ঢাকা শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মোহাম্মদপুর ও রাউজানে অস্ত্রের ঝনঝনানি, আতঙ্ক বাড়ছে জনমনে

মোহাম্মদপুর ও রাউজানে অস্ত্রের ঝনঝনানি, আতঙ্ক বাড়ছে জনমনে

মানুষ খুন, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও চট্টগ্রামের রাউজান। দিনে-রাতে সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের ঝনঝনাতিতে আতঙ্কে রয়েছেন এলাকাবাসী। গত বুধবার রাতে সাঁড়াশি অভিযানে মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকা থেকে অন্তত ১০০ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ জানায়, এ বিভাগের উপকমিশনার মো. ইবনে মিজানের নেতৃত্বে মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা এলাকায় অভিযান চালানো হয়। বুধবার রাত দুইটা পর্যন্ত অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

চার ঘণ্টা ধরে চলা অভিযানে ১০০ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে তাদের মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানায় সোপর্দ করা হয়।

উপকমিশনার ছাড়াও মোহাম্মদপুর অঞ্চলের পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার, সহকারী কমিশনার, মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অভিযানে অংশ নেন। অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, পবিত্র রমজান মাসে যাতে মানুষ নিরাপদে সিয়াম পালন এবং শান্তিপূর্ণভাবে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপন করতে পারে তা নিশ্চিত করতে মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় পুলিশ বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযান শেষে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাং যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা এলাকায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক সহিংস ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন স্থানীয়রা। গত বছরের ১৪ নভেম্বর পুলিশের অভিযানে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে ককটেল তৈরির কারখানার সন্ধান পায়। এসময় ৩৫টি তাজা ককটেল ও বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এর আগে একই এলাকায় মাদক কারবারিদের গুলিবিনিময়ে শিশুসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। গত বছরের আগস্টে জেনেভা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসার আধিপত্য কেন্দ্র করে শাহ আলম (২২) নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনায় স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধীরা এলাকায় দাপটের সঙ্গে চলাফেরা করলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

স্থানীয়রা বলছেন, স্বাভাবিক সময়েও মোহাম্মদপুরে চলাফেরা করতে আতঙ্কে থাকতে হয়। মোহাম্মদপুরে দিনে-দুপুরে সংঘর্ষ লাগে। মার্ডার হয়। এই এলাকার যারা সন্ত্রাসী তাদের কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই। সব ধরনের অস্ত্র আছে এদের কাছে। সন্ত্রাসীর অভাব নেই এ এলাকায়। অভিযান করে বেশ কয়েকজনকে ধরেছেও। কিন্তু কতজনকে ধরবে। ধরতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা করে। ওপেন অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দীর্ঘ আট বছর ধরে ঢাকা উদ্যানে বসবাস করা এক বাসিন্দা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, দিনে-দুপুরে চুরি-ডাকাতি, ইভটিজিং ও খুনের মতো ঘটনায় এলাকাবাসী উদ্বিগ্ন।

অন্যদিকে চট্টগ্রামের রাউজানে অস্ত্রবাজি ও খুনের ঘটনা থামছে না। গত দেড় মাসে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে দুজনকে। দুটি ঘটনায় কোনো আসামিকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে গত বুধবার পর্যন্ত রাউজানে ২১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ১৫টি হত্যাকাণ্ড রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট। একই সময়ে শতাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। এলাকায় অস্ত্রবাজি ও খুনোখুনি অব্যাহত থাকায় বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন।

গত বুধবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে চট্টগ্রামের রাউজানের বাজারে এক যুবদল নেতাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। নিহত আবদুল মজিদ ৪ নম্বর ওর্য়াড যুবদলের সভাপতি ছিলেন বলে রাউজান উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক ফিরোজ আহমেদ জানিয়েছেন।

৫৬ বছর বয়সি মজিদের বাড়ি অলি মিয়ার হাট এলাকায়। রাউজান থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম বলেন, বুধবার সন্ধ্যার দিকে মজিদের সঙ্গে স্থানীয় কিছু লোকজনের কথা কাটাকাটি হয়। পরে দুর্বৃত্তরা এসে একটি মুদি দোকানে বসা মজিদকে গুলি করে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মজিদ মারা যান। ওসি বলেন, গুলি করা দুর্বৃত্তরা ওই এলাকারই লোকজন বলে মনে হচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

যে স্থানে মজিদকে হত্যা করা হয়েছে একই জায়গায় গত ৫ জানুয়ারি জানে আলম নামের এক যুবদল নেতাকে গুলি করে খুন করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচশ মিটার দূরে পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের অবস্থান। তদন্তকেন্দ্রের পাশেই পরপর দুটি হত্যার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পূর্ব গুজরা এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা মোটরসাইকেলে এসে কাউকে গুলি করে বীরদর্পে চলে যাচ্ছে। পুলিশ কাউকে ধরতেই পারছে না। অথচ কাছেই পুলিশ তদন্তকেন্দ্র। ধরব, ধরা হচ্ছে, বলেই পুলিশের কাজ শেষ। আমরা সাধারণ বাসিন্দারা কীভাবে নিরাপত্তাবোধ করব।’

২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রাউজানে উপজেলার শ্রমিক দলের এক নেতাকে গুলি করে করে পালিয়ে যান সন্ত্রাসীরা। ঘটনাটি ঘটে রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী মার্কেট এলাকায়। গুলিবিদ্ধ মেহেদী হাসান (৩২) উপজেলা শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক। তাকে গুলি করার ঘটনায়ও কাউকে আটক করা যায়নি। মেহেদী এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

পুলিশ জানায়, রাউজানে ১৮ মাস ধরেই একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটে আসছে। কখনো প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে, কখনো ছুরিকাঘাত বা পিটিয়ে খুনের ঘটনা ঘটেছে। হতাহত ব্যক্তিরা বেশির ভাগই বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মী। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। উদ্ধার হয়েছে অর্ধশতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র। আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও মাটি-বালুর ব্যবসাকে কেন্দ্র করে হানাহানির ঘটনা ঘটছে বলে দাবি পুলিশের।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এলাকায় যেতে পারতেন না বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অধিকাংশ নেতা-কর্মী। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে এলাকায় ফিরতে শুরু করেন তারা। এরপর বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। বিবাদণ্ডহানাহানিতে জড়িয়ে পড়েন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খন্দকারের অনুসারীরা। বিভিন্ন সংঘর্ষ-হানাহানির ঘটনায় এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করে আসছে।

চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ‘রাউজানে আর একটিও যাতে লাশ না পড়ে, সে বিষয়টি র‌্যাব-পুলিশসহ প্রশাসনের সবাইকে কঠোরভাবে বলা হয়েছে। সন্ত্রাসীরা যে দল কিংবা ব্যক্তির সহযোগী হোক তাদের যাতে গ্রেপ্তার করা হয়।’ রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুল ইসলাম বলেন, ইতিমধ্যে পুলিশ বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করেছে। সম্প্রতি গুলি করে দুজনকে হত্যার ঘটনায়ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। বাসিন্দাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত