
রাজধানীর গেন্ডারিয়া থানার বাসিন্দা জারা রেজওয়ান। ২০১৩ সালে একটি সুন্দর ও সুখী জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ফাহাদ বিন রোহানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। ২০১৬ সালে তাদের সংসারে ছেলে জোহানের জন্ম হয়। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় জারার। জারার অভিযোগ, স্বামী তাকে ভরণপোষণ দিতেন না। এমনকি ছেলের স্কুলের খরচও বহন করতেন না। নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডে ও জড়িত ছিলেন ফাহাদ বিন রোহান। এ অবস্থায় টিউশনি করে সংসার চালাতেন জারা।
২০২৫ সালের ৩১ মার্চ ঈদের দিন সকালে ফাহাদ বিন রোহান তাকে তিন তালাক দেন। পরে ফাহাদ পড়াশোনার জন্য সুইডেনে চলে যান। আত্মসম্মানের কথা বিবেচনা করে ৬ এপ্রিল জারা নিজেই স্বামীকে তালাকের নোটিশ পাঠান। এরপর দেনমোহর ও সন্তানের ভরণপোষণের দাবিতে মামলা করতে ঢাকার আদালতে আসেন। কিন্তু আদালতে হাজিরা ও খরচের বিষয় বিবেচনা করে তিনি ২৩ জুলাই ঢাকার জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের শরণাপন্ন হন। সেখানে স্বামীর বিরুদ্ধে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর)-এর আবেদন করেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই শেষে দুই পক্ষকে হাজির হওয়ার জন্য ২৭ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়। প্রথম শুনানির দিনই সমঝোতার মাধ্যমে লিগ্যাল এইড অফিসে জারার দেনমোহর এবং সন্তানের ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শুধু জারা রেজওয়ান নন, সারা দেশে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত লিগ্যাল এইডের বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) সেবার মাধ্যমে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৯৫৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। লিগ্যাল এইডের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
লিগ্যাল এইডের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি সেবার জন্য (প্রি ও পোস্ট-কেইস) মোট ২ লাখ ২০ হাজার ৮৯০টি মামলায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিষ্পত্তিকৃত মামলা বা বিরোধে উপকারভোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ৯০ হাজার ৮৭৪ জন। একই সময়ে সরকারি খরচে ১৪ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬ জনকে আইনি সেবা দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ, দেশের সব নিম্ন আদালত ও শ্রম আদালত এবং কারাগারে থাকা অসচ্ছল বন্দিরাও এ সেবার আওতায় ছিলেন।
ঢাকা জেলার লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সহকারী জজ) সায়েম খান বাসস’কে বলেন, লিগ্যাল এইড অফিসে মূলত তিন ধরনের সেবা পাওয়া যায়- আইনি পরামর্শ, মামলা ছাড়াই বিরোধ নিষ্পত্তি এবং সরকারি খরচে বিনামূল্যে আইনজীবী নিয়োগ। তিনি বলেন, আইনি পরামর্শ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ধনী-গরিব নির্বিশেষে যে কেউ বিনামূল্যে এ সেবা নিতে পারেন। লিগ্যাল এইড অফিসার আরও বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সম্পাদিত আপস-মীমাংসাকে ডিক্রির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কেউ লিগ্যাল এইডের চুক্তি ভঙ্গ করলে নতুন করে মামলা করতে হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ সরাসরি আদালতের মাধ্যমে চুক্তি বাস্তবায়ন করতে পারেন। এ ছাড়া জাতীয় আইনগত সহায়তা আইন, ২০০০-এর তফসিলে থাকা ৯ ধরনের পারিবারিক ও ছোট ছোট দেওয়ানি বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে মামলা দায়েরের আগেই আপস-মীমাংসার উদ্যোগ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের ২০টি জেলায় তফসিলভুক্ত বিরোধে সংশ্লিষ্ট লিগ্যাল এইড অফিসে আবশ্যিকভাবে আপস মীমাংসার এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খালিদ হোসাইন বাসসকে বলেন, লিগ্যাল এইডের বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) হলো আদালতের বাইরে মামলা মীমাংসার সরকারি ব্যবস্থা। জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা এটি পরিচালনা করে। এতে অসচ্ছল বিচারপ্রার্থী জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে এডিআর-এর জন্য আবেদন করেন। প্রি-কেইস ও পোস্ট-কেইস- দুইভাবেই উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর লিগ্যাল এইড অফিসার বিবাদমান দুই পক্ষকে নোটিশ দিয়ে অফিসে ডাকেন। তিনি আরও বলেন, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উভয় পক্ষকে নিয়ে বৈঠকে বসেন। পক্ষগুলো নিজেদের বক্তব্য ও দাবি সরাসরি তুলে ধরেন। আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হলে উভয়পক্ষের মধ্যে আপসনামা করা হয়। এ আপসনামা আদালতের ডিক্রির মতোই কার্যকর। কেউ না মানলে আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যায়।
এর সুবিধা হলো, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। মাসের পর মাস আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয় না। উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্পর্কও নষ্ট হয় না। জারা রেজওয়ান বাসসকে বলেন, ‘এই দেশে আরও অনেক ‘জারা’ আছে, যারা মনে করে তাদের জন্য কোনো দরজা খোলা নেই। টাকা নেই, তাই আইনও নেই। তাদের বলছি- আছে। একটা দরজা সবসময় খোলা। সেই দরজার ওপারে আছে ন্যায়, আছে মানুষ, আছে সম্মান। সেই দরজার নাম লিগ্যাল এইড। সেখানে গেলে কেউ জিজ্ঞেস করবে না আপনার কাছে টাকা আছে কি না। শুধু বলবে- বসুন, বলুন। বিনামূল্যে সেবা সবার জন্য।’