ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দুর্ভোগে ১০ লাখ বানবাসি

দুর্ভোগে ১০ লাখ বানবাসি

দেশে সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। দেশের ৭টি জেলায় আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জনে। গতকাল সোমবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭টি জেলা বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতির শিকার। বন্যাকবলিত এই জেলাগুলো হলো— খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জেলাগুলোর মোট ৫৯টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া উপদ্রুত অঞ্চলগুলোর ৩৩৪টি ইউনিয়ন এবং ১২টি পৌরসভা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পানিতে বর্তমানে দেশের মোট ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। সব মিলিয়ে এই ৭টি জেলায় বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জনে। এই দুর্যোগের কবলে পড়ে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ৫৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আরও ৩৯ জন মানুষ আহত হয়েছেন। নিহত ও আহতদের জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, মৃত ৫৪ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজার জেলায়, সেখানে ৩১ জন মারা গেছেন। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। অপরদিকে আহত ৩৯ জনের মধ্যে কক্সবাজারে ২৪ জন, চট্টগ্রামে ১২ জন, বান্দরবানে ২ জন এবং খাগড়াছড়িতে ১ জন রয়েছেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও উপদ্রুত মানুষদের জরুরি আশ্রয় দেওয়ার জন্য সরকারিভাবে মোট ১ হাজার ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে এরইমধ্যে ৩৮ হাজার ৪২২ জন বিপন্ন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।

এদিকে, বানবাসী এলাকার মানুষ নিদারুণ কষ্টে সময় অতিবাহিত করছে। অনেক মানুষ সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে তাদের পাশে থাকারও চেষ্টা করছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ৫৯টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা।

এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৫১ জন। এর মধ্যে কক্সবাজারে ২৮ জন, চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে একজন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। বর্তমানে ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন। সরকারি বিভিন্ন সূত্র বলছে, নগদ অর্থ ও চালের পাশাপাশি শুকনা খাবার, ঢেউটিনসহ অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে।

বাড়ছে মানবিক সংকট : এখন পর্যন্ত দেশের সাত জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ লাখের বেশি মানুষ। পাহাড়ধস, পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে প্রাণ গেছে অন্তত ৫১ জনের। দুই লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার এখনো পানিবন্দি। হাজারো মানুষের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, ফসলি জমি পানির নিচে, বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট এবং জীবিকার পথ কার্যত বন্ধ।

এমন বাস্তবতায় দুর্গত মানুষের জন্য সরকার গত ছয় দিনে নগদ অর্থ বরাদ্দ করেছে মাত্র ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। সরকারি হিসাবেরই এই অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের মাথাপিছু পড়ছে মাত্র ২৮ টাকা। একই সময়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল, যা ব্যক্তি হিসেবে ভাগ করলে দাঁড়ায় প্রায় ৩ দশমিক ২ কেজি। অর্থনীতিবিদ ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি প্রাথমিক সহায়তা হলেও যে পরিসরের মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, সেখানে এই বরাদ্দ খুবই নগন্য। এটা দিয়ে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা, আশ্রয় ও পুনর্বাসনের যে বৃহৎ চাহিদা তৈরি হয়েছে তা পূরণ করা সম্ভব নয়। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে সামনে আরও বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট তৈরি হতে পারে।

উত্তরের ৪ জেলায় ফের বন্যার আশঙ্কা, পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে : তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে রংপুর বিভাগের ৪ জেলায় ফের স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় এসব নদীর নিম্নাঞ্চলে সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতির অবনতিও হতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে তিস্তা নদীর পানি সকাল ৯টায় রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টে সতর্কসীমায় পৌঁছে বিপদসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে অন্য সব নদীর পানির উচ্চতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত রবিবার রাতে বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে এবং তৎসংলগ্ন উজানে ভারতের মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও রংপুর জেলার তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে কিছু কিছু স্থানে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এ সময় নদীগুলোর নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। পরবর্তী ৭২ ঘন্টায় পানি কমতে পারে।

বন্যাকবলিত ১১ জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল- স্বাস্থ্যমন্ত্রী : বন্যাকবলিত দেশের পূর্বাঞ্চলের ১১ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। এসব জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বন্যাকবলিত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ১১ জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা হয়েছে। কোথাও যেন কোনো রোগী চিকিৎসাবঞ্চিত না হন, সেজন্য পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন, অ্যান্টিভেনম, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকেও অতিরিক্ত মেডিকেল টিম পাঠানো হবে। তিনি বলেন, কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। এতে যোগাযোগ, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হলেও সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে।

মন্ত্রী জানান, একটি হাসপাতালের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়লে রাতেই চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা সরঞ্জাম নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। ১১ জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা হয়েছে।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ ১১টি জেলাকে বন্যাকবলিত হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিটি জেলার সার্বিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি তদারকির জন্য একজন করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সার্বক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের কাজ করছে। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু ও দুর্গম এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সাপে কাটার ঘটনা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বন্যার সময় সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আগেই সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মানুষকে ওঝার কাছে না গিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বন্যার প্রথম রাতে পাঁচজন সাপে কাটা রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়েছে এবং সবাই সুস্থ আছেন বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বন্যাকবলিত এলাকায় বিভিন্ন হাসপাতালে সাপে কাটা ৯৫ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন এবং সবাই সুস্থ আছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে এক হাজারের বেশি ভায়াল অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। জেলা পর্যায়ে ২১ হাজার ভায়াল সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আরও ২৫ হাজার ভায়াল যুক্ত হবে। ফলে অ্যান্টিভেনম সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই।

হু হু করে বাড়ছে মুহুরী নদীর পানি, আতঙ্কে নদীতীরের মানুষ : ফেনীতে টানা বর্ষণ ও ভারতের উজানের ঢলে মুহুরী নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হলে দ্রুতই নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা। গতকাল সোমবার দুপুর ৩টার দিকে মুহুরী নদীতে পানির স্তর রেকর্ড করা হয় ১১ দশমিক ৪৫ মিটার। এটি বিপৎসীমার ১ দশমিক ১০ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীটির বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৫৫ মিটার।

টানা বৃষ্টি ও নদীর পানি বাড়তে থাকায় নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, প্রতিবছর বর্ষা এলেই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি সম্প্রতি একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকার ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিও জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।

সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা : সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর চারটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগামী দুই দিনে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ হতে পারে। গতকাল সোমবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল ইসলাম শোভনের সই করা বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পরিস্থিতি এবং পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়।

পূর্বাভাসে বলা হয়, পর্যবেক্ষণাধীন স্টেশনগুলোর মধ্যে সুরমা নদীর ছাতক (সুনামগঞ্জ), কুশিয়ারা নদীর মারকুলি (সুনামগঞ্জ) ও ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) এবং সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা (নেত্রকোণা) স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে এবং ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বেড়েছে। এ প্রবণতা আরও দুই দিন অব্যাহত থেকে তৃতীয় দিনে স্থিতিশীল থাকতে পারে। ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে।

উপদাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপরে : টানা ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোণার প্রধান নদ-নদীর পানি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলার সীমান্ত উপজেলা কলমাকান্দায় উপদাখালী নদীর পানি এরইমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। তবে পানি বৃদ্ধি পেলেও জেলায় এখন পর্যন্ত বড় কোনো বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি এবং লোকালয়ে পানি ঢোকেনি বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

নেত্রকোণা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার কলমাকান্দা পয়েন্টে উপদাখালী নদীর পানি গতকাল সোমবার সকাল ৯টায় বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার (০.০৮ মিটার) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই পয়েন্টে পানির বর্তমান সমতল ৬.৬৩ মিটার (বিপৎসীমা ৬.৫৫ মিটার)। নদীটির পানি বৃদ্ধির প্রকোপ এখনও অব্যাহত রয়েছে।

এ বিষয়ে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম বলেন, নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও এখন পর্যন্ত কোনো বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি এবং লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।

মৌলভীবাজারে গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে বন্যাকবলিত মানুষ : চলমান বন্যায় মৌলভীবাজারে গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ। কারণ, বন্যায় জেলার কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর ও সদর উপজেলার প্রায় ২৮ ইউনিয়নে ডুবে গেছে মানুষের বসতঘর ও চারণ ভূমি। এতে করে গো-খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। খাদ্যের অভাবে অনেক গবাদিপশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় অনেকে গরু বিক্রি করতেও পারছেন না। বন্যার পানি কমে আসলেও গোখাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। সরেজমিনে জেলার রাজনগর, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, জেলার নদনদীর পানি কমায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বন্যাদুর্গত মানুষেরা সবচেয়ে বেশি গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। বিস্তীর্ণ এলাকা কয়েকদিন পানিতে তলিয়ে থাকায় গোখাদ্য পঁচে নষ্ট হয়েছে। পশু চরানোর জায়গা না থাকায় অনেকেই উঁচু জায়গায় গবাদিপশু বেঁধে রেখেছেন। কোথাও কোথাও সড়কের ওপর বেঁধে রাখা হয়েছে। কেউ কেউ গবাদিপশুকে ধানের কুঁড়া খাওয়াচ্ছেন।

সাতকানিয়ায় বন্যা- পাঁচদিন পর ঘর থেকে বের হলাম, খুব কষ্টে আছি : চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের তেমুহানী গ্রামের প্রায় দুই হাজার পরিবার পাঁচদিন ধরে পানিবন্দি। বান্দরবান থেকে সাঙ্গু নদী বেয়ে আসা পানি, ভারি বৃষ্টি আর স্থানীয় নয়া খাল, ডলু খাল ও গরলা খালে পানি নামার ব্যবস্থা না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে ভাষ্য স্থানীয়দের। গতকাল সোমবার দুপুরে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের নয়া খালের মুখ এলাকায় মহাসড়ক থেকে তেমুহানী গ্রামের দিকে যাওয়া সড়কটি প্রায় ১০ ফুট পানির নিচে। এ গ্রামের প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় আছে। কেউ কেউ জরুরি প্রয়োজনে নৌকায় চলাচল করছে। স্থানীয়রা জানান, বুধবার এলাকায় পানি বাড়তে থাকে। বৃহস্পতি ও শুক্রবার পানি ছিল সবচেয়ে বেশি। গত শনিবার থেকে পানির উচ্চতা কমেছে। তবে এলাকা থেকে পানি সরেনি। নৌকা নিয়ে গ্রামের দিকে রওনা হয়ে দেখা গেল, গ্রামটির উত্তর দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলালাইন। পূর্ব দিকে এগোতেই লোকজনের নৌকায় করে আসা-যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ল।

নৌযাত্রী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি রোগী নিয়ে বৈদ্যবাড়ি যাচ্ছি। এখানে গাড়িতে করেই আসতাম। এখন এত পানি নৌকা ছাড়া উপায় নাই।’ বৈদ্যবাড়ির গেইটে দেখা যায়, কয়েকটি নৌকায় বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লোকজন। মহাসড়ক থেকে বৈদ্যবাড়ি পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হচ্ছিল ৩০ টাকা করে। আরেকটু এগোতেই দেখা গেল, গ্রামের মূল রাস্তা ধরে বুক সমান পানি ঠেলে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দা আবুল বশর। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘এবার বেশি পানি উঠছে। ২০২৩ সালেও পানি উঠছিল। কিন্তু এবার বেশি। আমার স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে ঘরে আটকা ছিলাম গত ৫ দিন। ‘আজকে ঘর থেকে বের হলাম। খুব কষ্টে আছি। ঘরের ভেতর পানি ঢুকছিল। আজকে একটু কমছে। ‘দুই-তিন পক্ষ থেকে ত্রাণ নিয়ে লোক আসছিল। সরকারি আর ব্যক্তিগতভাবে দুজন, তারা যা পারছে দিছে।’

ছাতা মাথায় পানি ঠেলে হেঁটে আসা স্থানীয় মুদি দোকানি আবদুল গনি বলেন, ‘আমাদের এলাকার নয়া খাল ভরাট। সেজন্য পানি নামতে পারতেছে না। এবার পানি অন্যবারের চেয়ে বেশি। দোকান বন্ধ। আয় রোজগারও বন্ধ।’

নৌকায় গ্রামের আরও কিছু এলাকা ঘুরে তেমুহানী হিন্দু পাড়ার সামনে দেখা বিজলী তালুকদার কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, ‘বুধবার ঘরে ঢুকছি। আজকে বের হলাম। আমরা কোনো ত্রাণ পাইনি। কেউ কেউ ত্রাণ পাইছে।’ ফিরতি পথে নৌকায় চড়েন সুজন কান্তি সুশীল। এ গ্রামের বাসিন্দা সুজন যাচ্ছিলেন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দিকে।

সুজন কান্তি সুশীল বলেন, ‘গ্রামে যাদের দোতলা বাড়ি আছে, তারা রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু যাদের একতলা বাড়ি, তাদের সবার বাড়িতে পানি ঢুকেছে। এখানে বন্যা হয়- পাহাড় মানে বান্দরবান থেকে নেমে আসা পানিতে। মহাসড়কের পশ্চিম পাশে যে ডলু খাল, সেটা দিয়ে ইট ভাটার জন্য পানি নামতে পারে না। পূর্ব পাশে (গ্রামের অংশে) নয়া খালও পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়েছে। সেটাও ভরাট। না হলে এতদিন পানি জমে থাকত না।’ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে চা দোকান চালান মো. ওসমান। তার দোকানেও বৃহস্পতিবার পানি ঢুকেছিল। তেমুহানী গ্রামের বাসিন্দা ওসমানের ঘরেও পানি ঢুকেছিল। তিনি বলেন, ‘অনেক ত্রাণের গাড়ি দেখেছি। স্থানীয় বিএনপির এমপি এবং বিরোধীদলের লোকজন ত্রাণ দিচ্ছে। কিন্তু যাদেরকে ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব দিছে, তারা কাদের ত্রাণ দিচ্ছে- সেটা তারাই জানে। ‘আমরা ত্রাণ পাইনি। গ্রামের সামনের দিকের বাড়ির লোকজন কিছু পেয়েছে। ভেতরের দিকে কেউ যায় না।’ ফেরার পথে দেখা ‘দেওয়ানহাট ব্লাড ব্যাংক’-এর একটি দলের সঙ্গে। তারা নৌকায় করে রান্না করা খাবার ও ওষুধ নিয়ে তেমুহানী গ্রামের পথ ধরছিলেন। দেওয়ানহাট ব্লাড ব্যাংকের সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা খাবার, পানি ও ওষুধ নিয়ে এসেছি। যতটুকু পারি দিব।’ গত রোববার রাত পর্যন্ত ছয় লাখের বেশি মানুষের পানিবন্দি থাকার তথ্য দিয়েছে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়। জেলায় এবারের বন্যায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৫ জুলাই থেকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালীর অনেক জায়গা প্লাবিত হয়। এ বন্যায় চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা। গত রোববার রাতে দেওয়া সরকারি হিসাবে, চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার মোট ১৫২টি পৌরসভা ও ইউনিয়ন এবারের বন্যায় আক্রান্ত। এর মধ্যে সাতকানিয়ার ১৮টি ইউনিয়ন পড়েছে বন্যার কবলে; প্লাবিত হয়েছে উপজেলার ৮৫ শতাংশ এলাকা।

জেলার ১৫ উপজেলার মোট ৪০৭টি আশ্রয় কেন্দ্র আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা রোববার রাত পর্যন্ত ছিল ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। তারমধ্যে সাতকানিয়া উপজেলার ৯৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ৮৭৩০ জন আশ্রয় কেন্দ্রে আছেন। বন্যায় উপজেলাগুলোর মোট ১১৯৬ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের মধ্যে ১৮৭ কিলোমিটারই সাতকানিয়ায়। জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মোট ১১ হাজার ৬১৪টি বসতবাড়ির মধ্যে একক উপজেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ২৪৮০টি বসতবাড়িই সাতকানিয়ার। গত রোববার রাত পর্যন্ত সরকারি হিসাবে সাতকানিয়াতে ১০০ টন চাল এবং নগদ ৯ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলায় চালের চাহিদা আরও ৫০০ টন, আর নগদ টাকা প্রয়োজন আরও ১০ লাখ। সঙ্গে ঘরবাড়ি মেরামতে ৫০০ বান্ডিল ঢেউটিন দরকার। এবারের বন্যায় সাতকানিয়া উপজেলার ৯টি সেতু-কালভার্ট ভেঙেছে। জেলায় বন্যায় যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, তার মধ্যে তিনজন মারা গেছেন সাতকানিয়ায়। গত রোববারের হিসাবে জেলার ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৭০টি পরিবারের প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় ছিল।

সেদিন সন্ধ্যায় সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেছিলেন, বিভিন্ন স্থানে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে তা পুরোপুরি কোথাও নামেনি। এদিকে সাঙ্গু নদীর পানিও কমতে শুরু করেছে। পানি নেমে গেছে সাতকানিয়া-বান্দরবান সড়ক থেকেও। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সোমবার সকাল ৯টায় সাঙ্গু নদীর দোহাজারী অংশের পানি বিপৎসীমার ১১৫ সেন্টিমিটার নিচে প্রবাহিত হচ্ছিল। গতকাল সোমবার বেলা ৩টার দিকে তেমুহানী গ্রাম থেকে ফেরার পথে রোদের দেখা মিলছে ৯ দিন বাদে। তখনও সাতকানিয়া উপজেলার বিস্তৃর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে ছিল।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত