
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বিএনপির নতুন সরকার এমন একসময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই চাপে। জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল শুক্রবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে এক বিবৃতিতে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এ কথা বলেন। সকাল ১০টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। দিনের কার্যসূচিতে যাওয়ার শুরুতে মন্ত্রী এই বিবৃতি দেন। মন্ত্রী বলেন, বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকার সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করানোর পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতকে অকার্যকর করে দিয়েছে। বিগত বিএনপি সরকার অর্থনীতির মূল সূচকগুলো যেখানে ইতিবাচক ধারায় নিয়ে এসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে গিয়েছিল, বিগত ১৬ বছরে তা অনেকটাই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত বিএনপি সরকারের সর্বশেষ অর্থবছর ২০০৫-০৬, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ অর্থবছর ২০২৩-২৪ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক, রাজনৈতিক ও সামাজিক খাতের সূচক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থার একটা চিত্র দেশবাসীকে অবহিত করতে চান। পাশাপাশি জনগণের ভাগ্যে একটি উন্নত, মর্যাদাশীল, বৈষম্যহীন মানবিক রাষ্ট্র গঠনে বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুত দর্শন-নীতিকৌশলের বিষয়ে দেশবাসীকে অবহিত করতে চান তিনি।
প্রবৃদ্ধি কমেছে, মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে : সরকারি তথ্য তুলে ধরে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে- ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। পরবর্তী সময় দুর্বৃত্তায়ন ও ভ্রান্তনীতির কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষ শেষে প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ হয়। মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছায়। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশে। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৩ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমে আসে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি অর্থনীতি যখন শিল্পের চালিকা শক্তি হারিয়ে ফেলে, তখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়। সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। বিগত সময়ে এটি চরমভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।
কর্মসংস্থানে সংকট, বাড়ছে ‘জবলেস গ্রোথ’ : মন্ত্রী বলেন, বিগত এক দশকে দেশের অর্থনীতির প্রধান তিনটি খাতের মধ্যে কৃষিতে মূল্য সংযোজনের অংশ কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান বেড়েছে। কিন্তু সেই সময়ে কৃষি খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় তরুণেরা বাধ্য হয়ে কৃষি খাতে বেশি করে নিয়োজিত হয়েছে। এতে করে ছদ্ম বেকারত্ব তীব্রতর হয়েছে। তরুণদের শ্রমশক্তি অপচয় হয়ে তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সীমিত করেছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে কৃষি খাতে মোট জাতীয় মূল্য সংযোজনের ১১ দশমিক ৬ শতাংশ যোগ করলেও মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪১ শতাংশ এই খাতে নিয়োজিত। এই বৈপরীত্য কৃষি খাতে শ্রমের নিম্ন উৎপাদনশীলতাকে ইঙ্গিত করে। শ্রমবাজারের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে, যা কর্মসৃজনবিহীন প্রবৃদ্ধি বা ‘জবলেস গ্রোথ’-এর ঝুঁকি নির্দেশক।
টাকার মান অর্ধেক, বাড়ছে আমদানি খরচ : মন্ত্রী বলেন, গত ১৫ বছরে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৬৮ দশমিক ২ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ছিল ১১১ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১২১ টাকা। ক্রমাগত অবমূল্যায়নের কারণে গত ১৫ বছরে টাকার মান প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে তা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
মুদ্রা সরবরাহ প্রসঙ্গে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে মুদ্রা সরবরাহের (এমণ্ডটু) প্রবৃদ্ধি ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল। রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ, যা অর্থনীতির প্রাণশক্তির ইঙ্গিত দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। এমণ্ডটু প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
ব্যাংক খাতের ‘বিপজ্জনক’ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, খেলাপি ঋণ বেড়ে ২০ শতাংশ ছাড়িয়েছে (বাস্তবে ৩০ শতাংশ)। মূলধন পর্যাপ্ততা নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে। মন্ত্রীর ভাষায়, ‘অনেক ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় পরিচালিত হয়েছে।’
ঋণের বোঝা ও সুদ ব্যয়ের বিস্ফোরণ : আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে ১৩ গুণ। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যা ছিল ৮৫ বিলিয়ন টাকা, সেটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ১৪৭ বিলিয়ন টাকা। এটি বাজেটের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। উন্নয়ন ব্যয় সীমিত করছে।
রিজার্ভে টান, বৈদেশিক খাতে চাপ : মন্ত্রী বলেন, রপ্তানি বাড়লেও আমদানির তুলনায় তা পিছিয়ে। রপ্তানি ৪০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ৬৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এই ঘাটতির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গেছে। মন্ত্রী দাবি করেন, অর্থ পাচার ও হুন্ডি এর অন্যতম কারণ।
বৈষম্য বেড়েছে চরমে : আয়ের বৈষম্য ভয়াবহভাবে বেড়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০০৫ সালে ধনী-গরিব আয়ের পার্থক্য ৩৫ গুণ। ২০২২ সালে তা ৮১ গুণ। এর ফলে একটি বৈষম্যমূলক সমাজ তৈরি হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বড় সংকট : আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত সময়ে প্রশাসন দলীয়করণ হয়েছে। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত দুর্বল হয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ফলে সঠিক নীতিনির্ধারণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য দুটি সূচক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের হার এবং মূলধন পর্যাপ্ততা।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এসে সেই চিত্র আমূল পাল্টে যায়। সামগ্রিক খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়ায় ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। এখন তা দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশের ওপরে। এখানে উল্লেখ্য, খেলাপি ঋণের আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত সংজ্ঞাকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে ভুলভাবে প্রদর্শন করে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকৃত চিত্র গোপন করা হয়েছে।
স্থিতিশীলতা থেকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য : আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর জন্য নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু উদ্যোগ।
জ্বালানিতে অতিরিক্ত ভর্তুকি : মন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। ফলে সরকারকে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে, যা বাজেট ও রিজার্ভ- দুটির ওপরই চাপ তৈরি করবে। সরকার এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনগণকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে পরামর্শ দেওয়াসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ এই বাস্তবতার বাইরে নয়। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রদানের প্রয়োজন হলেও জনগণের কষ্টের কথা মাথায় রেখে সরকার এখনও পর্যন্ত পূর্ণ সমন্বয় না করে পূর্বের মূল্যই বহাল রেখেছে। এই প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিবেশের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা স্থাপন ও নানামুখী চাপ মোকাবিলা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ হাতে নিয়েছে সরকার।
মন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের আমলে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পগুলো এই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ফলে জনগণ সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল ভোগ করতে পারছে না। এর মাধ্যমে লাখো কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার বক্তব্যে স্বীকার করেন, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো গভীর ও বহুমাত্রিক। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সুশাসন, সংস্কার ও জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।