ঢাকা শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

জ্বালানি খাতে অশনিসংকেত, গ্যাস সংকট থেকে উত্তরণের উপায়

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
জ্বালানি খাতে অশনিসংকেত, গ্যাস সংকট থেকে উত্তরণের উপায়

দেশে জ্বালানি খাতের সংকট ও সীমাবদ্ধতার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে দৃশ্যমান। বিগত সরকারের সময়ে চাহিদা পূরণে অনেকটাই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ খাত। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বালানি খাত বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে তীব্র গ্যাসসংকট, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে মূল্যবৃদ্ধি- সব মিলিয়ে জনজীবন আজ এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার চাকা, সবখানেই হাহাকার। এই সংকট যতটা না প্রাকৃতিক বা যান্ত্রিক, তার চেয়েও বেশি মানবসৃষ্ট এবং অব্যবস্থাপনার ফসল। বিশ্লেষকদের দাবি, এমন পরিস্থিতি দেশের জ্বালানি খাতের জন্য অশনিসংকেত।

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে জ্বালানি গ্যাসের সংকট চলছে। বিগত ১ মাস ধরে বাসাবাড়িতে ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। যেহেতু দেশে কলকারখানা বাড়ছে, সেহেতু জ্বালানির চাহিদা ক্রমবর্ধমান। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানায় নিয়মিত উৎপাদনও ঠিক রাখতে পারছে না। জ্বালানি ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে দেশের বিনিয়োগকারীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন, যার প্রভাব পড়বে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে। জ্বালানি সংকটে উদ্যোক্তাদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষের উচিত সংকটের টেকসই সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া।

সিলিন্ডার গ্যাসের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি এবং আবাসিক এলাকায় পর্যাপ্ত লাইনের গ্যাস না থাকার কারণে সারা দেশে নাগরিক জীবনে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক বাড়াটিয়া বাসা ছেড়ে যাচ্ছেন। গত ১ মাস ধরে সরকার নির্ধারিত (১২৫৩) দামে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার ক্রয় করা যাচ্ছে না। আবার ৩০০০-৪০০০ টাকা দিলে গ্যাসের সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে। দেশের ক্রেতা সাধারণের দাবি, সরকার দাম নির্ধারণ করলে ও বাস্তবে বাজারে তার কোনো প্রতিফলন নেই। সিন্ডিকেটে জড়িত ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি করছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের দাবি, এলপিজির বাজার বেসরকারি খাতের একক নিয়ন্ত্রণের কারনে এলপিজির সংকট এমন তীব্র আকারধারণ করেছে। বিপর্যয় এড়াতে এ খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এলপিজি খাতে সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারিভাবে জোরালো উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ছে।

এই সংকটকে পুঁজি করে কোনো অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন জনদুর্ভোগ বাড়াতে না পারে সেজন্য পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। বিগত সরকার সংকট মোকাবিলায় দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর বাস্তবমুখী কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। জ্বালানি খাতে আমরা আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছি। এতে সংকট আও জটিল আকারধারণ করছে। ঘাততি পূরণে এলএনজি আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। শুধুমাত্র আমদানিকৃত বিদেশি গ্যাস কোম্পানি হতে একটি নির্দিষ্ট হারে পার্সেন্টেজ গ্রহণ এবং বেসরকারি গ্যাস কোম্পানিকে অধিক ফায়দা লাভের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমদানির উপর বিগত সরকার জোরদার করেছে। নানা প্রতিকূলতা, দেশি-বিদেশি ঋনের বোঝা মাথায় নিয়ে এই সরকার নতুন গ্যাসের খনি হতে পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে পারেনি। বাধ্য হয়ে ইউনূস সরকারও তরল গ্যাস আমদানির দিকে নজর দিয়েছে। সূত্রমতে, দেশে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক অন্তত ৪২০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে এলএনজিসহ বর্তমানে দিনে গড় সরবরাহ ২৫০-২৭০ কোটি ঘনফুট। এলএনজি’র সরবরাহ কমায় মোট গ্যাস সরবরাহ কমে দাঁড়ায় ২০০ কোটি ঘনফুট। ফলে দেশজুড়ে সংকট বিরাট আকারধারণ করে। অপরদিকে, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি গ্যাস ব্যবহার হয়। শুধুমাত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতেই ৪০ শতাংশের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদা হচ্ছে ২২৪০ এমএমসিএফডি। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হচ্ছে সাড়ে সাতশ-আটশ এমএমসিএফডি গ্যাস। ফলে দেশজুড়ে সংকট বিরাট আকারধারণ করেছে।

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাস, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে ধীরগতি, ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় আমদানিকৃত এলএনজির অপর্যাপ্ততা এবং অবৈধ সংযোগ ও অপচয় এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। বিদ্যুৎ, শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাসের ব্যবহার বাড়লেও সেই তুলনায় দেশীয় উৎপাদন বা আমদানি বাড়ছে না। দিনের পর দিন চুলা জ্বালিয়ে রাখা, অবৈধ বা নিম্নমানের পাইপলাইন সংযোগ এবং সিস্টেম লসের কারণে প্রচুর পরিমাণ গ্যাস অপচয় হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তাদের যুগসাজসে শিল্প মালিকরা অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার করছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ শতাংশ গ্যাসের মূল্য পরিশোধ করছে না। এছাড়া পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা প্রাকৃতিক নিয়মেই কমে আসছে, ফলে সামগ্রিক সরবরাহ কমছে। তারমধ্য নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও খনন কার্যক্রম যথেষ্ট দ্রুত না হওয়ায় সংকটের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে গ্যাস সংকটের আরেকটি প্রধান কারণ হচ্ছে গ্যাস-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব অবহেলা ও দুর্নীতি। গ্যাস সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় খলনায়ক হিসেবে কাজ করছে শক্তিশালী গ্যাস সিন্ডিকেট।

তারা টাকার বিনিময়ে অবৈধ সংযোগ প্রদান করে কৃত্রিমসংকট তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বৈধ গ্রাহকরা গ্যাস সরবরাহ না পেলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অবৈধ সংযোগকারীরা দিব্যি গ্যাস ব্যবহার করছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না থাকায় ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে, আর ভুক্তভোগী হচ্ছেন দেশের সাধারণ মানুষ। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুবিধা সাধারণ মানুষকে না দিয়ে সিন্ডিকেটের পকেট ভারি করা হচ্ছে। এজন্য গ্যাস খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা অসাধু কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযানকে লোক দেখানো নয়, বরং ফলপ্রসূ করতে হবে। গ্যাস সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন করে পিএসসি চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে। গত এক দশকে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানে জোরাল কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং আমদানিনির্ভর এলএনজির উপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। বেসরকারি খাতকে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির সুযোগ করে দেওয়া মোটেই ঠিক হয়নি।

অতিদ্রুত সরকারিভাবে এলএনজি আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। সরকার এলএনজি আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি করলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধ করতে বাধ্য হবে। সরকারি দায়িত্বরত ব্যক্তিরা মনেই করছেন না দেশে গ্যাস সংকট আছে বা হচ্ছে। দপ্তরগুলোতে কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় কর্তাব্যক্তিরা খাম খেয়ালিপনা করে আসছেন। আর তাদের দায়িত্বে অবহেলার দরুন দেশের অর্থনীতির ওপর চরম প্রভাব পড়ছে। দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট নিরসনের একমাত্র উপায় হচ্ছে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি করা। সেজন্য বিভিন্ন খনিতে মজুত দেশীয় গ্যাস উত্তোলনের দিকে নজর দিতে হবে। জ্বালানি চাহিদা ও সরবরাহের মাঝে একটি স্থিতিশীল ভারসাম্য বজায় রাখার নিমিত্তে পেট্রোবাংলার দক্ষতা বাড়াতে হবে। সেজন্য দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সরবরাহ বৃদ্ধি করতে হবে। পেট্রোবাংলার মাধ্যমে নতুন নতুন কূপ খননের উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। চলমান সংকট থেকে উত্তরণে সহজ পথ হচ্ছে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র হতে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা করা। রাতারাতি এ থেকে উত্তরণ করা যাবে না। এ জন্য আইনগত সংস্কার বাস্তবায়ন এবং যথাযত সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিগত সরকারের তরফ হতে ভবিষ্যৎ জ্বালানির চাহিদা ও সংকট মোকাবেলা করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে উল্টো জনগণকে উন্নয়নের গালগল্প শোনানো হয়েছে। আমরা নাকি উন্নয়নের রোল মডেল, এমন একটা সান্ত¡নার মূলা আশার বাণী হিসেবে বুকে ঝুলিয়ে দুর্নীতিতে লাগাতার প্রথম সারিতে রয়ে গেলাম। আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প শুধু এদেশ থেকে গুটিকয়েক মানুষের টাকা পাচার, ব্যাংক লুট আর কিছু আমলা-কামলার টাকার কুমির হয়ে ওঠার গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়।

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত