ঢাকা রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২২ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

হামে আরও মৃত্যু

আজ ৩০ উপজেলায় টিকা শুরু

আজ ৩০ উপজেলায় টিকা শুরু

প্রায় প্রতিদিনই হামে আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। গতকাল শনিবারও হামে ৬ শিশু মারা গেছে। ফলে হাম বর্তমান সময়ে হাম আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরইমধ্যে দেশে হামের প্রকোপ বাড়ায় ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে আজ রবিবার। এদিন সকাল ৯টা থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হবে। গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল এ তথ্য জানান। এ সময় তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, বরগুনা, পাবনা, চাঁদপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর এবং যশোরসহ মোট ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলাকে এই বিশেষ কার্যক্রমের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। মূলত যেসব এলাকায় সম্প্রতি হামের প্রকোপ বেশি দেখা গেছে, সেখানেই এই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘টিকাদান কেন্দ্রের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত বয়সের সব শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হবে। টিকার পাশাপাশি শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী একটি বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, যেসব শিশু অসুস্থ শুধু তারাই ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পাবে।’

অনেক অভিভাবকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে, আগে টিকা নেওয়া থাকলে আবারও দেওয়া যাবে কি না। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, ‘যারা এরআগে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা নিয়েছেন, তারাও এই বিশেষ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন। একাধিকবার এই টিকা নিলেও শরীরে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি নেই।

রামেক হাসপাতালে হাম উপসর্গ নিয়ে একদিনে ৩ শিশুর মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। গতকাল শনিবার দুপুরে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শংকর কে বিশ্বাস এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ২৪ জন। আর ছাড়পাত্র পেয়েছে ৩ জন। সাসপেক্টেড হামে চিকিৎসাধীন রোগী আছেন ১৪৯ জন। এখন পর্যন্ত হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট ৩৭৭ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। চলতি মৌসুমে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

কুষ্টিয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে একদিনে ৩ শিশুর মৃত্যু : কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. হোসেন ইমাম। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রাত সাড়ে ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আট মাস বয়সী শিশু ইব্রাহিমের মৃত্যু হয়। সে দৌলতপুর উপজেলার চঞ্চল হোসেনের ছেলে। এছাড়া রাত ১২টার দিকে পাঁচ মাস বয়সী শিশু আইজারের মৃত্যু হয়। সে কুষ্টিয়া শহরের রেনউক মোড় এলাকার মমিনের মেয়ে। এর আগে, ভোর ৬টার দিকে একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামের উপসর্গ নিয়ে আট মাস বয়সী আফরানের মৃত্যু হয়। সে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ভাদালিয়া গ্রামের আল আমিনের ছেলে।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. এএইচএম আনোয়ারুল ইসলাম জানান, জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে এরইমধ্যে হাম রোগীদের জন্য আলাদা ‘হাম কর্নার’ চালু করা হয়েছে। তবে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেককে সাধারণ শিশু ওয়ার্ডেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, এতে আমাদের শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য মতে, জেলায় অন্তত ৩০০ জনের বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান, হামের টিকার স্বল্পতা, সচেতনতার ঘাটতি এবং বাইরের জেলা থেকে মানুষের আগমন সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তিনি আরও বলেন, আক্রান্ত শিশুদের জন্য জেলার সব হাসপাতালে ‘হাম আইসোলেশন কর্নার’ চালু করা হয়েছে এবং টিকা পাওয়া মাত্র দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হবে।

ময়মনসিংহ মেডিকেলে হামের লক্ষণ নিয়ে আরও ২৪ শিশু ভর্তি : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে শিশু ভর্তি বাড়ছেই। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২৪ শিশু হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে মোট ৬৭টি শিশু। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, গত শুক্রবার গত ১৭ মার্চ থেকে শনিবার (৪ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ২০৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ১৩২ শিশু এবং ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৬৭ শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে আরও ২৩ শিশু।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম মেডিকেল দলের ফোকালপারসন সহযোগী অধ্যাপক মোহা. গোলাম মাওলা বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে এলে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। প্রতিদিনের সংগ্রহ করা নমুনা প্রতিদিনই পাঠানো হয়। ঢাকা থেকে ফলাফল পাওয়া যায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে। সর্বনিম্ন ৩ মাস থেকে ১০ বছরের রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছে। তবে হাসপাতালে ৬ মাস থেকে ১ বছরের শিশুর সংখ্যা বেশি।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে একজন বা দুজন করে হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালের শিশু বিভাগে ভর্তি হতে শুরু করে। তবে মার্চের মাঝামাঝি থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তিনটি মেডিকেল টিম গঠন করে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

চাঁদপুরে হাম সংক্রমণ- ৪২ শয্যার বিপরীতে ১৪৭ শিশু ভর্তি, চাপ সামলাতে হিমশিম অবস্থা : চাঁদপুরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা। এতে করে জেলার প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের অবকাঠামো ও চিকিৎসা সেবায় তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল শনিবার সকালে সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র ৪২টি শয্যার বিপরীতে ১৪৭ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। শয্যা না পেয়ে অনেক শিশুকে হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। যার ফলে রোগীর চাপ সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হামের সংক্রমণ ঠেকাতে আক্রান্ত শিশুদের জন্য একটি আলাদা ইউনিটে আইসোলেশন ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে বর্তমানে ৩০ জন শিশুকে পৃথকভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে, জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও হাম রোগের উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফলে পুরো জেলাজুড়েই স্বাস্থ্যসেবায় চাপ বেড়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, হামের উপসর্গ নিয়ে আসা শতাধিক শিশুর নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ জনের রিপোর্ট পাওয়া গেছে, যেখানে ২৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। বাকি নমুনাগুলোর রিপোর্ট এখনও অপেক্ষমাণ রয়েছে।

চাঁদপুর সদর হাসপাতালের তৃতীয় তলার আইসোলেশন ওয়ার্ডে মান্নান হোসেন বলেন, আমার বাচ্চার ওয়ার্ড জ্বর, ঠান্ডা কাশি। পরে হাসপাতালে নিয়ে আসলাম। চিকিৎসকরা হাম উপসর্গ থাকায় আলাদা রেখে চিকিৎসা দিচ্ছে। রোগী অনেক চাপ, সিট নাই দেখে ফ্লরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একেএম মাহবুবুর রহমান বলেন, সারাদেশের মতো চাঁদপুর হামের আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। যারা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে তাদের আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডে মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের পর্যাপ্ত ওষুধ এবং সেবাকর্মী নার্স রয়েছে। অভিভাবকদের সচেতন থাকার পাশাপাশি শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করা। হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমাদের পরামর্শ থাকবে, অসুস্থ শিশুকে সুস্থ শিশু থেকে দূরে রাখা।

বিএমইউতে ৮ শয্যার হাম ওয়ার্ড ও স্ক্রিনিং সেন্টার চালু : দেশে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) হামে আক্রান্ত রোগীদের জন্য একটি ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। বিএমইউ-র পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইরতেকা রহমান জানিয়েছেন, ‘সি’ ব্লকের দ্বিতীয় তলায় হামে আক্রান্তদের জন্য ৮ শয্যার একটি ওয়ার্ড চালু রয়েছে এবং এর পাশাপাশি এটা সম্প্রসারিত করা হয়েছে। এছাড়াও হাম স্ক্রিনিং সেন্টারও চালু করা হয়েছে।

বিএমইউ-র পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইরতেকা রহমান ও উপ-পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. মোহাম্মদ আবু নাছের গত বৃহস্পতিবার হাম ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন। বর্তমানে ওয়ার্ডটিতে ৪ জন রোগী ভর্তি আছে। হাম রোগের বিষয়ে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে এবং ২নং বহির্বিভাগে একটি স্ক্রিনিং সেন্টার চালু করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়াও ‘এফ’ ব্লকের দ্বিতীয় তলায় একটি সম্প্রসারিত আইসোলেটেড ওয়ার্ড স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত