ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

একের পর এক বন্ধ হচ্ছে পোশাক কারখানা

একের পর এক বন্ধ হচ্ছে পোশাক কারখানা

শিল্পকারখানা অধ্যুষিত সাভার ও আশুলিয়ায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের পর অন্তত ২৬৪টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে কয়েকদিন ধরে আন্দোলন করছেন পোশাকশ্রমিকরা। গতকাল সোমবার বিকেলে শিল্পপুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভুঁইয়া ঢাকা পোস্টকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে সকাল থেকে সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শ্রমিকরা জানান, ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতন, কালো তালিকাভুক্তিকরণ বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন তারা।

সকালে তিন দফা দাবিতে নবীনগর-চন্দ্রা সড়কের বাড়ইপাড়া এলাকায় পোশাক শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নেন। পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। অপরদিকে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে থেমে কর্মবিরতি পালন করেন। পরে তারা বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে এসে জড়ো হন। এসময় নিট এশিয়া, আল-মুসলিম, ট্রাউজার লাইন, অনন্ত গার্মেন্টসসহ বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানা গতকালের মতো আজও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। পরে পোশাক শ্রমিকরা সড়কে এসে অবস্থান নিলে পুলিশ বাধা দেয়।

এসময় শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়লে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। উত্তেজিত পোশাক শ্রমিকরা নরসিংহপুর এলাকায় একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগ করে। শ্রমিক-পুলিশ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা সৃষ্টি হয়।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পিকার্ড বাংলাদেশ লিমিটেড, আর্টিস্টিক ডিজাইন, জনরন সোয়েটার লিমিটেড, ফেরারি গার্মেন্টস লিমিটেড, ডেনিটেক্স লিমিটেড, আনলিমা টেক্সটাইল লিমিটেড, আল ইসলাম টেক্সটাইল লিমিটেড, জি.কিউ. ইন্ড্রাস্ট্রিজ পোশাক কারখানার সামনে থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়ে ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় সেখানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এসময় দুই পোশাক শ্রমিককে আটক করে পুলিশ। শিল্পপুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, তিন দফা দাবিতে শিল্পাঞ্চল সাভারে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এর পেক্ষিতে সাভার ও আশুলিয়ায় ২৬৪টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এ দুই শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গাজীপুরে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি : ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিজিবি যৌথ অভিযান চালালে সংঘর্ষ বাধে। বিশৃঙ্খলা এড়াতে দেড় শতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সকাল থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈরের সফিপুর পল্লী বিদ্যুৎ এবং চন্দ্রা মোড় এলাকায় হাজার হাজার শ্রমিক জড়ো হতে শুরু করেন। নির্ধারিত কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই তারা সড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থনৈতিক করিডোরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং দূরপাল্লার যানবাহনগুলো দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। শ্রমিকদের এই আকস্মিক সড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে থাকে এবং শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। বেলা ১১টার দিকে মহাসড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করতে পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা যৌথভাবে অ্যাকশনে যান।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রথমে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। পরে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে ধাওয়া দিলে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের একটি অংশ পুলিশ ও বিজিবিকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। আন্দোলনকারীদের নিক্ষিপ্ত ইটের আঘাতে বিজিবির একজন সদস্য গুরুতর আহত হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এর কিছু সময় পর দুপুর ১২টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর নাওজোর এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। সেখানে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশের একাধিক গাড়ি ভাঙচুর করেন এবং পরবর্তীতে একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। আকস্মিক এই হামলায় পুলিশের গাড়িগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীরাও এই সহিংসতার শিকার হন।

নাওজোর এলাকায় সংবাদ সংগ্রহকালে সময় টেলিভিশনের একজন রিপোর্টার এবং একজন ক্যামেরাপারসনের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় তাদের ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয় এবং মারধর করা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর হামলা, শারীরিক নির্যাতন ও তাদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন জানান, ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের অব্যাহত বিক্ষোভের মুখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঝুঁকি এড়াতে দেড় শতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। পরিস্থিতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সে জন্য গাজীপুর জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ, শিল্প পুলিশ এবং বিজিবি সদস্যরা একযোগে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। যৌথ বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করেছে।

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম বলেন, 'সকালের দিকে মূল কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ শেষে নিজ নিজ ঘরে ফিরে গেছেন। তবে বর্তমান সময়ে সড়কে অবস্থান নিয়ে যারা নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের অনেকেই প্রকৃত শ্রমিক নয়; বরং তারা দেশকে অস্থিতিশীল করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকতে পারেন। এরপরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মিলিত ও তৎপর প্রচেষ্টার ফলে বেলা ১টার পর থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।'

এবার বেতন বৃদ্ধির দাবিতে নারায়ণগঞ্জে পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ : ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এতে সড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় অবস্থান নিয়ে অবরোধ শুরু করেন কয়েক হাজার শ্রমিক। এ সময় তারা লাঠিসোঁটা হাতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। বিক্ষোভকারী শ্রমিকেরা বলেন, তাদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফতুল্লার মেট্রো নিটিং, পলমল গার্মেন্টস, আবির ফ্যাশন, আজাদ-রিফাত ডাইং, লিবার্টি ও মিডল্যান্ডসহ কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা এ আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি শাহিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করেছেন। প্রথমে শিবু মার্কেট এলাকায় আন্দোলন শুরু হলেও পরে তা আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের ক্ষোভের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনার প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমেছেন। তবে গত কয়েক দিন নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকরা শান্ত ছিলেন।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, সড়ক অবরোধের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।

মিরপুরে সংঘর্ষ-আগুন, চার মামলায় আসামি সাড়ে ১০ হাজার : পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর মিরপুরে টানা দুই দিনের বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ, সংঘর্ষ ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় সাড়ে ১০ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল সোমবার দুপুরে মিরপুর মডেল থানা ও পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) এসব তথ্য জানান। মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, মিরপুরে ট্রাফিক বক্স ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মামলার বিষয়ে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন বলেন, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা ও ট্রাফিক বক্স ভাঙচুরের অভিযোগে তার থানায় তিনটি মামলা হয়েছে।

এসব মামলার বাদী পুলিশ। প্রতিটি মামলায় দুই থেকে আড়াই হাজার ব্যক্তিকে (অজ্ঞাতপরিচয়) আসামি করা হয়েছে। তিন মামলায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিবি পুলিশ বলছে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে মিরপুরে সহিংসতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। তাদের একটি অংশ অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছিল। আন্দোলনের আড়ালে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনাও ছিল তাদের।

মিরপুরে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। তারা স্থানীয় পোশাক কারখানার শ্রমিক নন। বিভিন্ন জেলা থেকে এসে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতার উদ্দেশ্যে মিরপুরে জড়ো হয়েছিলেন। সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে জনমনে আতঙ্ক ও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ডিবি। এদিকে গতকাল সোমবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকার একটি গলি দিয়ে শ্রমিকরা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে ধাওয়া দেয় পুলিশ। পাশাপাশি টিয়ার গ্যাসের কয়েকটি শেল ছোড়ে তারা। পরে মিরপুর-২ নম্বরে শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশের প্রশিকা মোড় এলাকাতেও শ্রমিকেরা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। তাদেরও সেখান থেকে সরিয়ে দেয় পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রূপনগর এলাকা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দলে দলে শ্রমিকেরা মিরপুর-২ নম্বরে স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে প্রশিকা মোড়ের দিকে আসতে থাকেন। তারা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এদিকে, পোশাক শ্রমিকদের টানা দুই দিনের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের পর সোমবার সকাল থেকে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সকাল থেকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা যায়। গোলচত্বরে পুলিশের দাঙ্গা দমনের যান, জলকামানসহ বিভিন্ন যানবাহন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মিরপুর-১০ নম্বর ও আশপাশের এলাকার সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। সড়কে কোনো বিঘ্ন দেখা যায়নি। পথচারী ও সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করছেন। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখা গেছে।

সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক : গতকাল সোমবার সকালে সচিবালয়ে পোশাক শিল্পের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরিতে কিছু শিল্পমালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি জড়িত। এসব ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ, অডিও ও অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। গতকালও কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনের নামে কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে একটি পক্ষ সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির ষড়যন্ত্র করছে, তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে।

আন্দোলনে শ্রমিক নন, এমন ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রকৃত কোনো শ্রমিক বা শ্রমিক সংগঠনের নেতা নিজেদের কর্মসংস্থান বিনষ্ট হোক, তা চাইবেন না। সাম্প্রতিক অস্থিরতার সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নেই বলে সরকার বিশ্বাস করে। তবে কোনো শ্রমিক সংগঠনের নেতা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তাদের সরে আসার আহ্বান জানান তিনি।

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গতকাল রোববার রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। এদিন সকাল আটটার দিকে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নেন। এতে আশপাশের এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।

বেলা সোয়া ১১টার দিকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিপেটা, জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করে। পরে শ্রমিকরাও বিভিন্ন দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। একপর্যায়ে দুপুরের দিকে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। সংঘর্ষের কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোস্টেশন বেলা ১১টা ৩৮ মিনিট থেকে ১টা ৫৮ মিনিট পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছিল। এর আগের দিন শনিবারও একই দাবিতে মিরপুরে সড়ক অবরোধ করেছিলেন পোশাকশ্রমিকরা। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত