প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য বাঁক বদলের মুহূর্ত। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই সময়ে সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। ভোটাররা এখন শুধু গালভরা বুলি নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট ইশতেহার দেখতে চায়। একটি আদর্শ রাজনৈতিক ইশতেহার কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে জনমনে যে গভীর আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার একটি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছি-
গণতন্ত্রের উৎস হলো নির্বাচন, আর নির্বাচনের প্রাণ হলো রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার। দীর্ঘসময় পর বাংলাদেশ একটি এমন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তরুণ প্রজন্মের দ্রোহ এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের দাবি একীভূত হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোটাররা এমন এক ইশতেহার প্রত্যাশা করে, যা শুধু ক্ষমতার পালাবদলের দলিল হবে না, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের একটি নকশা হিসেবে কাজ করবে। ভোটারদের কাঙ্ক্ষিত ইশতেহারে বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার প্রসারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে দাঁড়িয়ে অন্ধবিশ্বাস বা সেকেলে ধ্যান-ধারণা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক যুক্তির প্রতিফলন থাকতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল সেবাকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া এবং পূর্ণাঙ্গ ক্যাশলেস সোসাইটি গঠনের অঙ্গীকার থাকতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্ত পেশার মাধ্যমে তরুণদের বিশ্ববাজারে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ইশতেহারে থাকা আবশ্যক। কারণ, উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারই পারে বাংলাদেশকে একটি স্মার্ট ও আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে।
একটি বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। ইশতেহারে বৃক্ষরোপণ, নদ-নদী রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের উল্লেখ থাকতে হবে। বিশেষ করে আমাদের শহরগুলোতে শব্দদূষণ একটি ভয়াবহ ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে; তাই শব্দদূষণমুক্ত শহর গড়ার অঙ্গীকার ভোটারদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। প্লাস্টিক বর্জন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা করতে ইশতেহারে পরিকল্পনা থাকতে হবে। ইশতেহারে স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বজনীন ও সহজলভ্য করার রূপরেখা থাকতে হবে। প্রতিটি নাগরিক যেন তার দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা পায় এবং ওষুধের মান ও দাম যেন সাধারণের নাগালের মধ্যে থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের অর্থনীতির রক্তক্ষরণ বন্ধে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ভোটারদের প্রধানতম দাবি। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়নে স্পষ্ট রোডম্যাপও ভোটাররা দেখতে চান। এ ছাড়া ইশতেহারে ব্যাংক খাতের লুটপাট বন্ধ, খেলাপি ঋণ আদায় এবং অর্থপাচার রোধে আপসহীন অবস্থানের ঘোষণা থাকতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অর্থের অপচয় রোধ করে ব্যয় সাশ্রয়ী ও টেকসই মডেল করা যেতে পারে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রধান ভিত্তি হলো আইনের শাসন। দল-মতনির্বিশেষে সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ইশতেহারের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দিতে হবে। গণভোটে জনগণের স্বাধীনভাবে হ্যাঁ অথবা না ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে বলে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে। মানুষ চায় এমন এক অঙ্গীকার, যেখানে মানুষ ভয়হীন চিত্তে নিজের মতপ্রকাশ করা যায় এবং প্রার্থী সেখানে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবে। বাকস্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণকারী সকল কালো আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি ভোটাররা চান। ইশতেহারে প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা থাকতে হবে। কারণ, সুশাসন নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না। কোনো প্রকার ‘মব ভায়োলেন্স’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না- এমন সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি জনমনে প্রার্থীর প্রতি বিশ্বস্ততা ও স্বস্তি ফেরাবে। প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেন দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করার অঙ্গীকার করতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের অঙ্গীকার হবে প্রার্থীর পরিচ্ছন্ন ইমেজের মূল চাবিকাঠি।
তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো কর্মসংস্থান। ইশতেহারে বেকারত্ব দূরীকরণে বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং উদ্যোক্তা তৈরির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা থাকতে হবে। অঙ্গীকারে থাকতে হবে যে, কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে দক্ষ জনবল তৈরি করা হবে, যাতে কেউ কেবল সার্টিফিকেটের পেছনে না ছুটে কাজের যোগ্য হয়ে ওঠে। ইশতেহারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ভাঙার কার্যকর কৌশল থাকতে হবে। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠা দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল পর্যায়ে রাখার রাজনৈতিক সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রতিশ্রুতিই ফলপ্রসূ হতে পারে। বাজার মনিটরিং এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে বিশ্বাসযোগ্য পথ নকশা অবহিত করতে হবে।
সমাজের অর্ধেক অংশ নারী, তাই নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয় বরং অধিকার, এই বিষয়টি ইশতেহারে উল্লেখ করতে হবে। ইশতেহারে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ এবং সমান মজুরি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থাকতে হবে। স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা এবং অবহেলিত নারীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী আরও শক্তিশালী করতে ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা যোগ করতে হবে। আধুনিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রে নারীর অবদানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহার সাজানো জরুরি।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। ভোটাররা চান একটি গবেষণাভিত্তিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা সংস্কার। জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বিকাশে ইশতেহারে শিক্ষা নীতি সাজাতে হবে। মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটাতে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। গ্যাং কালচার, ইভটিজিং ও যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও সামাজিক আন্দোলনের ডাক থাকতে হবে ইশতেহারে। তারুণ্যের অমিত শক্তিকে দেশ গড়ার কাজে লাগাতে হলে তাদের জন্য সঠিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা জরুরি, এই বিষয়টি তরুণ সমাজের উদ্দেশ্যে বর্ণনা করতে হবে।
ইশতেহারে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিরাপত্তা, জমিজমার অধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার পূর্ণ নিশ্চয়তা থাকতে হবে। কারন একটি রাষ্ট্রের মহত্ত্ব বোঝা যায় তার সংখ্যালঘু জনগণের অধিকার রক্ষার মাধ্যমে। তাদের ওপর যে কোনো ধরনের সহিংসতা বা বৈষম্য রোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা কমিশন গঠনের অঙ্গীকার করা যেতে পারে। বৈচি?েত্র্যর মধ্যে ঐক্যই বাংলাদেশের সৌন্দর্য; এই চেতনাকে ধারণ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তি বজায় রাখার কার্যকর পরিকল্পনা থাকতে হবে। সবাই যেন এই রাষ্ট্রের সমান অংশীদার হিসেবে গর্ব করতে পারে, সেই পরিবেশ ইশতেহারে নিশ্চিত করা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ, তাই কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করা মানেই দেশের ভিত্তি মজবুত করা। ইশতেহারে কৃষকদের জন্য সার, বীজ ও সেচ সুবিধার সহজলভ্যতা এবং ফসলের লাভজনক দাম নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকতে হবে। প্রান্তিক কৃষকদের ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি দিতে সহজশর্তে কৃষি ঋণ এবং শস্য বিমার ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি জরুরি। বিদেশে কর্মরত প্রবাসীরা আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা। তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ এবং বিদেশে বিপদে পড়লে দূতাবাসের ত্বরিত সহযোগিতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ইশতেহারে থাকা চাই। প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকার থাকতে হবে। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের সম্মান বৃদ্ধি এবং প্রবাসী কর্মীদের দক্ষ শ্রমিক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। পাশাপাশি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের অবহেলিত অংশ- যেমন এতিম, প্রতিবন্ধী, স্বামী পরিত্যক্তা এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য বিশেষ কল্যাণমূলক কর্মসূচি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের মূলধারার অর্থনীতিতে সম্পৃক্ত করতে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে তা নিয়মিত করার অঙ্গীকার থাকতে হবে। শিশু অধিকার রক্ষায় কঠোর আইন এবং শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও বিনোদনকেন্দ্রের ব্যবস্থা অঙ্গীকার থাকতে হবে। কোনো নাগরিক যেন নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করে, সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। হিংসার রাজনীতি বর্জন করে শান্তি ও সৌহার্দ্যরে এক নতুন ধারা প্রবর্তন করতে হবে। ইশতেহারে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এই অঙ্গীকার থাকতে হবে যে, তারা ক্ষমতায় গিয়ে কোনো প্রকার প্রতিহিংসামূলক আচরণ করবে না।
২০২৬ সালের নির্বাচন শুধু একটি ভোট নয়, এটি একটি নতুন ভোরের স্বপ্ন। ভোটাররা এমন একটি ইশতেহার চায় যা কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাস্তব জীবনে তার সুফল বয়ে আনবে। উপরে আলোচিত ক্ষেত্রগুলো যদি কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় এবং তা বাস্তবায়নের সৎ সাহস তারা দেখাতে পারে, তবেই বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যবদল সম্ভব। তরুণদের দ্রোহ, বড়দের অভিজ্ঞতা এবং শিশুদের স্বপ্নের সমন্বয়ে এমন এক রাষ্ট্র আমরা চাই, যেখানে প্রতিটি মানুষ মর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে। পরিশেষে, একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রত্যাশায় একটি স্মার্ট ও বিশ্বাসযোগ্য ইশতেহারকে সামনে রেখে ভোটাররা ১২ ফেব্রুয়ারি তাদের রায় প্রদান করবে।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী, সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল