
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোতে পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ফুট ওভারব্রিজ। কিন্তু সেই নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থাই এখন অনেক ক্ষেত্রে পথচারীদের জন্য হয়ে উঠেছে ভোগান্তি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণ। কোথাও ওভারব্রিজ দখল করে বসেছে দোকানপাট, কোথাও ভাসমান মানুষের আস্তানা। কোথাও আবার মাদকাসক্তদের আড্ডা। কোনোটি অন্ধকারে ডুবে থাকে, কোনোটি অচল এস্কেলেটরের কারণে ব্যবহার অনুপযোগী। আবার প্রয়োজনীয় এলাকায় মাসের পর মাস সংস্কারের নামে বন্ধ রাখা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ওভারব্রিজ। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এসব স্থাপনার একদিকে যেমন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অন্যদিকে রয়েছে অবৈধ দখল ও নজরদারির ঘাটতি। ফলে যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার কথা, সেখানে অনেকেই এখন ওভারব্রিজ এড়িয়ে ব্যস্ত সড়কের নিচ দিয়ে পার হচ্ছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মিরপুর, ফার্মগেট, পরীবাগ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের কয়েকটি ফুট ওভারব্রিজ সরেজমিন ঘুরে পাওয়া গেছে এমনই চিত্র।
ওভারব্রিজে দোকান, আড্ডা, দখল
ফার্মগেট মোড়ের ওভারব্রিজে উঠলেই মনে হয় ছোটখাটো একটি বাজার। নারী-পুরুষ ও শিশুদের পোশাক, গয়না, বেল্ট, মোজা, ব্যাগ, সানগ্লাস, খেলনা, সুগন্ধি, চুলের ব্যান্ড-ক্লিপ, হেডফোন ও চার্জার— কী নেই সেখানে! এর সঙ্গে রয়েছে বাদাম, আমড়া, ছোলা, ঝালমুড়ি ও মোবাইল সিম বিক্রির দোকান। বসানো হয়েছে পাঞ্চিং বক্স ও ওজন মাপার ব্যবস্থাও। ফলে পথচারীদের জন্য নির্ধারিত জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে। ব্যস্ত সময়ে ব্রিজের ওপর তৈরি হচ্ছে জটলা। অনেক সময় হাঁটার জায়গাও মেলে না। পথচারী কাওসার হোসেন বলেন, 'এটা তো একটা মার্কেট। ব্রিজে এমনিতেই মানুষ বেশি, তার ওপর দোকানপাটে ভর্তি। হাঁটব কোথা দিয়ে? মাঝে মাঝে জ্যামও লাগে।' সামসুল ইসলাম বলেন, 'ব্রিজটা আগের চেয়ে চওড়া করে বানানো হলো। অথচ দোকানে ভরে গেল। দুটি এস্কেলেটরের একটি ছয় মাসের বেশি সময় ধরে নষ্ট।'
ফার্মগেটের ওভারব্রিজের দুটি এস্কেলেটরের একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল। বাঁশ দিয়ে সেটি আটকে রাখা হয়েছে। সেখানে ৩ বছর ধরে ব্যবসা করা এক বিক্রেতা বলেন, 'কখনও কেউ উঠিয়ে দেয়নি।' আরেক বিক্রেতা মো. রিয়াজের দাবি, স্থায়ীভাবে যারা ব্যবসা করেন, তাদের সাধারণত সরানো হয় না। তবে ভিআইপি মুভমেন্ট থাকলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। ঢাকা মহানগর পুলিশ অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬-এর ৬৯ ধারায় রাস্তা বা জনসাধারণের স্থানে বিধিবহির্ভূতভাবে পণ্য প্রদর্শন বা বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখার শাস্তির বিধান রয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু আইনে বিধান থাকার পরও ফার্মগেটের মতো ব্যস্ত ওভারব্রিজে দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে স্থায়ী দোকানপাট চলছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কোথাও ভিড়, কোথাও ভাসমানদের দখল
মিরপুর ১ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১০ নম্বর গোলচত্বরের পথে রয়েছে চারটি ওভারব্রিজ। এর মধ্যে মিরপুর ১ ও ১০ নম্বরের ব্রিজে পথচারীর চাপ বেশি। কিন্তু মিরপুর ১০ নম্বরের ব্রিজটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের জন্য বন্ধ। অন্যদিকে মিরপুর ২ নম্বরের সনি হলের পাশে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে থাকা ওভারব্রিজে সারাদিনে হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ পারাপার হন। শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশের ব্রিজেও পথচারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। এর মধ্যে দুটি ব্রিজেই অবস্থান নিয়েছেন ভাসমান মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা তানভীর হুসাইন বলেন, 'এখানে আসলে ওভারব্রিজের কোনো প্রয়োজন নেই। এখান দিয়ে কাউকে পার হতেও দেখি না। উল্টো রাতে আড্ডা হয়। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে টাকা খরচ করা উচিত।'
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সেহরান সোবহান আদিব বলেন, 'আমাদের ওভারব্রিজগুলো এখনো ব্যাকডেটেড। অনেক কনজাস্টেড। জনসংখ্যার তুলনায় এগুলো আরও প্রশস্ত করা উচিত। আবার বিভিন্ন ব্যানারে প্রায় ঢেকে থাকে ব্রিজের চারপাশ। এতে দেখতে খারাপ লাগার পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়ও থাকে।'
মিরপুর ১ নম্বরের ওভারব্রিজে চার বছর ধরে মোবাইল সিম বিক্রি করেন মো. মিজান। তার ভাষায়, সিটি কর্পোরেশনের লোকজন মাঝেমধ্যে তুলে দেয়, পরে আবার তারা বসেন। অর্থাৎ উচ্ছেদ হচ্ছে, কিন্তু দখলমুক্ত থাকছে না ওভারব্রিজ।
তিন মাস ধরে বন্ধ মিরপুর ১০-এর ব্রিজ
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকাগুলোর একটি। চার রাস্তার মোড় হওয়ায় এখানকার ওভারব্রিজ দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ পারাপার হন। জুলাই আন্দোলনের সময় ব্রিজের নিচে থাকা পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হলে ওভারব্রিজটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন পর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন মেরামতের কাজ শুরু করলেও প্রায় তিন মাস ধরে কাজ চলায় দুর্ভোগে পড়েছেন পথচারীরা। ব্রিজের নিচে জুতা সেলাই করা প্রকাশ দাস বলেন, 'পূর্ব পাশে ওঠা বন্ধ করে মেরামতের কাজ চলছে তিন মাসের বেশি হয়েছে। এখন পশ্চিম পাশও বন্ধ করেছে আড়াই মাসের বেশি। সাইনবোর্ড লাগিয়ে রেখেছে যে কাজ চলছে। কিন্তু কাজ শেষ হয় না।' ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সিরাজ সরদার বলেন, 'এতদিন ধরে বন্ধ করে রেখে মানুষকে বিপদে ফেলেছে। সবাই এখন নিচ দিয়ে রাস্তা পার হয়। কাজও নিয়মিত হয় না।'
পথচারী মহসিন রেজার আশঙ্কা, ব্যস্ত সড়কে ওভারব্রিজ বন্ধ থাকায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে দায়িত্বে থাকা এক ট্রাফিক পুলিশ বলেন, ওভারব্রিজ থাকলেও অনেক পথচারী নিচ দিয়ে রাস্তা পার হতে চান। পুলিশ তাঁদের ওভারব্রিজ ব্যবহারের জন্য বললেও অনেকে তা মানেন না।
হাসপাতালের সামনে রোগীদেরও ভোগান্তি
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের ওভারব্রিজের চিত্র আরও দুর্ভোগের। হাসপাতালের গেটের পাশের এস্কেলেটর দীর্ঘদিন ধরে বিকল। বাঁশ ও গাছের ডাল দিয়ে সেটি বন্ধ রাখা হয়েছে। সিঁড়ির সামনেও জমে আছে ময়লা। অন্য পাশের এস্কেলেটরটি কখনও চলে, কখনও বন্ধ থাকে। এর মধ্যে ব্রিজের ওপর অবস্থান নিয়েছেন ভাসমান মানুষ। অসুস্থ রোগী ও তাদের স্বজনদের নিয়মিত এই ওভারব্রিজ ব্যবহার করতে হয়। ফলে অচল এস্কেলেটর, ময়লা-আবর্জনা ও ভাসমান মানুষের অবস্থান তাদের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
সংস্কারের পরও পথচারী নেই
পরীবাগের ওভারব্রিজটিও দীর্ঘদিন চলাচলের অযোগ্য থাকার পর সম্প্রতি সংস্কার করে চালু করা হয়েছে। কিন্তু সংস্কারের পরও সেখানে পথচারীর চলাচল কম। বর্তমানে ব্রিজটিতে অবস্থান করছেন ভাসমান মানুষ। ফলে প্রশ্ন উঠছে— কোথায় ওভারব্রিজের প্রয়োজন, কোথায় প্রয়োজন নেই, সেটি কি যথাযথ সমীক্ষা করে নির্ধারণ করা হচ্ছে? আর নির্মাণের পর সেগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্বই বা কার? শুধু নতুন স্থাপনা নির্মাণ নয়, বিদ্যমান ওভারব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, আলো, পরিচ্ছন্নতা এবং দখলমুক্ত রাখার বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পথচারীরা।
'নিয়মিত নজরদারি করা হয়'
ফার্মগেট ও আসাদগেটসহ এসব এলাকার ওভারব্রিজে পথচারীদের নিরাপত্তা ও অবৈধ দোকানপাটের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, 'আমরা ওভারব্রিজগুলোকে টার্গেট করে এসি পেট্রোল পিআইয়ের মাধ্যমে কাজ করি, যাতে সেখানে স্থায়ীভাবে দোকানপাট বসতে না পারে। এ বিষয়গুলো নিয়মিত নজরদারি ও মনিটরিং করা হয়।' তিনি আরও বলেন, 'ওভারব্রিজ ও এর আশপাশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মনিটর করতে টহল টিমগুলোকে বলা হয়। তারা সেখানে ওঠানামাকারীদের ওপরও নজর রাখে।' ফার্মগেট ও আসাদগেট ওভারব্রিজের চিত্র জানানো হলে ডিসি মিজান বলেন, 'ফার্মগেট ওভারব্রিজের বিষয়ে আমি এখনই আমাদের টিম পাঠাচ্ছি। আশপাশে আমাদের টিম আছে। আর আজ সন্ধ্যায় আসাদগেটে টিম পাঠাব এবং অভিযান হবে।'
রাজধানীর ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল পথচারীদের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে কোথাও দোকানপাট, কোথাও ভাসমান মানুষের অবস্থান, কোথাও মাদকাসক্তদের আড্ডা, কোথাও অন্ধকার ও অচল এস্কেলেটর— সব মিলিয়ে অনেক ওভারব্রিজই এখন সেই উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত।
একদিকে পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে স্থাপনা নির্মাণ, অন্যদিকে সেই স্থাপনা দখল, অব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়া— এই বৈপরীত্যই সামনে এনেছে বড় প্রশ্ন: ওভারব্রিজ কি সত্যিই পথচারীর নিরাপত্তার জন্য, নাকি নির্মাণের পর সেটিকে দেখভালের দায়িত্বটাই হারিয়ে যায়? সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষের প্রয়োজন বিবেচনা করে ওভারব্রিজ নির্মাণ ও পরিচালনা করা না গেলে বিপুল অর্থের এসব স্থাপনা শেষ পর্যন্ত পথচারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে ভোগান্তির কারণই হয়ে থাকবে।