ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

জ্বালানি তেলের পর এলপিজির দাম বৃদ্ধি, বাড়বে সংসার খরচ

জ্বালানি তেলের পর এলপিজির দাম বৃদ্ধি, বাড়বে সংসার খরচ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর রেশ কাটতে না কাটতেই এবার বাড়ানো হলো তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। এতে একদিকে পরিবহন ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজির দাম বৃদ্ধিতে সরাসরি চাপ পড়বে সাধারণ ভোক্তার সংসারে। নতুন করে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গতকাল রোববার এ দাম ঘোষণা করা হয়। নতুন দর গতকাল সন্ধ্যা থেকে কার্যকর হবে।

এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল বিইআরসি। ফলে মাত্র ১ মাসের ব্যবধানে রান্নার কাজে বহুল ব্যবহৃত এই জ্বালানির নির্ধারিত দাম এক লাফে ২৫২ টাকা বেড়ে গেল। যদিও বাস্তবে গত কয়েক মাস ধরে বিইআরসি নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করে আসছেন ভোক্তারা। কোথাও কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ' টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে তাদের।

বিইআরসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারদরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অক্টোবর মাসের জন্য এলপিজির নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌদি আরামকোর প্রোপেন ও বিউটেনের সৌদি চুক্তিমূল্য (সিপি) অনুযায়ী এ দাম হিসাব করা হয়েছে। অক্টোবর মাসের জন্য প্রোপেনের সিপি প্রতি টন ৬৮০ ডলার এবং বিউটেনের ৭৩০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে গড় সৌদি সিপি দাঁড়িয়েছে প্রতি টন ৭১২ দশমিক ৫০ ডলার।

নতুন মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কমিশন শিপিং ও ট্রেডার প্রিমিয়াম বাবদ প্রতি টনে ২৫০ ডলার এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে গড় বিনিময় হার ১২৩ দশমিক ১৮ টাকা বিবেচনায় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির কাঁচামালের দাম এবং আমদানি-সংশ্লিষ্ট ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবই মূলত নতুন দামে প্রতিফলিত হয়েছে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও অন্যান্য ক্যাটাগরির এলপিজির দামও সমন্বয় করা হয়েছে। অক্টোবরের জন্য অটোগ্যাসের ভোক্তা পর্যায়ের দাম প্রতি লিটার ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। রেটিকুলেটেড পদ্ধতিতে তরল আকারে সরবরাহ করা এলপিজির দাম ভ্যাটসহ প্রতি কেজি ১৪৯ টাকা ৩১ পয়সা করা হয়েছে। একই পদ্ধতিতে সরবরাহ করা গ্যাসের প্রতি ঘনমিটারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩১ টাকা ৯০ পয়সা।

তবে সরকারি মালিকানাধীন এলপিজির ১২ দশমিক ৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে এ সিলিন্ডারের দাম ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সাই রাখা হয়েছে।

নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি : এলপিজির নতুন দাম ঘোষণার সময় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে বাজারে এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে। কারণ বিইআরসি প্রতি মাসে দাম নির্ধারণ করলেও সেই দামে ভোক্তারা এলপিজি কিনতে পারছেন কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। সরবরাহ সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি খরচের কথা বলে অনেক বিক্রেতা নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে বিইআরসি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে ভোক্তাদের ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০৮ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত দামের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। নতুন করে ২৫২ টাকা দাম বাড়ানোর পর বাজারে এই অতিরিক্ত মূল্যের প্রবণতা আরও বাড়বে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়ন্ত্রিত মূল্য এবং খুচরা বাজারের দামের মধ্যে যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে, সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির পরও তা দ্রুত দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম। বিশেষ করে দেশের কোনো কোনো এলাকায় সরবরাহ ঘাটতি অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

'দেশে এলপিজির সংকট নেই' : তবে দেশে এলপিজির সরবরাহ ঘাটতির অভিযোগ মানতে নারাজ খাতটির ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। সংগঠনটির দাবি, দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ এলপিজি আমদানি হচ্ছে। লোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছিল। সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন। অর্থাৎ দেশের চাহিদা মেটাতে আমদানি পর্যাপ্ত রয়েছে বলে দাবি সংগঠনটির।

শুধু সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার দাবি করেই ক্ষান্ত হয়নি লোয়াব। তাদের সদস্যভুক্ত কোম্পানি, পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিইআরসি নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংগঠনের এই নির্দেশের পরও বাজারে কেন নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ : এলপিজির সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার দাবি এবং বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রির অভিযোগের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সরকারের নজরদারিও বেড়েছে। ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম আদায়ের উদ্দেশ্যে দেশের কোনো কোনো এলাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করতে সম্প্রতি জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কেন কোনো কোনো এলাকায় ঘাটতির খবর আসছে এবং বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ভোক্তাদের কাছ থেকে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে কি না—সে বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে ডিসিদের। কৃত্রিম সংকট তৈরি কিংবা অতিরিক্ত দাম নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। জ্বালানি ব্যয়ের সঙ্গে বাড়বে সংসারের চাপ

এলপিজির দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু রান্নার জ্বালানির খরচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার রান্নার কাজে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করে। ফলে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারে ২৫২ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হলে মাসিক পারিবারিক বাজেটে সরাসরি চাপ পড়বে। এর সঙ্গে কয়েক দিন আগে সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। ফলে পরিবহন খরচসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব এরইমধ্যে নিত্যপণ্যের বাজারে পড়তে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে রান্নার জ্বালানি এলপিজির দামও বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এ মূল্যবৃদ্ধি বাড়তি চাপ তৈরি করবে। কারণ নিত্যপণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচের সঙ্গে এখন রান্নার জ্বালানির খরচও বাড়ছে। ফলে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক বাজেট সামলানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, এলপিজি ব্যবহারকারী পরিবহন খাতেও অটোগ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে পারে। অটোগ্যাসের দাম বাড়লে পরিবহন পরিচালনার ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব পরবর্তী সময়ে ভাড়া ও পণ্য পরিবহন খরচে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি পরোক্ষভাবেও সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের পর এলপিজির দাম বৃদ্ধির ফলে জ্বালানি ব্যয়ের ক্ষেত্রে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সমন্বয়ের যুক্তিতে বিইআরসি দাম বাড়ালেও ভোক্তাদের বড় উদ্বেগ এখন নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া নিয়ে। দেশে পর্যাপ্ত সরবরাহের দাবি সত্য হলে বাজারে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার সুযোগ কীভাবে তৈরি হচ্ছে— তার সুরাহা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে নতুন মূল্যবৃদ্ধির পুরো চাপই শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়ে পড়বে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত