখেছেন, পবিত্র রমজান মাসে পাকিস্তানের চালানো বিমান হামলায় অনেক বেসামারিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
যার মধ্যে নারী ও শিশুও আছেন। আফগানিনস্তানের ভৌগলিক অখণ্ডতার প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেছেন, নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দেয় পাকিস্তান। আফগানিস্তানের ওপর বিমান হামলা এমনই আরেকটি প্রচেস্টা। ভারত আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং স্বাধীনতার প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করছে। এদিকে গতকাল রাতে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় পাক সেনাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় আফগান সেনারা।
এর জবাবে পাকিস্তান দেশটি রাজধানী কাবুলসহ বিভিন্ন জায়গায় বিমান হামলা চালিয়েছে। শুক্রবারও হামলা অব্যাহত আছে।