
পোশাক শিল্পের জন্য মজুরি বোর্ড গঠনের পরও মিরপুরে যারা আন্দোলন করছেন, তাদের 'বিশেষ উদ্দেশ্য' রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ডিএমপির পিওএম দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার তৌহিদুল আরিফ। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে মিরপুর ১১ মেট্রো স্টেশনের সামনে তিনি বলেন, কিছু দুষ্কৃতিকারী সবকিছু নষ্ট করার চেষ্টা করেছে। তারা মিরপুর ১১ নম্বর সড়কে ব্যারিকেড দিয়েছিল। 'আপনারা দেখেছেন, আমরা কঠোর হাতে পরিস্থিতি দমন করেছি। প্রয়োজনে আরও কঠোর হব।' তৌহিদুল আরিফ বলেন, এখন যারা মাঠে রয়েছে, তাদের কেউই প্রকৃত অর্থে গার্মেন্টস কর্মী বা শ্রমিক বলে মনে হচ্ছে না। "তারা বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে মাঠে রয়েছে বলে আমাদের ধারণা। সে কারণে তাদের কঠোর হাতে দমনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।" পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাথর নিক্ষেপ করেছেন। মিরপুরের কালশী রোডে মঙ্গলবার এক পুলিশ সদস্যকে বেধড়ক মারধর করেন কয়েকজন। এতে কতজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি। উপকমিশনার তৌহিদুল আরিফ বলেন, গ্রেপ্তার ও আহতদের সঠিক সংখ্যা পরে জানানো হবে। তিনি বলেন, সড়কে যান চলাচলের পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। বিভিন্ন অলিগলিতে পুলিশ টহল দিচ্ছে। সেখানে কেউ অবস্থান করছেন কি না, তা দেখা হচ্ছে। কালশী রোডে এক পুলিশ সদস্য বেধড়ক মারধরের শিকার হওয়ার ভিডিওর বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তৌহিদুল আরিফ বলেন, ভিডিওটি তারা দেখেছেন। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমার ধারণা, প্রকৃত শ্রমিকরা এখন মাঠে নেই। তারা হয়তো ছুটির দিনে নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেছেন, অথবা গার্মেন্টসে কাজ করছেন। 'এখন যারা রয়েছে, তারা বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে মাঠে অবস্থান করছে বলে আমাদের মনে হচ্ছে।'
শ্রমিকের ছদ্মবেশে নাশকতার অভিযোগে নিষিদ্ধ সংগঠনের ৩৩ সদস্য গ্রেপ্তার : রাজধানীর মিরপুরে গার্মেন্টস শ্রমিকের ছদ্মবেশে নাশকতার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ৩৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকের ছদ্মবেশে নাশকতাকারী নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ৩৩ জন সদস্যকে গত ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি। রাজধানীর মিরপুরে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলন মঙ্গলবার টানা চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। গত রোববার মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বর এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। গত সোমবার দ্বিতীয় দিনের মতো শ্রমিকেরা সড়কে নামলে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় আবারও সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এদিন আন্দোলনের নামে সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই দিন আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে আরও ২৩ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও জানায় পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবারও মিরপুর-১১ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে সড়কে যানচলাচল ব্যাহত হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া : ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে পঞ্চম দিনেও গাজীপুরের ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দফায় দফায় অবরোধ করছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা প্রথমে নগরীর নাওজোড় এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে পুলিশের ধাওয়ায় তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এরপর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মৌচাকের তেলিরচালা এলাকায় শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনার পর ফের ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের হরিণহাটি ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকরা অবরোধের চেষ্টা করেন। এ সময় বিজিবি ও পুলিশের উপস্থিতিতে শ্রমিকরা বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে সরে যান। কালিয়াকৈর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, সকাল থেকে অন্যান্য দিনের তুলনায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। তবে সকাল ১১টার দিকে মৌচাক এলাকায় কিছুটা বিশৃঙ্খলা হলে পুলিশের ধাওয়ায় আন্দোলনকারীরা পালিয়ে যান। তিনি আরও জানান, আজও পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী সব শিল্পকারখানা বন্ধ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত উপস্থিতি রয়েছে। এদিকে নগরীর নাওজোড় এলাকায় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ২ দফা সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে শ্রমিকরা সড়ক ছেড়ে পালিয়ে যান। গাজীপুরের শিল্প পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন জানান, আজ অন্যান্য দিনের তুলনায় পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। তবে দুটি স্থানে কিছু সময়ের জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
গাজীপুরে ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন : ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভে উত্তাল শিল্পাঞ্চল গাজীপুর। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। তবে বিক্ষোভের পঞ্চম দিনে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কোথাও সড়ক অবরোধ বা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যদের পাশাপাশি পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ ছাড়া বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের প্রতিহত করতে বিএনপির নেতাকর্মীদের মহাসড়কে অবস্থান ও মহড়া দিতে দেখা গেছে। গাজীপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মো. আরিফ হোসাইন জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ জোনে বিজিবি টহল দিচ্ছে। এখনও কোনও সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।