ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শিলাইদহ কাচারিবাড়ির বেহাল দশা

রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শিলাইদহ কাচারিবাড়ির বেহাল দশা

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অমূল্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহ কাচারিবাড়ি। এ স্থাপনাটি বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বাড়ির বারান্দায় বাঁধা গরু-ছাগল ও মহিষ। উঠানজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে গোবর, খড় ও আবর্জনা। ভবনের ভেতর-বাইরে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাঁস-মুরগি। এমন দৃশ্য দেখে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন দেশ-বিদেশ থেকে আসা রবীন্দ্র অনুরাগীরা।

মঙ্গলবার সকালে সরেজমিন দেখা গেছে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কাচারিবাড়িটি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের কশবা গ্রামে অবস্থিত। রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি থেকে ৫৫০ মিটার এগিয়ে গেলে একটি তেমাথা সংলগ্ন পাকা রাস্তার উত্তর পাশে পদ্মা নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত এই কাচারিবাড়িটি। কাচারিবাড়ির সামনের আঙিনা, বারান্দা ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে গবাদিপশু রাখা হচ্ছে। কোথাও জমে আছে গোবরের স্তূপ, কোথাও খড়ের গাদা। দীর্ঘদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। ফলে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি তার সৌন্দর্য ও মর্যাদা হারাতে বসেছে।

ফরিদপুর থেকে ঘুরতে আসা রবীন্দ্রপ্রেমী প্রদীপ কুমার মন্ডল জানান, বিশ্বকবির স্মৃতিবিজড়িত এই ঐতিহাসিক স্থাপনা যদি এখনই সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার দায়বদ্ধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। কাচারিবাড়ির এমন বেহাল অবস্থা দেখে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন ঢাকা থেকে আসা আরেক দর্শনার্থী দীপা মন্ডল। এ সময় তিনি বলেন, বিশ্বকবির স্মৃতিবিজড়িত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকা খুবই দুঃখজনক। তাই ঐতিহ্য সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার প্রতিফলন বলে মনে করেন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন জানান, কয়েক বছর আগেও সংস্কারের পর কাচারিবাড়িটি পরিচ্ছন্ন ও দর্শনার্থীবান্ধব ছিল। কিন্তু বর্তমানে নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। নিরাপত্তারও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেই। এ সুযোগে ভবনের আশপাশ গবাদিপশু রাখার স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

কথা হয় স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও রবীন্দ্র গবেষক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সরওয়ার মুর্শেদ রতনের সঙ্গে। তিনি জানান, শিলাইদহ শুধু কুষ্টিয়ার নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই এই কাচারিবাড়িকে অবহেলায় ফেলে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি, অবিলম্বে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং দর্শনার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে, জমিদারি পরিচালনায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৯ সালে এসেছিলেন পদ্মা-গড়াই চুম্বিত নিভৃত পল্লি শিলাইদহে। এখানে আসার পর প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের জন্য পদ্মার নদীর অদূরে তিনি স্থাপন করেছিলেন এই কাচারিবাড়ি। ১৯০১ সাল পর্যন্ত তিনি শিলাইদহে বসে জমিদারি পরিচালনা করেন। ছয় কক্ষবিশিষ্ট দ্বিতল ভবনের এই কাচারিবাড়ির নির্মাণশৈলী মনোমুগ্ধকর ও দৃষ্টিনন্দন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারি এস্টেট পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়ে শিলাইদহ ত্যাগের পর থেকে কাচারি বাড়িটি অযত্ন-অবহেলার শিকার হয়। কালক্রমে বাড়িটি পরিণত হয় ভগ্ন দশায়।

২০২৪ সালে প্রায় কোটি টাকা সরকারি অর্থায়নে কাচারিবাড়ির অবকাঠামোগত সংস্কারসহ লালচে রং ফিরিয়ে আনা হয়। এতে জৌলুস ফিরে পেলেও কাচারিবাড়িটি এখনো অরক্ষিত। এ ছাড়া সুরক্ষা প্রাচীর নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ ও জনবল পদায়ন না হওয়ায় সেখানে এখন বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা ও ভূতুড়ে এক পরিবেশ। পাশাপাশি কাচারিবাড়ির কয়েক বিঘা খাস খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। কিন্তু ওই সম্পত্তি এখনও কাচারিবাড়ির অনুকূলে হস্তান্তর করেনি কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন।

শিলাইদহ কুঠিবাড়ির কাস্টোডিয়ান মো. আল-আমিন জানান, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবনটি সংস্কার করা হয়েছে। ভবনের কিছু অংশের ছাদ ধসে গিয়েছিল, সেসব ঠিকঠাক করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, কাচারিবাড়িটির সামনের বিশাল জমিটি জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জমিটি চেয়ে আবেদনও করা হয়েছে। যদি পাওয়া যায় তাহলে পর্যটকদের জন্য বাড়িটি আরও নতুন রূপে সাজানো সম্ভব হবে। কাস্টোডিয়ান মো. আল-আমিন আরও জানান, আমরা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের চেষ্টা করছি। তবে জনবল সংকটের কারণে সবসময় প্রয়োজনীয় তদারকি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হলে কাচারিবাড়ির সার্বিক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। কাচারিবাড়ির নিরাপত্তাব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার দায়সারা মন্তব্য করে এড়িয়ে যান।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত