প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আকাশে অনিশ্চয়তার ঘনঘটা। একদিকে সাধারণ মানুষের উৎকণ্ঠা, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার আস্থার সংকট- সব মিলিয়ে একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক নির্বাচনের পরিবেশ যেন মেঘে ঢাকা পড়েছে। তবে শত সংকটের মাঝেও দেশের আপামর জনসাধারণের একটাই চাওয়া- একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। সেই আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করেই আজকের এই সম্পাদকীয়।
একটি রাষ্ট্র যখন নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়ায়, তখন উৎসবের আমেজ থাকার কথা থাকলেও আমাদের দেশে দেখা দিচ্ছে বিপরীত চিত্র। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের অভাব, রাজপথে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা সাধারণ মানুষের মনে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির বিষয়টি এখনও নিশ্চিত হয়নি। প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। এই অনিশ্চয়তা শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়া এবং নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতারই পরোক্ষ ফল।
গণতন্ত্রের প্রাণ হলো নির্বাচন। কিন্তু সেই নির্বাচন যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে গণতান্ত্রিক কাঠামোটিই ভেঙে পড়ে। একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পূর্বশর্ত। আর এই স্থিতিশীলতা তখনই আসে, যখন দেশের মানুষ মনে করে তাদের ভোটের মাধ্যমে সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিও এখন বাংলাদেশের দিকে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যার প্রভাব পড়তে পারে বৈদেশিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর। তাই শুধু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রাখতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) হলো একটি রাষ্ট্রের নির্বাচন পরিচালনার সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সুষ্ঠু নির্বাচনের মূল চাবিকাঠি তাদের হাতেই ন্যস্ত। বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ভোটারদের আস্থা অর্জন করা। ভোটাররা যদি মনে করেন তাদের ভোট কেন্দ্রে যাওয়া নিরাপদ এবং তাদের ভোটটি সঠিকভাবেই গণণা করা হবে, তবেই গণতন্ত্রের সার্থকতা। নির্বাচন কমিশনকে শুধু কাগজে-কলমে স্বাধীন হলে চলবে না, বরং তাদের কাজের মাধ্যমে সেই স্বাধীনতার প্রমাণ দিতে হবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলার ওপর কমিশনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।
একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য শুধু নির্বাচন কমিশন বা সরকার দায়ী নয়; এখানে বিরোধী দলগুলোরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম একটি সমঝোতা ছাড়া সুন্দর নির্বাচন আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব। জেদ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে আলোচনার টেবিলে বসা এখন অপরিহার্য। সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়াই হবে প্রকৃত দেশপ্রেমের পরিচয়। সংঘাত নয়, বরং যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
দেশের সাধারণ মানুষ আর কোনো সংঘাত দেখতে চায় না। তারা চায় নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে জয়ী করতে। সাধারণ মানুষের এই সরল ও ন্যায়সঙ্গত প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে কোনো নির্বাচন দীর্ঘমেয়াদি সুফল আনতে পারে না। এক্ষেত্রে সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে সত্য তুলে ধরা এবং নির্বাচনি অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকাই হবে তাদের প্রধান কাজ। নাগরিক সচেতনতাই পারে, যে কোনো স্বৈরাচারী মানসিকতা বা কারচুপির চেষ্টাকে প্রতিহত করতে।
অনিশ্চয়তার কুয়াশা যত ঘনই হোক না কেন, ভোরের সূর্য উদিত হবেই- এমন প্রত্যাশা এদেশের মানুষের চিরকালের। আমরা চাই না বাংলাদেশ আর কোনো রাজনৈতিক সংকটে পড়ুক। আমরা চাই না ভোটাধিকার নিয়ে কোনো টানাহেঁচড়া হোক। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশের মানুষ তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ পায়। সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর শুভবুদ্ধির উদয় হোক। অনিশ্চয়তার মেঘ কাটিয়ে বাংলাদেশ একটি সুন্দর, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাক- এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।