প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলাকে নিয়ে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম গঠিত, যা ভৌগোলিকভাবে দুর্গম, সামাজিকভাবে বৈচিত্র্যময় এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর অঞ্চল। এই অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের প্রধান শর্ত হলো- মানবসম্পদ উন্নয়ন, আর মানবসম্পদ উন্নয়নের মূলভিত্তি শিক্ষা। অথচ বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষার আলো এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল, বিদ্যালয় অবকাঠামোর ঘাটতি, শিক্ষক সংকট, দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা। সব মিলিয়ে পাহাড়ে শিক্ষা বিস্তারের পথ দীর্ঘদিন ধরেই কণ্টকাকীর্ণ। এই বাস্তবতায় পাহাড়ে শিক্ষার ভিত মজবুত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষার সংকট বহুমাত্রিক। অনেক এলাকায় বিদ্যালয় থাকলেও নিয়মিত শিক্ষক পাওয়া যায় না, কোথাও আবার শিক্ষক থাকলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনিয়মিত। দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারে শিশুদের স্কুলের বদলে কাজে পাঠানোর প্রবণতাও এখনও বিদ্যমান। পাশাপাশি ভাষাগত বৈচিত্র্য শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাথমিক স্তরেই ঝরে পড়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, যা পরবর্তী সময়ে বেকারত্ব, অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ায়। এই প্রেক্ষাপটে পাহাড়ে শিক্ষাকে শুধু একটি সামাজিকসেবা নয়, বরং শান্তি ও স্থিতিশীলতার কৌশলগত উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মূলত একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা কেবল নিরাপত্তা রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। পাহাড়ে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা ও সংঘাত-উত্তর বাস্তবতায় সেনাবাহিনী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আস্থা তৈরির পাশাপাশি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। শিক্ষা খাত সেই উদ্যোগগুলোর অন্যতম। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত স্কুল, কলেজ ও ক্যাডেট কলেজগুলো আজ পাহাড়ে মানসম্মত শিক্ষার নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পাহাড়ি ও বাঙালি শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে লেখাপড়া করছে, যা সামাজিক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় সেনাবাহিনীর উদ্যোগে স্থাপিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো বহু শিশুর জীবনে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দ্বার খুলে দিয়েছে। যেসব এলাকায় বেসামরিক প্রশাসনের উপস্থিতি সীমিত, সেখানে সেনা ক্যাম্পসংলগ্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত শিক্ষার একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে। সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত তদারকি এবং দায়িত্বশীল মনিটরিংয়ের ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান তুলনামূলকভাবে ভালো বলে অভিভাবকদের ধারণা। ফলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর আগ্রহও বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিক্ষা বিস্তারে সেনাবাহিনীর ভূমিকা শুধু অবকাঠামো নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়। দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, স্কুল ড্রেস প্রদান, পরীক্ষার ফি সহায়তা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তির ব্যবস্থা পাহাড়ি পরিবারের ওপর শিক্ষার আর্থিক চাপ অনেকটাই কমিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি পরিবারের একাধিক সন্তান নিয়মিত স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে শুধু এই সহায়তার কারণে। এর ফলে শিশুশ্রম, মাদকাসক্তি ও অকাল বিয়ের মতো সামাজিক সমস্যাও কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসছে।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর শিক্ষায় ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মাতৃভাষা ও পাঠ্যবইয়ের ভাষার পার্থক্যের কারণে অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে পিছিয়ে পড়ে। সেনাবাহিনী-সমর্থিত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় সহায়ক পাঠদান পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের মানসিকতা ও সক্ষমতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বাড়ছে এবং ঝরে পড়ার হার তুলনামূলকভাবে কমছে বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
শিক্ষা কেবল পেশা বা চাকরির প্রস্তুতি নয়, এটি মূল্যবোধ, নাগরিক চেতনা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের অস্থিরতার পেছনে অশিক্ষা ও বিভ্রান্তির রাজনীতি একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত জনগোষ্ঠী সহজেই গুজব, উগ্রবাদ ও বিভাজনের শিকার হয়। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা, সহনশীলতা, দেশপ্রেম এবং আইন মেনে চলার শিক্ষা দেওয়া হয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
সমালোচকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, শিক্ষা কি সেনাবাহিনীর কাজ? বাস্তবতা হলো, যেখানে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ভৌগোলিক ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে হিমশিম খায়, সেখানে সেনাবাহিনীর মতো একটি সংগঠিত ও সক্ষম বাহিনীর অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেয়। এটি কোনোভাবেই বেসামরিক প্রশাসনের বিকল্প নয়, বরং একটি সহায়ক শক্তি। সময়ের প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর এই ভূমিকা রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন দর্শনের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে এটাও সত্য, পাহাড়ে শিক্ষার এই অগ্রযাত্রাকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বেসামরিক শিক্ষা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক এবং সমাজের অন্যান্য অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া একক কোনো প্রতিষ্ঠান এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না। সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞতা ও সফল উদ্যোগগুলোকে ভিত্তি করে একটি সমন্বিত শিক্ষা মডেল গড়ে তোলা যেতে পারে, যা পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হবে।
সবশেষে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর শিক্ষা কার্যক্রম কোনো সাময়িক মানবিক উদ্যোগ নয়, এটি একটি সুদূরপ্রসারী বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ পাহাড়ের শিশুদের স্বপ্নে, সম্ভাবনায় এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যতে। পাহাড়ে শিক্ষার ভিত যত শক্ত হবে, ততই দুর্বল হবে অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও বিভাজনের দেওয়াল। সেই শক্ত ভিত নির্মাণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান নিঃসন্দেহে জাতীয় গুরুত্ব বহন করে এবং সম্পাদকীয় পর্যায়ে আলোচনার যোগ্য।
এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক ও লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা