
যে কোনো সমৃদ্ধ শহর নগর গড়ে ওঠার জন্য নদীপথের সংযোগ থাকতে হয়, নচেত বহির্বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য হবে না, দেশের অর্থনীতি অচল হয়ে যাবে। এ কারণে দেশের নদী বন্দরকে গর্দানের শাহরগের সাথে তুলনা করা হয়।
সমাজ সভ্যতায় নদ-নদীর আরেকটি ভূমিকার কথা আমরা খুব কম ভাবি, তা হল বিশাল জনপদের বর্জ্য নিষ্কাশন। ঢাকায় এখন জনসংখ্যা দুই কোটির উপরে। প্রতিদিন এতগুলো মানুষের বর্জ্য কত লক্ষ টন হতে পারে, অন্দাজ অনুমানের বাইরে। এগুলো নানা পথে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে জমা হয়; তারপর জোয়ার ভাটার টানে সাগরের ঢেউ এসে তলিয়ে নিয়ে যায় সাগর বক্ষে।
ময়লা, আবর্জনা ও বর্জ্যরে সঙ্গে তুলনা করা যায় মানুষের ব্যক্তি জীবনের পাপ-পঙ্কিলতা ও অপরাধ। মানুষের একেকটি পাপ কালো বিন্দু হয়ে হৃদয়ের আয়নায় কালো দাগ সৃষ্টি করে, পাপ যত বেশি হতে থাকে, হৃদয়ে কালো দাগের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে মহাসাগরের ঢেউ এসে বুড়িগঙ্গার ময়লা-আবর্জনা মুহূর্তে তলিয়ে নেওয়ার মতো আল্লাহর রহমতের জোয়ার এসে আমাদের হৃদয় নগরের পাপ, আবর্জনার বর্জ্যগুলো ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়।
বর্ষায় যেমন পানিতে খালবিল থৈ থৈ করে চান্দ্রবর্ষপঞ্জির রমজান মাসেও তেমনি আল্লাহর রহমতের ঢেউ-তরঙ্গ তলিয়ে নেয় পাপরাশি। এই তরঙ্গ দোলা সবচেয়ে বেশি থাকে রমজানের শুরুর দশ দিনে ও রাতে। তারপর বিশ্ব প্রকৃতিতে যে অদৃশ্য ঢেউ-তরঙ্গ শুরু হয়, তাকে বলা হয়েছে ‘মাগফিরাত’। বান্দার গোনাহখাতা মাফ হওয়ার ভরা মৌসুম। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে আল্লাহর প্রতি ঈমান ও আত্মবিশ্লেষণ সহকারে রোজা রাখে তার অতীতের গোনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হয়। আরও বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাব (আত্মবিশ্লেষণ) সহকারে রাত জেগে ইবাদত করবে (তারাবি নামাজ পড়বে) তার গোনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হবে।’ ‘যে ব্যক্তি শবে কদরে ঈমান ও ইহতেসাব সহকারে রাত জেগে ইবাদত করবে তার অতীতের গোনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হবে।’ সব হাদীসেই একটি শর্তের কথা উল্লেখ আছে। তা হলো, ঈমান ও ইহতেসাব থাকতে হবে। খেলায়-ফেলায়, অন্যের দেখাদেখি কিংবা লোক দেখানোর জন্য হতে পারবে না। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তার বিশাল রহমত লাভের বাসনা এবং আত্মসমালোচনায় দগ্ধ তাপিত অন্তরের অধিকারী হতে হবে রোজাদারের ইবাদত। তা হলেই দেখা যাবে সর্বত্র রহমত আর রহমতের ঢেউ-তরঙ্গ।
হাদীসে কুদসীতে বির্ণিত ‘যে কোনো নেক আমলের সওয়াব সত্তর থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত কিংবা তার চেয়েও বেশি দেওয়া হবে। কিন্তু রোজার সওয়াব এই হিসাব থেকে আলাদা। আল্লাহপাক বলেন, রোজা আমার জন্য, আমার জন্যই বান্দা দিনের বেলা পানাহার ও যৌন-সংসর্গ পরিহার করে, কাজেই রোজার সওয়াব ফেরেশতাদের মাধ্যমে বণ্টন করব না, বরং আমি নিজেই দেব।’ (বুখারি)। এত বেশি সওয়াব কেন, কোথায় আছে এত সওয়াবের ভাণ্ডার? ভোর থেকে সারাদিন উপোস থাকা, ক্ষুধা-পিপাসার কাতরতা উপেক্ষা কিংবা বৈধ যৌন-সংসর্গও পরিহার করা, আবার রাত জেগে দীর্ঘক্ষণ তারাবি নামাজ, শেষরাতে ঘুম থেকে জেগে সাহরি খাওয়া, তাহাজ্জুদ, এত এত পরিশ্রম চাট্টিখানি কথা নয়। যার অন্তরে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা আছে সেই শুধু এসব আমল আঞ্জাম দিতে সক্ষম। একদিন নদীর মাছদের জড়ো করে এক তরুণ মাছ বক্তৃতা দিল। ভাইয়েরা! জীবনভর আমরা শুনে আসছি, পানির অপর নাম জীবন; পানির সাক্ষাৎ পেলেই ধন্য হবে আমাদের জিন্দেগানী; কিন্তু আমরা জীবনে কোনোদিন পানির দেখা পেলাম না। তরুণের বক্তৃতা শুনে বিরাট হৈচৈ পড়ে গেল মাছদের সমাজে, সমস্বরে রব উঠল: চলো, এ জনম সার্থক করতে হবে। পানির দেখা পেতে হবে। পরামর্শ হলো, পানিকে পাওয়ার জ্ঞান আমাদের নেই। শুনেছি অমুক মহাসাগরে একজন জ্ঞানবৃদ্ধ মাছ আছে, তার কাছে যাই। হয়তো তিনি পথের দিশা দিতে পারবেন, পানির সন্ধান আমরা পাব। আমাদের জীবন সার্থক ও পূর্ণতায় ভরে যাবে। মাছেরা দল বেঁধে রওনা হল নদী ছেড়ে সাগারের পথে। কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ ও নানা বাধা-আক্রমণে অনেক মাছের জীবনাবসান হল মাঝপথে। তবুও তাদের দুঃখ নাই, ক্লান্তি নাই। কারণ, তাদের সফর আধ্যাত্মিক তত্ত্বজ্ঞান লাভ ও জীবনকে সার্থক করার সাধনায় নিবেদিত।