
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধের’ ঝাঁজ। ফুটবলের লড়াই ছাপিয়ে দুই দলের মগজে থাকে সে অতিত ইতিহাস। তাদের দ্বৈরথে স্কোরলাইন থাকে, ট্রফির লড়াই থাকে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি থাকে ইতিহাস, রাজনীতি, যুদ্ধের স্মৃতি আর একটি জাতির আবেগ।
আগামীকাল বুধবার রাত ১টায় আটলান্টায় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। প্রায় চার দশক আগে মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে যে গল্প শুরু হয়েছিল, তার আরেকটি অধ্যায় যেন লেখা হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে।
১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এক বিকেলে ডিয়েগো ম্যারাডোনা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমার মাথায় ছিল কেবল মালভিনাস। একটি মাত্র বাক্যই বুঝিয়ে দেয়, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি তার কাছে কেবল ফুটবল ছিল না।
‘মালভিনাস’-যে নাম আর্জেন্টিনার মানুষ এখনো উচ্চারণ করে আবেগ নিয়ে। বিশ্বের অনেকের কাছে এটি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, কিন্তু আর্জেন্টিনার কাছে সেটি মালভিনাস। ১৯৮২ সালের যুদ্ধের ক্ষত দেশটি এখনো ভুলতে পারেনি। সে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় সাড়ে ছয়শ আর্জেন্টাইন সেনা, যাদের বড় অংশই ছিলেন কিশোর কিংবা সদ্য তরুণ। বুয়েনস আইরেসের দরিদ্র পরিবার থেকে যুদ্ধে যাওয়া সে তরুণদের আত্মত্যাগ আর্জেন্টিনার জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে আছে।
চার বছর পর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নামার সময় ম্যারাডোনা সে স্মৃতিই বয়ে নিয়ে নেমেছিলেন মাঠে। তারপর ইতিহাস।
প্রথমে এল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত গোলগুলোর একটি-‘হ্যান্ড অব গড’। শূন্যে ভাসা বল গোলরক্ষক পিটার শিলটনের আগেই স্পর্শ করেছিলেন নিজের বাম হাতে। রেফারির চোখ এড়িয়ে গোলটি বৈধ হয়ে যায়। পরে ম্যারাডোনা রসিকতা করে বলেছিলেন, গোলটি হয়েছে ‘কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’
কিন্তু সে গোল নিয়েই যদি গল্প শেষ হতো, তবে হয়তো ম্যাচটি কিংবদন্তি হয়ে উঠত না। চার মিনিট পর নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে ছয়জন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে যে গোলটি করেছিলেন ম্যারাডোনা, সেটিকে আজও অনেকেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা গোল বলে মনে করেন।
আজতেকার গ্যালারি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, আর আর্জেন্টিনা পেয়েছিল ২-১ ব্যবধানের জয়। পরে সে বিশ্বকাপও জিতে নেয় আলবিসেলেস্তেরা। ফকল্যান্ড হারানোর প্রতিশোধও তাতে মিশেছিল কিছুটা!
ম্যারাডোনার সে জাদুকরী দৌড়ের সময় ধারাভাষ্যকার ভিক্টর হুগো মোরালেসও নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখতে পারেননি। পেশাদারিত্ব ভুলে তিনি বলে উঠেছিলেন, ‘ম্যারাডোনা ছুটছেন, ম্যারাডোনা ছুটছেন... গোল, গোল, গোললল! আমি কাঁদতে চাই। আমি কাঁদতে চাই। হে ঈশ্বর, তুমি কোন গ্রহ থেকে এসেছো?’ সে মুহূর্ত থেকেই ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা আর শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ রইল না। এরপর বিশ্বমঞ্চে আরও কয়েকবার দেখা হয়েছে দুই দলের। ২০০২ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টিতে জিতেছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু ১৯৮৬ সালের স্মৃতি আজও দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবল অধ্যায়।
এবার সে গল্পে নতুন চরিত্র লিওনেল মেসি। যেমন ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনার সব আশা ছিল ম্যারাডোনাকে ঘিরে, তেমনি আজকের প্রজন্মের কাছে সে জায়গাটি দখল করে আছেন মেসি। পার্থক্য শুধু একজন ইতিহাস হয়ে গেছেন, অন্যজন এখনো ইতিহাস লিখছেন।
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনার সামনে এবার আরেকটি লক্ষ্য-শিরোপা ধরে রাখা। সে পথের সবচেয়ে বড় বাধা ইংল্যান্ড। কিন্তু এ ম্যাচে ফুটবলের বাইরেও থাকবে আবেগের আরেকটি স্তর। কারণ আর্জেন্টিনার অনেক সমর্থকের কাছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় মানেই ইতিহাসের এক টুকরো প্রতীকী উত্তর।
সে আবেগের প্রতিফলন দেখা যায় দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও। সম্প্রতি আর্জেন্টিনার একটি স্কুলে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এক শিশু কান্নায় ভেঙে পড়ে। কাঁদতে কাঁদতে সে বলে ওঠে, এগিয়ে যাও আর্জেন্টিনা, এগিয়ে যাও জাতীয় দল, এগিয়ে যাও মেসি! এবার আমাদের চতুর্থ শিরোপার পালা!’ সে দৃশ্য দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি কোচ লিওনেল স্কালোনিও। ফুটবল তাই কেবল কৌশল, পাস কিংবা গোলের হিসাব নয়। অনেক সময় এটি হয়ে ওঠে একটি জাতির স্মৃতি, পরিচয় ও আবেগের ভাষা। বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ সে সত্যটিই বারবার মনে করিয়ে দেয়। আটলান্টায় বুধবার যখন প্রথম বাঁশি বাজবে, তখন মাঠে নামবে ২২ জন ফুটবলার। কিন্তু তাদের সঙ্গে যেন ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকবে আজতেকা স্টেডিয়ামের সেই বিকেল, মালভিনাস যুদ্ধের স্মৃতি, ম্যারাডোনার জাদু আর মেসিকে ঘিরে নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন। কারণ কিছু ম্যাচের ফলাফল শুধু স্কোরলাইনে লেখা হয় না; সেগুলো জায়গা করে নেয় ইতিহাসের পাতায়!
বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন পর্যন্ত ৫ বারের দেখায় ৩টি জয় নিয়ে ইংল্যান্ড এগিয়ে আছে। ১৯৬২ সালের গ্রুপ পর্বে ৩-১ এবং ১৯৬৬ সালের কোয়ার্টার-ফাইনালে ১-০ গোলের জয় ইংলিশদের পক্ষেই কথা বলে (যে ম্যাচটি এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে, তৎকালীন ইংলিশ কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইনদের ‘জানোয়ার’ বলেছিলেন)। এমনকি ২০০২ সালের গ্রুপ পর্বেও ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টিতে ১-০ গোলে জিতেছিল তারা।
কিন্তু নকআউট পর্বের স্নায়ুচাপে আর্জেন্টিনাকে সামলানোর ইতিহাস তাদের জন্য কখনোই সুখকর নয়। ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার-ফাইনালে ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ও বিতর্কিত জোড়া গোল কিংবা ১৯৯৮ সালের শেষ ষোলোতে টাইব্রেকারে হেরে যাওয়া—এই ক্ষতগুলো ইংলিশদের স্মৃতিতে এখনো দগদগে। সব মিলিয়ে এই সেমিফাইনালের চিত্রনাট্য অত্যন্ত পরিষ্কার। দুই দলই শেষ চারে উঠেছে রেফারির কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সুবিধা নিয়ে এবং ট্যাকটিকাল দুর্বলতা ঢাকতে একক খেলোয়াড়দের নৈপুণ্যের ওপর ভর করে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং চলতি টুর্নামেন্টের একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন। আর্জেন্টিনার ডিফেন্স লাইন যেমন সুইসদের গতির কাছে বারবার উন্মুক্ত হয়েছে, ইংল্যান্ডও তেমনি মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ রাখতে ধুঁকেছে। সেমিফাইনালে তাই আবেগ বা পুরোনো ইতিহাস কোনো কাজে আসবে না। কোয়ার্টার-ফাইনালের এই ট্যাকটিকাল ভুলগুলো থেকে যারা শিক্ষা নেবে এবং স্নায়ুর চাপ সামলাতে পারবে, তারাই ফাইনালের টিকিট কাটবে। বাকি সব কেবলই মিডিয়ার তৈরি করা সস্তা হাইপ।