প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও গোপন ভোটাধিকার। ভোটার যেন ভয়ভীতিহীন পরিবেশে নিজের পছন্দের প্রার্থী বা প্রতীকে ভোট দিতে পারেন এই নিশ্চয়তাই একটি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে। সশরীরে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই গোপনীয়তা তুলনামূলকভাবে নিশ্চিত থাকে। ব্যালট বাক্সে ভোট পড়ার পর তা কার ভোট সেটি জানার সুযোগ কারও থাকে না। কিন্তু পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে সেই গোপনীয়তা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে বর্তমানে ভোটারদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে এই উদ্বেগ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। পোস্টাল ব্যালটের নিয়ম অনুযায়ী, ভোটারকে ব্যালট পেপার পূরণ করে একটি খামে রাখতে হয় এবং আলাদা একটি হলুদ খামের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে ঘোষণাপত্র পাঠাতে হয়। ওই ঘোষণাপত্রে ভোটারের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর এবং ব্যালট পেপারের ক্রমিক নম্বর উল্লেখ করতে হয়। এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে এসেছে এই তথ্যগুলোর মাধ্যমে কি কোনোভাবে ভোটারের ভোটের গোপনীয়তা ভঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা থাকে না?
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কয়েকজন প্রবাসী ভোটদাতা এই উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেছেন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী ভোটারদের ঠিকানায় ৭ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি ব্যালট পাঠানো হয়েছে এবং এরইমধ্যে দেড় লাখের কিছু বেশি ব্যালট ফেরত এসেছে। অর্থাৎ একটি বড় সংখ্যক ভোটার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু ভোট দেওয়ার পর অনেকের মধ্যেই এখন অস্বস্তি ও দুশ্চিন্তা কাজ করছে যদি কোনোভাবে জানা যায় তিনি কাকে ভোট দিয়েছেন, তাহলে তার বা তার পরিবারের ওপর ভবিষ্যতে কোনো ধরনের চাপ বা ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
ভোটারদের এই আশঙ্কা একেবারে অমূলক বলা যায় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোটের গোপনীয়তা শুধু একটি সাংবিধানিক অধিকার নয়, এটি অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গেও জড়িত। বিশেষ করে প্রবাসী ভোটারদের বড় একটি অংশ কর্মসূত্রে বিদেশে অবস্থান করলেও তাদের পরিবার দেশে বসবাস করে। ফলে ভোটের গোপনীয়তা নিয়ে সামান্য সন্দেহও তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা হলে ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা পাবে। ইসির দাবি অনুযায়ী, পোস্টাল ব্যালটের খাম রিটার্নিং অফিসার ও পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিতে খোলা হবে। ঘোষণাপত্র ও ব্যালট আলাদা করে রাখা হবে এবং গণনার সময় ব্যালট পেপারের সঙ্গে ভোটারের পরিচয় সংযুক্ত থাকবে না। অর্থাৎ প্রক্রিয়াগতভাবে গোপনীয়তা বজায় রাখার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, আইন বা বিধিমালায় থাকা নিশ্চয়তার সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের বিশ্বাসযোগ্যতার একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। ভোটারদের একটি অংশ মনে করছেন, কাগজে-কলমে নিয়ম যতই ভালো হোক না কেন, বাস্তবে সেই নিয়ম কতটা নিরপেক্ষভাবে অনুসরণ করা হবে, তার কোনো শক্ত নিশ্চয়তা তারা পাচ্ছেন না। গোপন ভোট শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয় নয়, এটি ভোটারের মনে আস্থার বিষয়। আর সেই আস্থা তৈরি না হলে ভোটাধিকার প্রয়োগের আগ্রহও কমে যায়।
এই শঙ্কা শুধু প্রবাসী ভোটারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের ভেতরে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা এবং আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিরাও এবার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনে ভোটগ্রহণ ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত থাকবেন মোট ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৩৪২ জন। কিন্তু পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৩৮ জন। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকের বেশি সম্ভাব্য ভোটার এই ব্যবস্থায় নিবন্ধনই করেননি। নিবন্ধন না করার পেছনে অনেকের ভাষ্য একটাই ভোট দিলে পরিচয় প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার ভয়। সরকারি চাকরিজীবীরা আশঙ্কা করছেন, তাদের ভোটের পছন্দ যদি কোনোভাবে প্রকাশ পায়, তাহলে কর্মজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। নির্বাচনি কর্মকর্তারা মনে করছেন, নির্বাচন শেষে কোনো রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হতে পারে। আবার আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ভয় আরও তীব্র। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুধাবন করা প্রয়োজন ভোটারের ভয় বা শঙ্কা থাকাটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য একটি অশনিসংকেত। ভোটাধিকার তখনই অর্থবহ হয়, যখন ভোটার নির্ভয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন। যদি ভোট দিতে গিয়ে একজন নাগরিক মনে করেন, তার ভোট ভবিষ্যতে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে, তাহলে সেই ভোট আর স্বাধীন থাকে না। পোস্টাল ব্যালট একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোটব্যবস্থা এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রবাসী ভোটার, কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে থাকা নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে এটি একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। কিন্তু এই ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করে ভোটারদের আস্থার ওপর। আস্থা ছাড়া কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুধু নিয়ম মেনে ভোট গ্রহণ করা নয়, বরং ভোটারদের মনে থাকা শঙ্কা দূর করা। ইসিকে আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে ঘোষণাপত্র ও ব্যালট পেপারের মধ্যে কোনোভাবেই যোগসূত্র রাখা সম্ভব নয়, তা কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রয়োজনে পোস্টাল ব্যালট গণনার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য স্বাধীন পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যম বা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। এছাড়া ভোটারদের জন্য সহজ ভাষায় নির্দেশিকা, ভিডিও ব্যাখ্যা বা প্রকাশ্য ডেমোনস্ট্রেশন আয়োজন করা যেতে পারে, যাতে তারা নিজের চোখে দেখতে পারেন কীভাবে গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়।
শুধু ‘নিয়ম আছে’ বলা যথেষ্ট নয় নিয়ম কীভাবে প্রয়োগ হবে, সেটিও দৃশ্যমান করতে হবে। সবশেষে বলা যায়, পোস্টাল ব্যালট নিয়ে তৈরি হওয়া এই শঙ্কাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি কোনো একক ভোটারের ব্যক্তিগত ভয় নয়, বরং গণতান্ত্রিক আস্থার প্রশ্ন। নির্বাচন কমিশন যদি সময়মতো এই উদ্বেগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখে এবং ভোটারদের কার্যকরভাবে আশ্বস্ত করতে পারে, তাহলে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
সাদিয়া সুলতানা রিমি
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়