
রাশিয়া ও ইরান যেকোনো পরিস্থিতিতে একে অপরের পাশে থাকবে বলে জানিয়েছেন রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলোসভ। ইরানের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী রেজা তালাই-নিকের সঙ্গে এক বৈঠকে আন্দ্রেই বেলোসভ এ কথা বলেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং ঘনিষ্ঠতা দিন দিন আরও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের পক্ষ থেকেই চলমান সংকট ও সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ অধিকার ইরানের আছে- রাশিয়া : জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ অধিকার ইরানের রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে ‘ভণ্ডামি’ ও ‘জলদস্যুতার’ অভিযোগ তুলেছেন। জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে নেবেনজিয়া বলেন, ইরানের ওপর পুরো দায় চাপিয়ে দেওয়ার একটি চেষ্টা চলছে, যেন মনে হয় ইরানই তার প্রতিবেশীদের ওপর হামলা করেছে। কিন্তু যুদ্ধের সময় কোনো উপকূলীয় দেশ আক্রান্ত হলে নিরাপত্তার স্বার্থে তারা নিজ জলসীমায় জাহাজ চলাচল সীমিত বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ পশ্চিমা দেশগুলোকে জলদস্যুদের সঙ্গে তুলনা করে রুশ রাষ্ট্রদূত বলেন, কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের হামলায় সমর্থন দিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো আইন লঙ্ঘন করছে। নেবেনজিয়া আরও বলেন, ‘জলদস্যুরা যেমন জাহাজে কঙ্কাল আঁকা কালো পতাকা উড়িয়ে আক্রমণ করে, পশ্চিমা দেশগুলো তেমনটা করে না। তারা তাদের বেআইনি কর্মকাণ্ডকে একতরফা জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থার (নিষেধাজ্ঞা) আড়ালে লুকোনোর চেষ্টা করছে।’
নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে হরমুজ পার হলো রুশ প্রমোদতরী ‘নর্ড’ : ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে রুশ ধনকুবের আলেক্সি মোর্দাসোভের মালিকানাধীন প্রমোদতরি ‘নর্ড’। প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা) মূল্যের এই বিশাল ইয়টটি গত রোববার (২৬ এপ্রিল) ভোরে ওমানের মাসকাট বন্দরে নোঙর করে। খবর বিবিসির। শিপিং ডেটা অনুযায়ী, ৪৬৫ ফুট দৈর্ঘ্যের এই প্রমোদতরি গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) গ্রিনিচ মান সময় ১৪:০০টায় দুবাই মেরিনা থেকে যাত্রা শুরু করে। শনিবার সকালে এটি অত্যন্ত কড়া পাহারায় থাকা হরমুজ প্রণালি পার হয়। বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কারণে এই পথ দিয়ে সাধারণ যান চলাচল প্রায় বন্ধ। যেখানে আগে দৈনিক গড়ে ১৪০টি জাহাজ চলত, সেখানে বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ যাতায়াতের অনুমতি পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি ব্যক্তিগত বিলাসতরী কীভাবে যাওয়ার অনুমতি পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্টিল ব্যবসায়ী আলেক্সি মোর্দাসোভ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। যদিও নর্ড-এর মালিক হিসেবে তার নাম সরাসরি নেই, তবে ২০২৫ সালের রেকর্ড অনুযায়ী এটি তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি রুশ ফার্মের নামে নিবন্ধিত। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই এই চলাচলের মূল চাবিকাঠি বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে দেশ দুটির মধ্যে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বৃদ্ধির চুক্তির পর এই সম্পর্ক আরও জোরালো হয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের বৃহত্তম ইয়টগুলোর অন্যতম এই ‘নর্ড’-এ রয়েছে ২০টি স্টেরুম বা বিলাসবহুল শয়নকক্ষ, সুইমিং পুল, হেলিপ্যাড এবং একটি ব্যক্তিগত সাবমেরিন। বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন মানতে বাধ্য নয় ইরান : ইরান জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বা ‘আনক্লজ’ মেনে চলতে আইনিভাবে বাধ্য নয় বলে জানিয়েছেন, জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাইদ ইরাভানি। সোমবার (২৭ এপ্রিল) দেওয়া এই বিবৃতিতে তিনি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সাম্প্রতিক কঠোর নৌ-পদক্ষেপগুলোর পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। ইরাভানি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে উপকূলীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ নৌ-চলাচলের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতেই তেহরান এই বিশেষ ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করেছে। মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে ইরানের এই অনড় অবস্থানকে বর্তমান সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাতিসংঘ পরমাণু সম্মেলনের সহ- সভাপতি নির্বাচিত ইরান, বিতণ্ডায় জড়াল আমেরিকা : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই জাতিসংঘের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) পর্যালোচনা সম্মেলনে অন্যতম সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছে ইরান। এ ঘটনায় তেহরানের সঙ্গে জাতিসংঘে বিতণ্ডায় জড়াল যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের এ নির্বাচনকে এনপিটি চুক্তির প্রতি ‘উপহাস’ বলে বর্ণনা করেছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান তাদের পারমাণবিক দায়বদ্ধতা পালনে ব্যর্থ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গেও পূর্ণ সহযোগিতা করছে না। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
মার্কিন অবরোধের মধ্যেই ইরানি বন্দরের কাছে তেল ট্যাংকারের ভিড় : হরমুজ প্রণালির বাইরে ইরানের চাবাহার বন্দরের কাছে বেশ কিছু তেল ট্যাংকার জড়ো হয়েছে। ব্লুমবার্গের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবিতে এ দৃশ্য ধরা পড়েছে। ছবিতে দেখা গেছে, ওই এলাকায় অন্তত আটটি বড় তেল ট্যাংকার ও বেশ কিছু ছোট জাহাজ অবস্থান করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ভিড় দেখে বোঝা যায়, ইরান এখনো তেল উত্তোলন ও তা জাহাজে বোঝাই করা অব্যাহত রেখেছে। তবে এটি মার্কিন নৌ- অবরোধের প্রভাবকেও স্পষ্ট করে তুলছে। ইরানি বন্দরের ওপর এ অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে ইরানের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে তেল রপ্তানি রুটের মুখে এ জট তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি অবরোধ, ইরানের জাহাজ জব্দ করল যুক্তরাষ্ট্র : হরমুজ প্রণালি ও ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অবরোধের অংশ হিসেবে একটি ইরানি পতাকাবাহী তেলের ট্যাংকার জব্দ করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, তাদের গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ‘ইউএসএস রাফায়েল পেরাল্টা’ অভিযান চালিয়ে ‘এম/টি স্ট্রিম’ নামের ওই ট্যাংকারটি থামিয়ে দেয়। সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, ট্যাংকারটি অবরোধ অমান্য করে ইরানের একটি বন্দরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।
ইরানের দেওয়া প্রস্তাব ট্রাম্পের গ্রহণ না করার ইঙ্গিত : ইরানের দেওয়া সাম্প্রতিক প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রহণ করবেন না বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয়ে অবগত কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে ট্রাম্প তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের এ প্রস্তাব অনুমোদনের সম্ভাবনা ‘খুবই কম’। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যুর সমাধান না করে শুধু হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে চুক্তি করলে তা আলোচনায় ওয়াশিংটনকে দুর্বল করে তুলবে। হোয়াইট হাউসের একজন সহযোগী জানিয়েছেন, ‘মার্কিন জনগণের স্বার্থ রক্ষা না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসন কোনো চুক্তিতে যাবে না।’ পাশাপাশি তেহরানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আসলে কার হাতে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ মানবে না যুক্তরাষ্ট্র- রুবিও : মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ‘কোনো আন্তর্জাতিক জলপথ কে ব্যবহার করবে তা ইরান ঠিক করবে—এটি কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।’ স্থানীয় সময় সোমবার (২৭ এপ্রিল) তিনি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন।