
বিপিএলে ইতিহাস গড়েছেন সিলেট টাইটান্সের স্পিনার নাসুম আহমেদ। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে স্পিনার হিসেবে সেরা বোলিং ফিগারের কীর্তি গড়েছেন তিনি। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ যেন একাই নিজের হাতে তুলে নিলেন নাসুম আহমেদ। বাঁহাতি এই স্পিনারের বিধ্বংসী বোলিংয়ে তছনছ হয়ে গেল নোয়াখালী এক্সপ্রেস। কোনোমতে পঞ্চাশ পার করে দলটি। আর সে লক্ষ্য ছাড়িয়ে যেতে তেমন কোনো বেগ পেতে হয়নি সিলেট টাইটানসকে। গতকাল সোমবার সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ম্যাচে নোয়াখালীকে ৬ উইকেটে হারিয়েছে সিলেট। ‘দুলাভাই আচ্ছইন, এখন মাঠ কাঁপব...’ মঈন আলীকে কাল ফেসবুক পোস্টে এভাবেই স্বাগত জানিয়েছিল সিলেট টাইটানস। ইংল্যান্ডের এই ক্রিকেটারের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত স্ত্রীর বাড়ি সিলেটে। সে সূত্রে ‘দুলাভাই’ হয়ে যাওয়া মঈন আজ বিপিএলে সিলেট টাইটানসের হয়ে প্রথম খেলতে নেমেছিলেন। তবে ব্যাটিং বা বোলিংয়ে মঈন তেমন কিছু করে ফেলেননি। কিন্তু ‘দুলাভাই’ মঈনের প্রথম ম্যাচে রেকর্ড গড়ে দলকে জয়ের পথে ফিরিয়েছেন সিলেটেরই ছেলে নাসুম আহমেদ।
এদিন টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা নোয়াখালী খেলতে পারেনি ১৫ ওভারও। গুটিয়ে যায় মাত্র ৬১ রানেই।
৪ ওভারে মাত্র ৭ রান দিয়ে ৫ উইকেট শিকার করেন নাসুম। ১৪৭ ম্যাচের ক্যারিয়ারে প্রথমবার তিনি পেলেন ৫ উইকেটের স্বাদ। এবারের বিপিএলে এখনও পর্যন্ত সেরা বোলিং এটি। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে এবার ৫ উইকেট শিকারি প্রথম বোলারও তিনিই। বিপিএলের সব আসর মিলিয়েও একটি রেকর্ড গড়েছেন বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়া বাঁহাতি এই স্পিনার। স্পিন বোলিংয়ে সেরা বোলিংয়ের কীর্তি এটিই। দীর্ঘদিন ধরেই বাঁহাতি স্পিনে জাতীয় দলে নিয়মিত নাসুম। ঘরোয়া ক্রিকেটও খেলছেন এক যুগের বেশি সময় ধরে। কিন্তু ১৪৭ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে এর আগে কখনও ৫ উইকেট পাননি। এদিন সেই পূর্ণতার সঙ্গে আরও একটা জায়গায়ও নিজের নামটা শীর্ষে তুলেছেন তিনি, বাংলাদেশের স্পিনারদের মধ্যে বিপিএলে এটিই সেরা বোলিং ফিগার।
২০১৭ সালে ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে ৩.৫ ওভারে ১৬ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন সাকিব। তাঁকে টপকেই আজ নাসুম শীর্ষে উঠেছেন। গত বছর দুর্দান্ত রাজশাহীর হয়ে ৪ ওভারে ১৯ রান দিয়ে ৭ উইকেট নেওয়া তাসকিন আহমেদ সব ধরনের বোলার মিলিয়ে শীর্ষে আছেন। রান তাড়ায় খুব দাপটে না হলেও সিলেট জিতে যায় ৮.৪ ওভারে।
আগের ম্যাচ থেকে নোয়াখালীর একাদশে এ দিন পরিবর্তন ছিল চারটি। ব্যক্তিগত কারণে ছুটিতে থাকা সৌম্য সরকার প্রথমবার মাঠে নামে এ দিন। আইএল টি-টোয়েন্টি খেলে আসা মোহাম্মাদ নাবিও নামে মাঠেন। আসর শুরুর পর দলে যোগ করা মুনিম শাহরিয়ারকেও রাখা হয় একাদশে। একাদশ থেকে বাদ দেয় তারা জাকের আলিকে। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরও ব্যাটিং ছিল যাচ্ছেতাই।
টস জিতে তাদের আগের ব্যাটিং নেওয়ার সিদ্ধান্তই বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। এমন কন্ডিশনে তো সব দলই চায় আগে বোলিং করতে! আগে ব্যাট করে চ্যালেঞ্জ সামলানোর কোনো ছাপ ছিল না তাদের ব্যাটিংয়ে। শুরুটা যদিও ছিল আশা জাগানিয়া। প্রথম তিন ওভারে আসে ১৮ রান। মোহাম্মাদ আমিরের এক ওভারে দারুণ দুটি ছক্কা মারেন হাবিবুর রহমান সোহান। নাসুম আক্রমণে আসতেই পাল্টে যায় চিত্র। বাঁহাতি স্পিনারের প্রথম বলেই সুইপ খেলে আউট হন সৌম্য (৫ বলে ৬)। স্কার লেগ সীমানায় সামনে ঝাঁপিয়ে দারুণ ক্যাচ নেন ইথান ব্রুকস।
মুনিম শাহরিয়ার তিনে নেমে একটি বাউন্ডারির পর ওই ওভারেই রান আউট হয়ে যান আত্মঘাতী রানের চেষ্টায়। পরের ওভারে সৈয়দ খালেদ আহমেদের শর্ট বলের শিকার সোহান (১৬ বলে ১৮)। রানের গতি প্রায় থমকে যায়। উইকেট পড়তে থাকে নিয়মিত গতিতে। নাবিকে (১০ বলে ১) বিদায় করেন তার আফগান সতীর্থ আজমাতউল্লাহ ওমারজাই। নাসুম দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে এলবিডব্লিউ করেন নোয়াখালী অধিনায়ক হায়দার আলিকে (১২ বলে ৫)। নোয়াখালীর লোয়ার মিডল ও লোয়ার অর্ডার এ দিন ছিল একদমই দুর্বল। হাসান মাহমুদকে নামতে হয় সাত নম্বরে। সিলেট অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের দারুণ ডেলিভারির জবাব পাননি তিনি (০)।
বাকি লোয়ার অর্ডার ভেঙে পড়ে তাসের ঘরের মতো। চার বলের মধ্যে তিন উইকে নিয়ে নাসুম পূর্ণ করেন পাঁচ উইকেট। নোয়াখালীর শেষ ৫ ব্যাটসম্যান মিলে করেন ১ রান। শেষ ৫ উইকেট হারায় তারা ৬ রানের মধ্যে। নোয়াখালীর এই ৬১ রান বিপিএলের ইতিহাসে চতুর্থ সর্বনিম্ন দলীয় স্কোর। রান তাড়ায় সিলেট শুরুতে হারায় পারভেজ হোসেন ইমনকে। আগের পাঁচ ম্যাচে চারে নেমে বেশ ভালো করা বাঁহাতি ব্যাটসম্যান এবার ওপেন করে ১ রানে বোল্ড হন বিলাল সামির বলে। তৌফিক খান তুষার দ্রুতগতিতে ব্যাট করে এগিয়ে নেন দলকে। গত জাতীয় লিগ টি-টোয়েন্টি মাত্র একটি ম্যাচ খেলেন তিনি, সেটিতেও ব্যাট করতে পারেননি। গত এপ্রিলে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের পর গত আট মাসে স্বীকৃত ক্রিকেটে তার একমাত্র ম্যাচ ছিল সেটিই। লম্বা সময় পর ব্যাটিংয়ে নেমে তিনি করে ৭ চারে ১৮ বলে ৩২ রান। জয়ের কাছে গিয়ে বাজে শটে উইকেট হারান আফিফ হোসেন (২) ও জাকির হাসান (২৩ বলে ২৪)। আসরে প্রথম খেলতে নামা মইন আলি শেষ দিকে একটি ডেলিভারি খেলার সুযোগ পান। নোয়াখালীর আফগান স্পিনার জাহির খান তিনটি উইকেট নেন শেষ দিকে। ষষ্ঠ ম্যাচে সিলেটের এটি তৃতীয় জয়।