
ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে শীতকাল মানেই বাহারি সবজি আর লাল টকটকে টমেটোর সমারোহ। কিন্তু তপ্ত রোদে যখন প্রকৃতি পুড়ছে, তখন কুমিল্লার চান্দিনার মাঠজুড়ে দেখা যাচ্ছে এক ভিন্ন দৃশ্য। মেহার গ্রামের কৃষক হাবিবুল্লা প্রকৃতির নিয়ম যেন কিছুটা চ্যালেঞ্জ জানিয়েই নিজের ১২ শতাংশ জমিতে ফলিয়েছেন গ্রীষ্মকালীন টমেটো। প্রখর রোদ আর প্রতিকূল আবহাওয়া জয় করে তার খেত এখন টমেটোর লাল আভায় ভরে উঠছে, যা এলাকায় কৃষি বৈচিত্র্যের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সাধারণত শীতকালীন টমেটো চাষে কৃষকরা অভ্যস্ত হলেও হাবিবুল্লা সাহস দেখিয়েছেন অসময়ে এই ফসলটি ফলানোর। তার ১২ শতাংশ জমিতে চাষাবাদের শুরুতে বেশ কিছুটা শ্রম ও মনোযোগ দিতে হয়েছে। বীজ বপন থেকে শুরু করে সার প্রয়োগ এবং নিড়ানি দেওয়া পর্যন্ত তার মোট খরচ হয়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার মতো। বর্তমানে তার সেই বিনিয়োগের সুফল পেতে শুরু করেছেন তিনি। গাছের ডগায় ডগায় ঝুলছে কাঁচা-পাকা টমেটো, যা একদিকে যেমন দৃষ্টিনন্দন, অন্যদিকে হাবিবুল্লার জন্য এক বড় প্রাপ্তির সংকেত। হাবিবুল্লা জানান, তার খেতের টমেটোগুলো এখন ধীরে ধীরে লাল রঙ ধারণ করতে শুরু করেছে। আর মাত্র কয়েকদিন পরেই তিনি এগুলো পুরোপুরি বাজারজাত করতে পারবেন। বর্তমানে বাজারে শীতকালীন টমেটোর সরবরাহ একেবারেই কমে এসেছে। যারা শীতের শুরুতে চাষ করেছিলেন, তাদের খেতের ফলন প্রায় শেষ হওয়ার পথে। বাজারে এখন টমেটোর দাম প্রতি কেজি ১৫ থেকে ২৫ টাকার মধ্যে ওঠাণ্ডনামা করছে। তবে হাবিবুল্লার ধারণা, সরবরাহ যত কমবে, টমেটোর বাজারদর তত বাড়বে। সঠিক সময়ে টমেটো বাজারে তুলতে পারলে তিনি প্রত্যাশিত লাভের চেয়েও বেশি কিছু আশা করছেন। চান্দিনার এই কৃষকের সাফল্য শুধু তার একার নয়, বরং স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির জন্য এক ইতিবাচক বার্তা। সাধারণত এই সময়ে বাজারে টমেটোর সংকট থাকে এবং ক্রেতাদের চড়া দামে কোল্ড স্টোরেজের বা আমদানিকৃত টমেটোর ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু হাবিবুল্লার মতো কৃষকরা যদি মাঠ পর্যায়ে সরাসরি গ্রীষ্মকালীন টমেটো উৎপাদন করতে পারেন, তবে সাধারণ মানুষ সতেজ সবজি যেমন পাবেন, তেমনি কৃষকও আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। হাবিবুল্লার খেতে টমেটোর ফলন এবার বেশ ভালো হয়েছে, যা দেখে আশপাশের অনেক কৃষকই এখন অসময়ে এই সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
হাবিবুল্লা অত্যন্ত আশাবাদী, বাজার দর যদি বর্তমানের চেয়ে কিছুটা বৃদ্ধি পায়, তবে অল্প পুঁজিতে তার এই ১২ শতাংশ জমি থেকেই বড় অঙ্কের মুনাফা ঘরে তোলা সম্ভব। তার এই মেধা ও পরিশ্রম মেহার গ্রামের কৃষিতে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি আর সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে যে কোনো ঋতুতেই লাভজনক ফসল ফলানো সম্ভব, হাবিবুল্লা এখন সেই আত্মবিশ্বাসেরই এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।
গ্রীষ্মের এই তাপদাহের মধ্যে তার খেতে দুলতে থাকা লাল টমেটোগুলো যেন শুধু ফসল নয়, বরং এক পরিশ্রমী কৃষকের আগামীর স্বপ্ন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সঠিক পরামর্শ ও সহযোগিতা পেলে কুমিল্লার চান্দিনা অঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষের পরিধি আরও বাড়বে এবং হাবিবুল্লারা হয়ে উঠবেন কৃষি বিপ্লবের অগ্রনায়ক।