
ঈশ্বরদীর বিভিন্ন এলাকায় ধান সিদ্ধ করার কাজে তুষ বা গুড়ার পরিবর্তে প্রকাশ্যে পরিত্যক্ত পলিথিন, পুরনো টায়ার, প্লাস্টিক–রাবারের পরিত্যক্ত জুতা–স্যান্ডেল এবং বিভিন্ন কারখানার ঝুট ও বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসলি জমি ও জনস্বাস্থ্য।
রাস্তার পাশে ও আবাসিক এলাকার ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে অবস্থিত হাসকিং মিল ও ধান চাতালের বড় বড় চুলায় এসব বর্জ্য জ্বালানোর ফলে চারপাশ কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। চুলা ও বয়লার থেকে উড়ে আসা ছাইয়ে বিনষ্ট হচ্ছে ফলমূল, শীতকালীন সবজি ও আবাদি জমি।
ঘন কালো ধোঁয়ার কারণে সড়কে চলাচলকারী যানবাহন ও পথচারীরাও প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির শিকার হলেও চাতাল মালিকরা বিষয়টি উপেক্ষা করছেন।
সরেজমিনে উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের তেঁতুলতলা, পাকুড়িয়া ও জয়নগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দিনের বেলায় প্রকাশ্যেই ধানের তুষ বা গুড়ার বদলে পলিথিন, ঝুট, পুরনো টায়ার এবং প্লাস্টিক–রাবারের জুতা–স্যান্ডেল জ্বালিয়ে ধান সিদ্ধ করা হচ্ছে।
চাতাল মালিকরা জানান, ধানের তুষ জ্বালিয়ে ধান সিদ্ধ করতে খরচ বেশি। কম খরচের জন্য তারা এসব বর্জ্য জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মিনহাজ উদ্দিন বলেন, “কালো ধোঁয়ার সঙ্গে টায়ার, পলিথিন ও রাবার পোড়ার তীব্র দুর্গন্ধে ঘরে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। চাতাল মালিকদের বললেও তারা কোনো কর্ণপাত করেন না।”
জাতীয় পদকপ্রাপ্ত কৃষক সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ বলেন, চাতাল থেকে উড়ে আসা ধোঁয়া ও ছাইয়ে এলাকার জমিতে রোপণ করা সবজি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দাশুড়িয়া তেঁতুলতলা এলাকার কৃষক মাহাবুল ইসলাম জানান, খিরা, ভুট্টা, সরিষা, ধনিয়া, গম, লাল শাক ও ফুলকপিসহ বিভিন্ন ফসলে চাতালের ছাই পড়ায় ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এছাড়া বর্জ্য পোড়ানোর ছাই আশপাশের গাছপালা, বাড়িঘরের টিনের চালা, আসবাবপত্র, বিছানা ও পোশাকে জমে যাচ্ছে।
পাকুড়িয়া গ্রামের চাতাল মালিক মো. আব্দুল খালেক বলেন, ধানের তুষ বা গুড়া পোড়ালে খরচ বেশি হওয়ায় কম দামে পাওয়া পলিথিন, ঝুট ও পুরনো টায়ার ব্যবহার করে ধান সিদ্ধ করা হচ্ছে। ঈশ্বরদী ইপিজেড ও রূপপুর প্রকল্প থেকে ফেলে দেওয়া বর্জ্য কম দামে সংগ্রহ করেন বলে তিনি জানান।
জয়নগরের সম্পদ ট্রেডার্সের মালিক মনজুর রহমান বলেন, “আমি ও দু-একজন ছাড়া বেশিরভাগ মিলেই তুষের বদলে বর্জ্য ব্যবহার করছে। যেসব মিলে বর্জ্য ব্যবহার হচ্ছে, সেসব এলাকার গাছপালায় ইতোমধ্যে ক্ষতিকর প্রভাব দেখা দিয়েছে।”
চাতাল শ্রমিক আবু হানিফ বলেন, “মিল মালিকরা যেসব জ্বালানি এনে দেন, সেগুলো দিয়েই ধান সিদ্ধ করি।”
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সাধারণ সম্পাদক সহিদ মাহমুদ বলেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে এভাবে নিয়মিত পরিবেশ দূষণ করা হচ্ছে। এসব বর্জ্য পোড়ানোর কালো ধোঁয়া মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং ফসল ও গাছপালার ক্ষতি করছে।
এ বিষয়ে পাবনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল গফুর বলেন, যারা গোপনে পলিথিন, ঝুট ও পুরনো টায়ার পুড়িয়ে ধান সিদ্ধ করছে, তাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে।
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বলেন, “যেসব চাতালে বয়লারে পলিথিন, পুরনো টায়ার ও প্লাস্টিক–রাবারের বর্জ্য পুড়িয়ে পরিবেশ দূষণ করা হচ্ছে, সেগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”