ঢাকা শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

অন্তর্বর্তীকাল শেষ হচ্ছে, নতুন বাংলাদেশ কি সত্যিই আসছে

রাকিবুল ইসলাম
অন্তর্বর্তীকাল শেষ হচ্ছে, নতুন বাংলাদেশ কি সত্যিই আসছে

২০২৪ সালের এক অবিস্মরণীয় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আকাশে-বাতাসে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি প্রতিধ্বনিত হয়েছে, তা হলো ‘নতুন বাংলাদেশ’। কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং আগামীর প্রত্যাশার এক সংমিশ্রিত রূপ। প্রায় দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনকাল শেষ হতে চললেও প্রশ্নটি রয়েই গেছে যে আমরা কি সত্যিই কোনো কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছি, নাকি ইতিহাসের সেই পুরনো চক্রে আবারও আবর্তিত হতে যাচ্ছি। একটি দেশের রাষ্ট্রকাঠামো যখন ভেঙে পড়ে, তখন তা পুনর্গঠনের জন্য দেড় বছর সময় খুব বেশি নয়, তবে এই সংক্ষিপ্ত সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে যা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভেঙে পড়া ব্যাংকিং খাতকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলা এবং মুদ্রাস্ফীতির লাগাম ধরার চেষ্টা ছিল সময়োপযোগী চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ‘জুলাই সনদ’-এর মাধ্যমে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করা ছিল একটি মাইলফলক, যা একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী মেরামতের রূপরেখা দেয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে বিগত সরকারের সময় হওয়া নৃশংসতার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা ছিল সরাসরি জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের মতো নিরপেক্ষ সংস্থাও স্বীকার করেছে যে, বড় ধরনের কোনো অর্থনৈতিক ধস এড়ানো এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটানোর ক্ষেত্রে এই সরকারের দৃশ্যমান সাফল্য রয়েছে। তবে সাফল্যের এই উজ্জ্বল রেখার পাশে কিছু গভীর কালো ছায়াও বর্তমান আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে। মেয়াদের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে সরকারের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত জনমনে তীব্র সংশয় ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যা উপেক্ষা করার উপায় নেই। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা চুক্তি সই, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরের কনসেশন বিদেশি কোম্পানিকে প্রদান এবং বড় অংকের অস্ত্র ক্রয়ের মতো কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ম্যান্ডেট থাকে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সুশৃঙ্খলভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এমতাবস্থায় এমন সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যা আগামী কয়েক দশকের জন্য দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিকে প্রভাবিত করবে, তা নির্বাচিত সরকারের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে কি না সেই প্রশ্নটি অত্যন্ত যৌক্তিক। যৌক্তিকভাবেই মনে করা হচ্ছে যে, এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী দায়বদ্ধতা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্যই বরাদ্দ থাকা উচিত ছিল। অন্যথায় এটি বিদায়ী সরকারের ছায়া প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হিসেবে গণ্য হতে পারে। রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং দেশের একটি প্রাচীন ও বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে যে নির্বাচনের আয়োজন করা হচ্ছে, তা সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় কতটা উত্তীর্ণ হবে তা নিয়ে তীব্র দ্বিমত রয়েছে। গণতন্ত্রের মূল নির্যাসই হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। যখন একটি বিশাল রাজনৈতিক পক্ষকে মাঠের বাইরে রেখে ভোট হয়, তখন সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা আন্তর্জাতিক মহলে এবং দেশের ভেতরেও নৈতিক সংকটের মুখে পড়ে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলের পক্ষ থেকে এই নির্বাচনকে ‘বর্জনের নির্বাচন’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার ফলে রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্রতর হয়েছে। রাজনৈতিক সমঝোতাহীন এই পরিবেশে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা নতুন সরকারের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়া যেকোনো সংস্কারই ভঙ্গুর হতে বাধ্য, কারণ তা সমাজের একাংশের প্রতিনিধিত্ব হারায়।

নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন শুধু একটি শাসকের পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল সামগ্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার। জুলাই সনদে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ দলীয় প্রভাবমুক্ত করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা এখনও মূলত কাগজের দলিলেই সীমাবদ্ধ। ক্ষমতার একক কেন্দ্রবিন্দু বা প্রধানমন্ত্রীর অপ্রতিহত আধিপত্য কমানোর জন্য সংবিধানে যে আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিল, তার প্রকৃত বাস্তবায়ন নির্ভর করছে পরবর্তী সংসদ ও গণভোটের রায়ের ওপর। কিন্তু ভোটারদের মধ্যে যদি স্বচ্ছতার অভাবজনিত আস্থার সংকট তৈরি হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি নূন্যতম জাতীয় ঐকমত্য না থাকে, তবে এই সংস্কারগুলো কোনোভাবেই স্থায়ী রূপ পাবে না। বর্তমানে বাংলাদেশ এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। একদিকে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত সম্পর্কের টানাপোড়েন, অন্যদিকে চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার ভারসাম্য বজায় রাখা। এই দুই মেরুর মধ্যে দাঁড়িয়ে নতুন সরকারকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কূটনৈতিক পথে চলতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রলম্বিত রোহিঙ্গা সংকট এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি স্বরূপ। সাধারণ মানুষ এখন নিত্যপণ্যের সহনীয় দাম এবং জানমালের প্রকৃত নিরাপত্তা চায়।

রাকিবুল ইসলাম

সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত