ঢাকা শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মওলানা রুমির মসনবি শরিফ (কিস্তি- ৬/৩৪)

মরণের আগে মরণ বরণ কর

ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
মরণের আগে মরণ বরণ কর

বুখারার শাসকের নাম ছিল সদরে জাহান। তার অন্তর ছিল আকাশের মতো উদার সাগরের মতো বিশাল । গরিব দুঃখী অভাবী মানুষের দান করতেন অকাতরে, অবারিত। সর্বস্তরের সবার সঙ্গে তার ব্যবহার ছিল অমায়িক। প্রতিদিন দানের ঝুলি নিয়ে দিনের বেলা শুরু করতেন আর রাত অবধি বিলাতেন স্বর্ণ। কাগজে পেঁচিয়ে দান করতেন স্বর্ণের টুকরো, একজনেরটা আরেকজন না দেখে মত। তার এই দানশীলতার তুলনা করা যায় চাঁদের জোছনা বিলানোর সঙ্গে। চাঁদ কিরণ পায় সূর্যের কাছ থেকে। প্রাপ্ত সেই কিরণ চাঁদ দুনিয়াবাসীর মধ্যে বিলায় রাতের জোছনারূপে। ঠিক এভাবেই সদরে যাহান অবারিত দয়াদান লাভ করতেন আল্লাহর কাছ থেকে আর তা বিলাতেন অভাবী মানুষের মধ্যে।

হার সবাহি য়্যক গুরুহ রা রাতেবে

তা নমানদ উম্মতি জু খায়েবে

প্রতি সকালে একটি দলকে দিতেন ভাতারূপে

সমাজের কোনো শ্রেণি বঞ্চিত না থাকে যাতে।

অসুস্থ রোগী অসহায় লোকদের ভাতা দিতেন সপ্তাহে একদিন। পরের দিন দিতেন সৈয়দ বংশের অভাবী লোক ও মাদরাসার ছাত্রশিক্ষকদের। একটি দিন বরাদ্দ ছিল সাধারণ গরীব মিসকিনদের জন্য। আরেকদিন ভাতা পেত ঋণগ্রস্ত অভাবী দীনহীন নিঃস্ব।

তবে দানের বেলায় শর্ত ছিল, মুখে কেউ চাইতে পারবে না প্রকাশ্যে। তাহলে বঞ্চিত হবে সে, পাবে না সদরে জাহানের দান। নিয়ম ছিল সাহায্যপ্রার্থৗ রাস্তার পাশে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকবে আর ভিক্ষার পাত্রটা এগিয়ে ধরবে সামনের দিকে। যদি কেউ মুখে উচ্চারণ করত নিজের অভাব বা দানের আবেদন। শাস্তিরূপে পেত না কোনো কপর্দক।

মন সামাতা মিনকুম নাজা বুদ ইয়াসে আশ

খামুশান রা বুদ কিসে ও কাসে আশ

যে নীরব থাকবে নাজাত পাবে- এ ছিল নিয়ম

চুপ যে থাকত ভরে যেত তার ঝুলি ও পাত্র।

হাদিস শরিফে বর্ণিত ‘যে নীরবতা পালন করে সে মুক্তি পেয়ে যায়।’ সেই নিয়মে সদরে জাহান শুধু ঐসব অভাবীকে দান করতেন যারা নীরবতার নিয়ম পালন করতেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন লাইনে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধ নিয়মভঙ্গ করে বলল, আমাকে ভিখ দেন আমি ক্ষুধার্ত। সদরে জাহান তাকে কিছু দিলেন না। কিন্তু বৃদ্ধ নাছোড় বান্দা। তার আচরণ দেখে অবাক অন্যলোকেরা। সদরে জাহান তখন বললেন,

গোফত বস বি শর্ম পিরি আই পেদর

পির গোফত আজ মন তুয়ি বি শর্ম তর

কেমন মুখরা বুড়ো লোক নেই কোনো লাজলজ্জা

বৃদ্ধ বলল, আমার চেয়ে আপনি নির্লজ্জ ভেবে দেখুন তা।

কিন জাহান খুরদি ও খাহি তো জে তাম

কান জাহান বা ইন জাহান গিরি বে জাম

এই জগত খেয়ে আরও খেতে চাও লোভে

এই জগত পরজগত পেতে চাও একসাথে।

এ দুনিয়ার রাজত্ব হাতের মুঠোয় নিয়েছেন। অজস্র ধনসম্পদ আয়ত্ব করেছেন। আর এখন দানদক্ষিণা করে পরজগতও হস্তগত করার ফন্দি এঁটেছেন, তাই নয় কি? (ব্যাপারটা তো এমন, একলোক জনগণের ধনসম্পদ লুট করে সম্পদের পাহাড় গড়েছে, আর এখন হারামের পয়সা থেকে দান-সদকা করে বেহেশতে বাসভবন ক্রয়ের স্বপ্ন দেখছে।)

বৃদ্ধের কথা শুনে সদরে জাহানের হাসি পেল। নিয়ম ভঙ্গ করে তিনি তাকে প্রচুর দান করলেন তাকে। তবে এই বৃদ্ধ ছাড়া যে কেউ কোনো দান চেয়েছে একটি পয়সাও দান করেননি তাকে।

একদিন ছিল ফকিহ বা মাদ্রাসার হুজুরদের দান করার পালা। এক আলেম সদরে জাহানকে মুখে আবদার জানালেন প্রকাশ্যে। বৃদ্ধের মত বড় অঙ্কে দান পাবেন সে আশায় তার আর্জি কান্নার সুরে বিনয়ের সঙ্গে। কিন্তু কিছুই পেলেন না ব্যর্থ হল প্রচেষ্টা করুণভাবে। পরের দিন ফকিহ পায়ে পট্টি বেঁধে পঙ্গু সেজে রাস্তায় বসল সদরে জাহানের দৃষ্টি আকর্ষণের আশায়। যেন অসুস্থ পঙ্গু ভেবে তাকেও কিছু দেন উদারভাবে। কিন্তু সেদিনও তাকে চিনে ফেললেন, কিছুই দিলেন না ভাগে। পরের দিন হুজুর মাথায় মুখে ছালার বস্তায় ঢেকে বসে পড়ল পথের ধারে। কিন্তু সেদিনও কপাল খারাপ কিছু পেল না, চিনে ফেলল তাকে।

হরেক রকম ফন্দি ফিকির ব্যর্থ হলো ফকিহের। পরিশেষে মেয়েদের কাপড় পরে বেশ বদলালেন, তবুও দানের স্বর্ণ পেতে হবে। বিধবা মহিলাদের দলে গিয়ে বসল বোরকায় হাত পা মুখটাও ঢেকে। কিন্তু এবারও সদরে জাহান চিনে ফেললেন, এড়িয়ে গেলেন নীরবে। এমন বঞ্ছনার যাতনায় ফকিহের হৃদয় খানখান বেদনাভারে। তবুও তিনি নাছোড়বান্দা, সদরে জাহানের দান স্বর্ণখণ্ড পেতেই হবে। অবশেষে তিনি সাহায্য চাইলেন একজন দাফনকর্মীর কাছে। মসনবিতে শব্দের মূল কফনখাহ। মানে, যে মানুষের কাছ থেকে কাফন চেয়ে অসহায় মানুষের দাফন কাপনের ব্যবস্থা করে। তাকে বলল, তুমি ভাই একটি বস্তায় আমাকে পেঁচিয়ে লাশের মত ফেলে রাখ রাস্তার ধারে। তোমার আর কিছু করতে হবে না, মুখে কিছু বলতে হবে না। শুধু লক্ষ্য রাখবে সদরে জাহান যেন চলে যান এ পথ দিয়ে। তিনি মনে করবেন যে, একটি মরা লাশ পড়ে আছে দাফন কাফনের জন্য টাকার প্রয়োজন আছে। তখন তিনি নিশ্চয়ই এক দুই টুকরা স্বর্ণ ফেলে যাবেন লাশ দাফনের খরচ হিসেবে।

হারচে বেদহাদ নিমে আন বেদহাম বে তু

হামচুনান কর্দ আন ফকিরে চেল্লে জু

যাই দেন তিনি অর্ধেক তার দেব তোমাকে

দাফনকর্মী গরীব লোকটি করলো তাই তাকে।

একটি চটের বস্তায় পেঁচিয়ে লোভাতুর হুজুরকে ফেলে রাখল রাস্তায়। একটু পরেই সদরে জাহান রাস্তায় এলেন, তার অপেক্ষায় যত গরীব অসহায়। চটের ভেতরে ফকিহের প্রাণ আকুলি-বিকুলি করলেও তার দেহ অনড়, দম ছাড়েন হিসেবে করে। ভাগ্য ভালো, সেপথ দিয়েই গমন করছেন সদরে জাহান। দাফনকর্মীও লক্ষ্য করে, সদরে জাহান একটু থেমেছে লাশের কাছে। তিনি একটি স্বর্ণ খণ্ড ছুড়ে দিলেন বস্তার ওপর। অমনি মরার ভান করে শুয়ে থাকা ফকিহ ডান হাতটি বের করলেন বস্তার ভেতর থেকে। তার ভয় দাফনকর্মী যেন জলদি এসে স্বর্ণখণ্ডটি নিয়ে গোপন না করে। সে যে বিশ্বস্ত কেউ নয়। ফকিহ স্বর্ণখণ্ড হাতে নেওয়ার পর মাথাও বের করলো খোলস ছেড়ে। এবার সদরে জাহানকে বলল,

গোফত বা সদরে জাহান চোন বেসতদম

আই বেবস্তে বর মন আবওয়াবে করম

সদরে জাহানকে বলল, দেখলেন আমার কৌশল কী

দয়ার পথ বন্ধ রাখলেও আদায় করে নিয়েছি ঠিকই।

ফকিহ গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। সদরে জাহানের মুখের ওপর কথা বলার সুযোগ পেয়ে গেলেন। বললেন, আপনি তো অনেক কৌশল করেছিলেন আপনার দয়াদান থেকে আমাকে বঞ্চিত করার জন্য। কিন্তু দেখলেন কী কৌশলে আমি আদায় করে নিলাম। তার যুক্তির জবাবে সদরে জাহান বললেন,

গোফত লেকিন তা নমুরদি আই আনুদ

আজ জনাবে মন নবুর্দি হিচ জুদ

বললেন, যতক্ষণ না মরেছ হে জেদি

আমার দান লাভ করনি ততক্ষণ তুমি।

তুমি যতক্ষণ স্বেচ্ছা মরণ বরণ করনি, ততক্ষণ আমার দান তুমি লাভ করতে পারনি। বস্তুত মানুষ যতক্ষণ ফানার মাকামে আত্মহারা না হবে, ততক্ষণ এই জগতের মহান অধিপতির বিশেষ দানের ভাগী হতে পারবে না। এটিই হলো মরণের আগে মরণ বরণ করার জীবন দর্শন।

সিররে মুতু কবলা মউতিন ইন বুয়াদ

কাজ পাসে মুর্দান গণিমতহা রসদ

মৃত্যুর আগে মৃত্যুবরণ কর- এর রহস্য এটিই

গণিমত আসে আল্লাহর তরফে মৃত্যুর পরেই ।

বর্ণিত আছে ‘তোমরা মরে যাও মরণ আসার আগে।’ এ উক্তির তাৎপর্য ও রহস্য এখানেই নিহিত। এই মৃত্যুর নাম স্বেচ্ছামৃত্যু। নিজের ইচ্ছায় মৃত্যুবরণ করা। এই মৃত্যুর জন্য অহঙ্কার, আমিত্ব বর্জন করে আল্লহর সমীপে সম্পূর্ণ আত্মসমর্র্পণ করতে হবে। এভাবে স্বেচ্ছামরণ ব্যতিরেকে কোনো যোগ্যতা, কৌশল ও কৃতিত্ব আল্লাহর দরবারে কাজে আসবে না। এভাবে মরতে পারলে তুমি তার দয়াদৃষ্টি লাভ করতে পারবে।

মনে রেখ, আল্লাহর একটুখানি দয়াদৃষ্টি তোমার শত চেষ্টার চেয়ে উত্তম। চেষ্টায় সফলতা শতভাগ নিশ্চিত নয়; এমনকি সাধনার পথে নানা ফেতনার ভয় সংশয় থাকে। কাজেই শুধু নিজের চেষ্টা সাধনা ইবাদত-বন্দেগির ওপর ভর করে থেকো না। তাতে আত্মপ্রীতি, অহংকার ও হিংসা জাতীয় নানা উপসর্গ থাকতে পারে। আর যদি আল্লাহর তরফে একবার ডাক আসে, যদি আহ্বান আসে তুমি এসো আমার কাছে, তাহলে আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়া একেবারে সহজ হবে। তখন নফস আম্মারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। নফস যদি বিষধর সাপের মতো হয়, আল্লাহর দয়াদৃষ্টি যমররুদ পাথর হয়ে সেই বিষ পানি করে ফেলবে। এই যে স্বেচ্ছামরণের কথা বললাম, তাও কিন্তু সম্ভব হবে না তার একান্ত দয়াদৃষ্টি ব্যতিরেকে। কাজেই তুমি মনের জমিনকে প্রস্তুত রাখ তার দয়াদৃষ্টি লাভ করার অভিলাষে। (মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, খণ্ড : ৬, বয়েত : ৩৭৯৯-৩৮৪২)

(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে ছায়াপথ প্রকাশনী, মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ১৪৯/এ, এয়ারপোর্ট রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন CHAYAPATH PROKASHONI)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত