
নির্বাচন মানে ঘটনাবহুল অধ্যায়। নির্বাচনের আরেক নাম আলোচনা ও সমালোচনা। প্রতিটি নির্বাচনই কোনো না কোনো কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কোথাও অভিযোগ ওঠে, কোথাও বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে সব সমালোচনাই যে বাস্তব, তা নয়। তবু নির্বাচন মানেই তর্ক-বিতর্কের ঝড়। বিশ্বের যেখানেই নির্বাচন হয়, সেখানেই আলোচনার ঢেউ ওঠে; সমালোচনার হাওয়া বইতে থাকে। মুসলিম বিশ্বও এর ব্যতিক্রম নয়।
পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন, ১৯৭৭ : পাকিস্তানের জন্য ১৯৭৭ সাল ছিল একটি সংকটময় ও সিদ্ধান্তমূলক বছর। এ বছরের নির্বাচন দেশটির গণতান্ত্রিক ধারাকে ভেঙে দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে। সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৭ মার্চ ১৯৭৭। ক্ষমতাসীন দল ছিল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। দলের নেতা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। প্রধান বিরোধী জোট ছিল পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (PNA)। এতে ৯টি দল ছিল। ইসলামপন্থি ও ডানপন্থি দল এতে যুক্ত ছিল। বলা যায়, পিপিপিবিরোধী জোট। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র ছিল। ভুট্টো জনপ্রিয় হলেও তার সম্পর্কে চরম বিতর্ক ছিল। বিরোধীরা সরকারকে কর্তৃত্ববাদী বলত। অর্থনৈতিক বেকারত্ব ও শিক্ষা খাতের দুর্বলতার চাপ বাড়ছিল। রাজনৈতিক মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। নির্বাচনের ফলাফলে পিপিপি বড় জয় পায়। ভুট্টো পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন। তবে বিরোধীরা এটা মানতে একেবারেই নারাজ। তারা ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলে। দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজপথে সহিংসতা বাড়তে থাকে। ধর্মঘট ও অবরোধ চলে। ব্যাপক হরতাল-ভাঙচুর হয়। বিরোধী জোট রাস্তা বন্ধ করে দেশ আচল করে দেয়। দফায় দফায় আলাপ-আলোচনা করেও সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ৫ জুলাই ১৯৭৭ সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে। জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতা দখল করেন। সামরিক আইন জারি হয়। ভুট্টো গ্রেপ্তার হন। পরে তার বিচার হয়।
১৯৭৯ সালে ভুট্টোকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এটি পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত বিচার হিসেবে পরিচিত। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে। সামরিক শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়। এর পর থেকেই মূলত পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থায় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ শুরু হয়। আজও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপমুক্ত নির্বাচন ও প্রেসিডেন্ট পায়নি। এ নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা স্থায়ী হয়ে যায়। পাকিস্তান ১৯৭৭ নির্বাচন প্রমাণ করে, একটি বিতর্কিত ভোট পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দীর্ঘ অস্থিরতার পথে ঠেলে দিতে পারে। সেই অস্থিরতা পাকিস্তান এখনও ঠিকঠাক কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
ফিলিস্তিনের সংসদ নির্বাচন, ২০০৬ : ফিলিস্তিনে ২০০৬ সালের নির্বাচন ছিল একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ঘটনা। দখলদার পরিস্থিতির মধ্যেও এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এটি ফিলিস্তিনি রাজনীতির গতিপথ বদলে দেয়। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করে। সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২৫ জানুয়ারি ২০০৬। ভোট হয় গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরজুড়ে। নির্বাচন পরিচালনা করে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। ভোটগ্রহণ তুলনামূলক শান্ত ছিল। এ নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল; একটি ছিল ঐতিহ্যবাহী দল ফাতাহ। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন মাহমুদ আব্বাস। অন্যটি ছিল ইসলামপন্থী সংগঠন হামাস। হামাস আগে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের জন্য পরিচিত ছিল। নির্বাচনের আগে ফাতাহ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। দলটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ ছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল। নাগরিক জীবনে নিরাপত্তার অপ্রতুল ছিল। বেকারত্বের হার ক্রমেই বাড়ছিল ও নতজানু নীতিতে শাসন চলছিল। হামাস সামাজিক সেবা, শৃঙ্খলা ও প্রতিরোধের রাজনীতি তুলে ধরে। এতে তারা জনপ্রিয়তা পায়। ভোটের ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। হামাস সংসদের ১৩২টি আসনের মধ্যে ৭৪টি আসন জয় করে। ফাতাহ পায় মাত্র ৪৫টি আসন। হামাস সরকার গঠনের অধিকার পায়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় ধাক্কা সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দ্রুত আসে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন হামাস সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। ইসরায়েল আর্থিক অবরোধ আরোপ করে। ফিলিস্তিনি তহবিল বন্ধ হয়ে যায়। অর্থনীতি দ্রুত সংকটে পড়ে। পরিস্থিতি দিনদিন ঘোলাটে হতে থাকে। বাইরে থেকে আমরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলো কলকাঠি নাড়ে। এরপর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব শুরু হয়। হামাস ও ফাতাহর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই বাড়ে। সশস্ত্র সংঘর্ষ ঘটে। ২০০৭ সালে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয়। পশ্চিম তীর ফাতাহর হাতে থাকে। ফিলিস্তিন কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ নির্বাচন আলোচিত হয় তার গণতান্ত্রিক বৈধতার কারণে। এটি সমালোচিত হয় ফলাফল না মানার জন্য। জনগণের ভোট আন্তর্জাতিক রাজনীতির কাছে গুরুত্ব হারায়। ফিলিস্তিন ২০০৬ নির্বাচন দেখায়, শুধু ভোট নয়; রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাই একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
আলজেরিয়ার সংসদ নির্বাচন, ১৯৯১ : আলজেরিয়ার জন্য ১৯৯১ সাল ছিল একটি ঐতিহাসিক ও মোড় ঘোরানো বছর। এ বছর অনুষ্ঠিত নির্বাচন শুধু একটি ভোট নয়; পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়। মুসলিম বিশ্বও এ নির্বাচনের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে ছিল। নির্বাচনের তারিখ ছিল ২৬ ডিসেম্বর ১৯৯১। এটি ছিল সংসদ নির্বাচনের প্রথম ধাপ। দীর্ঘ একদলীয় শাসনের পর এ নির্বাচন হয়। ক্ষমতাসীন দল ছিল ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ইসলামপন্থী দল ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট। নির্বাচনের আগে দেশটি গভীর সংকটে ছিল। অর্থনীতি দুর্বল ছিল। বেকারত্ব বাড়ছিল। জনগণ ক্ষুব্ধ ছিল। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। ঋওঝ মসজিদ ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে। ভোটের প্রথম ধাপে ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট (ঋওঝ) বিপুল সাফল্য পায়। তারা শক্তভাবে এগিয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছিল, দ্বিতীয় ধাপেও তারা জয়ী হবে। এতে সেনাবাহিনী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা করে। ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন বাতিল করা হয়। সেনাবাহিনী সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। প্রেসিডেন্ট পদত্যাগে বাধ্য হন।
ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট (PNA) নিষিদ্ধ করা হয়। হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। এ সিদ্ধান্তের পর দেশ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সহিংসতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামপন্থি গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রায় এক দশক এ সংঘাত চলে। লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়। এ নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচিত হয়। পশ্চিমা বিশ্ব দ্বিধায় পড়ে। গণতন্ত্র বনাম নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠে আসে। নিরাপত্তার প্রশ্নে গণতন্ত্র চরমভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে। গণতন্ত্রের নির্বাচনব্যবস্থা বাতিল চেয়ে আন্দোলন শুরু হয়। যদিও এটি তেমন কার্যকর আন্দোলন হয়নি। মুসলিম বিশ্বে ইসলামপন্থি রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। আলজেরিয়া ১৯৯১ নির্বাচন প্রমাণ করে, একটি নির্বাচন বাতিল করা একটি রাষ্ট্রকে কত বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে! এটি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত নির্বাচনের একটি।
মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, ২০১২ : ২০১১-২০১২ সাল। আরব বসন্তের ধাক্কায় লন্ডভন্ড মিসর। বিপ্লব-পরবর্তী এক ঐতিহাসিক বছর ২০১২। হোসনি মোবারকের পতনের পর এ নির্বাচন প্রথম গণতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি করে। পুরো আরববিশ্ব এ নির্বাচনের দিকে তাকিয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২৩-২৪ মে ২০১২। দ্বিতীয় দফার ভোট হয় ১৬-১৭ জুন ২০১২। দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর জনগণ প্রথমবার সরাসরি প্রেসিডেন্ট বেছে নেওয়ার সুযোগ লাভ করে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুহাম্মদ মুরসি ও আহমেদ শাফিক। মুরসি ছিলেন মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থিত ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির প্রার্থী। বড়ই শক্তিশালী প্রার্থী ও সমর্থনপুষ্ট। শাফিক ছিলেন সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান ও মোবারক-ঘনিষ্ঠ। নির্বাচনের আগে দেশটি গভীর অস্থিরতায় ছিল। আরব বসন্ত মিসরকে বদলে দিয়েছিল। রাজপথে আন্দোলনের স্মৃতি তাজা ছিল। সেনাবাহিনী তখনও ক্ষমতার বড় অংশ ধরে রেখেছিল। জনগণ পুরোনো শাসনসিস্টেম ভেঙে গণতন্ত্র আশা করছিল। প্রথম দফায় কেউ ৫০ শতাংশ ভোট পাননি। ফলে নির্বাচন দ্বিতীয় দফায় গড়ায়। দ্বিতীয় দফায় মুরসি অল্প ব্যবধানে জয়ী হন।
তিনি প্রায় ৫১.৭ শতাংশ ভোট পান। এর মাধ্যমে মিসর প্রথমবার একজন বেসামরিক ও নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পায়। আগের নির্বাচন ছিল সামরিক বাহিনীর আয়ত্তে। এবার জনগণ ভোট দিয়ে নিজেদের পছন্দসই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে পারল। তবে এ নির্বাচন দ্রুতই সমালোচনার মুখে পড়ে। ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। বিরোধীরা অভিযোগ তোলে, মুরসি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছেন। বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সংঘাত শুরু হয়। আমেরিকার মদদপুষ্ট সেনাবাহিনী আন্দোলনে ঘি ঢালে। এক বছরের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ২০১৩ সালে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়।
সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে। মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্ব মোড়লদের ইন্ধনে সামরিক শাসন আবার ফিরে আসে। এ নির্বাচন বৈশ্বিকভাবে গভীর প্রভাব ফেলে। পশ্চিমা দেশগুলো দ্বিধায় পড়ে। গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার প্রশ্ন সামনে আসে। আরব বসন্তের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। মিসর ২০১২ নির্বাচন দেখায়, শুধু নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র স্থায়ী হয় না; রাষ্ট্রের শক্ত কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, ২০২৩ : তুরস্কের জন্য ২০২৩ সাল ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বছর। এ বছর দেশটিতে অনুষ্ঠিত হয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। দীর্ঘ দুই দশকের ক্ষমতার পর রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। সারাবিশ্বের চোখ ছিল তুরস্কের দিকে। এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তুরস্কজুড়ে। প্রথম দফার ভোট হয় ১৪ মে ২০২৩। এটি ছিল প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থার অধীনে একটি নির্বাচন। ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির প্রার্থী ছিলেন এরদোয়ান। বিরোধীপ্রার্থী ছিলেন কামাল কিলিচদারওগ্লু। তিনি ছিলেন ছয় দলীয় বিরোধী জোটের নেতা। নির্বাচনের আগে দেশটি অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। মুদ্রাস্ফীতি ছিল উচ্চমাত্রায়। তুর্কি লিরার মান কমছিল। সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ ছিল। একই বছরে ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটে। হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রথম দফার ফলাফলে কেউ ৫০ শতাংশ ভোট পাননি। সংবিধান অনুযায়ী এতে কেউ প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। এরদোয়ান এগিয়ে ছিলেন। কিলিচদারওগ্লু কাছাকাছি অবস্থানে ছিলেন। ফলে নির্বাচন গড়ায় দ্বিতীয় দফায়। দ্বিতীয় দফার ভোট হয় ২৮ মে ২০২৩। নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে সমালোচনা হয়। বিরোধীরা অভিযোগ করে, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পক্ষপাতমূলক ছিল। সরকারি সম্পদের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। তবে নির্বাচন বাতিল হয়নি। সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করেনি। দ্বিতীয় দফায় এরদোয়ান জয়ী হন। তিনি প্রায় ৫২ শতাংশ ভোট পান। কিলিচদারওগ্লু পরাজয় মেনে নেন। নির্বাচন-পরবর্তী সময় শান্ত ছিল।
ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, ২০০৯ : ইরানের জন্য ২০০৯ সাল ছিল একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটের বছর। এ বছরের নির্বাচন দেশটির শাসনব্যবস্থা ও জনগণের সম্পর্ককে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে এমন পরিস্থিতি আগে দেখা যায়নি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১২ জুন ২০০৯। পুরো ইরানে একদিনে নির্বাচন হয়। এটি ছিল নবম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ছিলেন মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। তিনি ছিলেন রক্ষণশীল শিবিরের প্রার্থী। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সংস্কারপন্থি নেতা মীর হোসেইন মুসাভি। আরও দুজন প্রার্থী ছিলেন। তবে মূল লড়াই ছিল এ দুজনের মধ্যে। নির্বাচনের আগে ইরানে ব্যাপক রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল। তরুণ সমাজ পরিবর্তন চাইছিল। অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছিল। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জনগণের জীবনে প্রভাব ফেলছিল। মুসাভি সংস্কার ও উন্মুক্ততার কথা বলেন। আহমাদিনেজাদ ইরানি বিপ্লবী আদর্শের কথা তুলে ধরেন। ভোটগ্রহণের পর দ্রুত ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে আহমাদিনেজাদকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তিনি প্রায় ৬৩ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে জানানো হয়। মুসাভি ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলেন। তবে তেমন কাজ হয়নি। ইরান সব সময় বিপ্লবীদের পক্ষেই মত দেয়। এরপর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। এ আন্দোলন পরিচিত হয় ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ নামে। বিক্ষোভকারীরা নতুন নির্বাচন দাবি করে। সরকার কঠোরভাবে দমন শুরু করে। নিরাপত্তা বাহিনী মাঠে নামে। অনেক মানুষ গ্রেপ্তার হয়। বহু সাংবাদিক আটক হন। ইন্টারনেট ও গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হন। পরিস্থিতি দীর্ঘদিন উত্তপ্ত থেকে শান্ত হয়। এ নির্বাচন বৈশ্বিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ফলাফল নিয়ে নানান প্রশ্ন ও বিতর্ক তোলে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করে। ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়ে। তবুও নির্বাচন বাতিল বা স্থগিত কিছুই হয়নি। ইরান ২০০৯ নির্বাচন ছিল শুধু একটি ভোট নয়; এটি ছিল রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার বিশ্বাসের বড় পরীক্ষা।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০১৪ : বাংলাদেশে ২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল রাজনৈতিক আস্থার বড় পরীক্ষা; ক্ষমতা কুক্ষিগত করার একটি প্রকাশ্য ও বৈধ মাধ্যম। এ নির্বাচন ক্ষমতা হস্তান্তরের চেয়ে বেশি কিছু ছিল। এটি ছিল শাসনব্যবস্থা ও বিরোধী রাজনীতির মুখোমুখি সংঘর্ষ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ চাচ্ছিল, যেভাবেই হোক ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকতে হবে; আর প্রধানতম বিরোধী দল বিএনপি চাচ্ছিল একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন।
দেশজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৫ জানুয়ারি ২০১৪। এটি ছিল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ক্ষমতাসীন দল ছিল আওয়ামী লীগ। তখন দলটির সভানেত্রী ছিলেন পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। প্রধান বিরোধী দল ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বিএনপির নেতৃত্ব ছিল বেগম খালেদা জিয়ার হাতে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী সরকার অঘোষিত বাকশাল কায়েম করার পথে। তারা জোরে-শোরে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরি করে। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনর্বহাল দাবিতে গণআন্দোলনে শুরু করে। গণআন্দোলনকে সরকার প্রত্যাখ্যান করে। বিরোধী জোট নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়। তখন আওয়ামী লীগ নামকাওয়াস্তে ভোটের অধিকারী বামদলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করে পারতপক্ষে বৈধতা তৈরি করতে চেয়েও ব্যর্থ হয়।
নির্বাচনের আগে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। টানা হরতাল ও অবরোধ চলতে থাকে। অগণিত মানুষ নিহত হয়। সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে। জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। তবু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেনি। বিরোধী দল বয়কট করায় নির্বাচন একতরফা হয়ে যায়। সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে কোনো ভোটই হয়নি। এসব আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। অনেক কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি খুব কম ছিল। ফলাফলে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। সরকার নির্বাচনকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রয়োজন বলে ব্যাখ্যা করে। এ নির্বাচন দেশীয়ভাবে তীব্র সমালোচিত হয়। বিরোধীরা একে অবৈধ বলে ঘোষণা দেয়। রাজনৈতিক সংলাপ ভেঙে পড়ে। সংসদ কার্যত বিরোধী কণ্ঠহীন হয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীগুলো অঘোষিতভাবেই সরকারের নিজস্ব বাহিনীতে পরিণত হয়। সাধারণ জনগণ এ সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভারত ছাড়া অন্য কোনো দেশ নির্বাচন পরিদর্শক প্রেরণ করেনি। যুক্তরাষ্ট্র অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়ায় কড়া বিবৃতি দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন হতাশা প্রকাশ করে। পুনরায় নির্বাচন করার কথা বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানায়। বাংলাদেশ ২০১৪ নির্বাচন দেখায়, নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র অসম্ভব; কিন্তু অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনও অর্থহীন।