ঢাকা শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

নির্বাচনোত্তর চ্যালেঞ্জ : রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণের অগ্নিপরীক্ষা

আব্দুল কাদের জীবন
নির্বাচনোত্তর চ্যালেঞ্জ : রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণের অগ্নিপরীক্ষা

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে পবিত্র রমজান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দেশেরে সিংভাগ মানুষের কাছে রমজান অত্যন্ত পবিত্র একটি মাস। ২০২৬ সালের নির্বাচনি ডামাডোল শেষ হতে না হতেই দুয়ারে কড়া নাড়বে সিয়াম সাধনার মাস রমজান। রাষ্ট্রক্ষমতায় তখন আসবে নতুন এক সরকার। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে আনন্দের চেয়ে এখন আশঙ্কাই বেশি কাজ করছে। নতুন সরকারের জন্য প্রথম এবং প্রধান অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী বাজার নিয়ন্ত্রণ করা। অতীতে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা পালাবদলের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু চক্র বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এবারও সেই একই শঙ্কা জনমনে বিরাজমান।

নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও রমজানের বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখনও কোনো দলের প্রধান থেকে সুনির্দিষ্ট বা জোরালো কোনো রূপরেখা পাওয়া যায়নি। অথচ নির্বাচন পরপরই রমজান হলো নতুন সরকারের জন্য অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। বাজার নিয়ন্ত্রণ একটি জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জিং বিষয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, রমজান আসার আগেই হু হু করে বাড়তে থাকে চাল, ডাল, তেল, চিনি ও সবজির দাম। নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ এবং প্রশাসনিক গুছিয়ে ওঠার মাঝখানের এই সময়টুকুকে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট তৈরির মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নিতে পারে। ফলে নতুন সরকারের জন্য এটি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং তাদের জনপ্রিয়তার প্রথম বড় পরীক্ষা।

বাংলাদেশে রমজান মানেই যেন পণ্যের দাম বৃদ্ধির উৎসব। বছরের অন্য সময়ে যে কাঁচা মরিচ ২০ টাকা কেজি থাকে, রোজা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে তা ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। টমেটোর দাম লাফিয়ে ১৫০ টাকায় পৌঁছায়। লেবুর হালি হয়ে যায় আকাশচুম্বী। চিনি, ছোলা, ডাল এবং ভোজ্যতেলের দাম প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এমনকি রান্নার কাজে ব্যবহৃত সিলিন্ডার গ্যাসের দামও সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য রমজানের ইফতার ও সেহরি জোটানো তখন এক প্রকার দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

দেশের অর্থনীতির হৃদপি- হলো চট্টগ্রাম বন্দর। বর্তমানে সেখানে ২১ লাখ টন খাদ্যপণ্য আটকে থাকার খবর অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সময়মতো এই বিশাল পরিমাণ পণ্য খালাস করতে না পারলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়া অনিবার্য। পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজের অভাব এবং অনেক ব্যবসায়ীর নিজস্ব গুদাম না থাকায় পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় বিপত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টানা কর্মবিরতি। আমদানি-রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়ায় নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। রমজানের আগে চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচল অবস্থা দ্রুত নিরসন করা না গেলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাবে এবং সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা এর পূর্ণ ফায়দা লুটবে। সরকারকে অবিলম্বে আন্দোলনরতদের সঙ্গে আলোচনা করে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে হবে।

বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার মূল কারণ পণ্যের অভাব নয়, বরং ‘দুষ্টচক্র’ বা সিন্ডিকেট। অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। স্থানীয় প্রশাসন ও বাজার মনিটরিং সেলের শিথিলতার সুযোগে এরা সাধারণ মানুষের পকেট কাটে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় নিয়মিত বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা অতীতে দেখেছি খাদ্য অধিদপ্তরের সৎ ও সাহসী কর্মকর্তাদের সরাসরি বাজারে গিয়ে তদারকি করতে; এই মডেলটি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি দোকানে বাধ্যতামূলকভাবে দৃশ্যমান স্থানে পণ্যের মূল্যতালিকা ঝুলিয়ে রাখতে হবে। তালিকা না থাকলে বা তালিকার চেয়ে বেশি দাম রাখলে তাৎক্ষণিক কঠোর আইনি ব্যবস্থা (যেমন লাইসেন্স বাতিল বা জেল-জরিমানা) নিতে হবে।

নতুন নির্বাচিত সরকারকে শপথ নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই রমজানের বাজারের দিকে পূর্ণ নজর দিতে হবে। এটি শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় নয়, বরং দক্ষ ব্যবস্থাপনার বিষয়।

১. টিসিবি-র তৎপরতা বৃদ্ধি: নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ট্রাক সেলের মাধ্যমে সুলভ মূল্যে পণ্য সরবরাহ বাড়াতে হবে। ২. গোয়েন্দা নজরদারি: সিন্ডিকেট চক্রের হোতাদের চিহ্নিত করে নির্বাচনের পরপরই তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে। ৩. পরিবহন চাঁদাবাজি বন্ধ: মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজির কারণে অনেক সময় দাম বেড়ে যায়। পুলিশ ও প্রশাসনকে এই চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করতে হবে।

রমজান পবিত্রতার মাস, ত্যাগের মাস। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ এই মাসকেই অধিক মুনাফা লাভের হাতিয়ার হিসেবে দেখে। অথচ পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোতে রমজান উপলক্ষে পণ্যের দাম কমিয়ে দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের বুঝতে হবে, মাপে কম দেওয়া বা ভেজাল পণ্য বিক্রি করা ইসলামের দৃষ্টিতে কঠিন অপরাধ। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থে ইফতার বা সেহরি করে কোনো আত্মিক তৃপ্তি বা পুণ্য লাভ সম্ভব নয়। ব্যবসায়ীদের উচিত মানবিক হওয়া এবং সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে নায্য মুনাফায় পণ্য বিক্রি করা।

রমজান আসার আগেই সরকারকে কোমর বেঁধে নামতে হবে। যদি বন্দরে পণ্য আটকে থাকে, যদি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে এবং যদি প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থাকে- তবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের শেষ থাকবে না।

আমরা এমন একটি দেশ চাই যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের মুখে হাসি থাকবে। সিন্ডিকেটের কালো হাত ভেঙে দিয়ে বাজার পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা নতুন সরকারের জন্য প্রথম ও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু রমজানেই নয়, সারা বছরই যেন নিত্যপণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে- এটাই সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা। ছিন্নমূল ও শ্রমজীবী মানুষও যেন ডাল-ভাত খেয়ে শান্তিতে রোজা পালন করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই হোক নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

আব্দুল কাদের জীবন

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত