
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১১৬টি অধ্যাদেশ জারি ও ১৪টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এ তথ্য তুলে ধরা হয় বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
তিনি জানান, আজকে (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার পরে যেসব কাজ হয়েছে, যেগুলো আইন হয়েছে, অর্ডিনান্স হয়েছে এবং এর সঙ্গে যেগুলো পলিসি হয়েছে বা অন্যান্য ইন্স্ট্রুমেন্ট যেগুলো সাইন হয়েছে— সেটার একটা প্রেজেন্টেশন দেওয়া হয়। সেখানে আমরা দেখছি যে, অধ্যাদেশ জারি হয়েছে ১১৬ টি। প্রেস সচিব জানান, এ সময়ের মধ্যে ৬৮টি রেগুলার সাপ্তাহিক কেবিনেট বৈঠক হয়েছে। এই কেবিনেট বৈঠকগুলোতে ৫২৬টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ৫২৬টি সিদ্ধান্তের মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে ৪৩৯টি। মানে এটার ইমপ্লিমেন্টেশনের হার ৮৩ শতাংশ। এটা আপনার আগের সরকারগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন, এটা একটা রেকর্ড পরিমাণ অধ্যাদেশ জারি হয়েছে এবং এগুলো এমন না যে, আমি এই ছোটখাটো একটা মাইনর চেঞ্জ করে অধ্যাদেশ, যেগুলো অধ্যাদেশ জারি হয়েছে— প্রত্যেকটা ১১৬টির পুরোটা আমরা আপনাদের লিস্ট দেবো। দেখবেন যে, কত কিছু অধ্যাদেশ আছে, যেটা বাংলাদেশের মানুষের জীবনে যুগান্তকারী ইমপ্যাক্ট আনবে। অধ্যাদেশ প্রক্রিয়াধীন আছে আরও ১৬টি— এর মধ্যে নীতিগতভাবে আরও অধ্যাদেশ জারি হয়েছে মানে অনুমোদন হয়েছে তিনটি। আর নীতিমালা হয়েছে ১৪টি, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়েছে ১৪টি। আর উপদেষ্টা পরিষদের জন্য সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়েছে মোট ৩৪৮টি।
সময় শেষ হয়ে আসলে সম্পদের হিসাব দেখতে পাবেন: উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, আমরা আশা করছি, এটা অচিরেই আপনারা দেখতে পাবেন। তিনি বলেন, যখন আমাদের সময় শেষ হয়ে আসবে, তখন আপনারা দেখতে পাবেন। আমরা আশা করছি, দেখবেন সামনে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এসব কথা বলেন।
প্রেস সচিব বলেন, জাতীয় পুরস্কারগুলো যোগ্যরা পাচ্ছেন। বাংলাদেশের কালচারটা তো কুক্ষিগত ছিল দুই-তিনটা লোকের হাতে। আমরা বলবো যে, বড় রকমের একটা চেঞ্জ এসেছে।
নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব হবে কিনা, জানতে চাইলে উপ প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, আমরা গতকালকে (বুধবার) পরিষ্কার করেছি, নির্বাচনের পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে যত দ্রুত সম্ভব সরকার দায়িত্ব হস্তান্তর করবে। একটা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে— সরকার ১৮০ কার্যদিবস তার ক্ষমতা ধরে রাখবে। যারা এই অপপ্রচারটা চালাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্যটা হচ্ছে— অসৎ এবং উদ্দেশ্যমূলক। তারা এটা নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। আমরা মনে করি, এ বিভ্রান্তি করার কোনও সুযোগ নেই। সরকার প্রথম থেকেই জনগণকে নিশ্চিত করেছে, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর যারাই নির্বাচিত হবেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন, তাদের কাছেই ক্ষমতা হস্তান্তর করবে অন্তর্বর্তী সরকার।
প্রেস সচিব বলেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত পরবর্তী সরকারে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কোনও ভূমিকা থাকবে না। নির্বাচনের পরপরই নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণের পর তাদের প্রতিনিধির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে। প্রক্রিয়াটি যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করা হবে।
তিনি বলেন, সবচেয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর (হ্যান্ডওভার) হবে। এমপিরা শপথ নেওয়ার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি তিন দিনের মধ্যেই সম্পন্ন হতে পারে। অর্থাৎ ১৫ বা ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই তা হতে পারে। আমার মনে হয় না- এটি ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারির বেশি সময় নেবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য কিসে, জানালেন প্রেস সচিব : প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়ন মানুষই করবে। বাংলাদেশের মানুষ দেখবে, এই ১৮ মাস কীভাবে ইন্টেরিম সরকার দেশের সেবা করেছে। আমরা মনে করি, এই সরকার তার ঐতিহাসিক ডিউটি পালন করেছে এবং রেকর্ড পরিমাণ অধ্যাদেশ জারি করেছে। প্রেস সচিব বলেন, ভঙ্গুর একটা অর্থনৈতিককে তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) ইনহেরিট করেছিল, সেটাকে আবার প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে এনেছে। দেশের জন্য ফরেন পলিসিতে একটা বোল্ড দিতে পেরেছে। দেশে পিস অ্যান্ড স্টেবিলিটি এনসিওর করেছে। আপনারা যদি ক্রাইমের ফিগারগুলো দেখেন, এখানে স্পষ্ট গত বছর বা তার আগের বছরের থেকে ক্রাইম যে খুব বেশি বেড়েছে তা না। আমরা এখানে খুবই ট্রান্সপারেন্সি মেইনটেন করি।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। এই সেক্টরে বড় রকমের ডাকাতি হয়েছিল। আপনার যদি পাকিস্তান বা অন্যান্য দেশে দেখেন,
ডলারের দাম হঠাৎ করে কমে যায় আবার বেড়ে যায়। আমাদের এই পুরো ১৮ মাসে ডলারের রেটটা খুবই স্টেবল ছিল। রেমিট্যান্স বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ, দ্রব্যমূল্য দাম মনে করেন জাস্ট একটা বন্যার, খাদ্যমূল্যকে সাত শতাংশে নিয়ে আসা হয়েছে। শফিকুল আলম বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করা গিয়েছে। আমাদের ম্যান্ডেট ছিল বিচার করা। জুলাই-আগস্টে যারা ভয়ানক রকমের হত্যাযজ্ঞ করলেন তাদের বিচারটা শুরু করা গেছে। বাংলাদেশের থেকে গুম উঠে গেছে। বন্ধ হয়েছে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং। নাটক করে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং করা হতো, এখন একটাও হচ্ছে না। এই কাজগুলো যারা করেছেন তাদেরকে একাউন্টেবল করা হচ্ছে, তাদেরকে বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে। সবচাইতে বড় একটা দায়িত্ব ছিল, ইলেকশনের জন্য দেশকে প্রিপেয়ার করা এবং সবাইকে একটা ভালো রিফর্মের জায়গায় নিয়ে যাওয়া। সেটার জন্য জুলাই চার্টার আছে এবং জুলাই চার্টার এখন রেফারেন্ডমে (গণভোটে) আসছে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের জনগণ ১২ ফেব্রুয়ারি তার রায় জানাবে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত পরবর্তী সরকারে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কোনও ভূমিকা থাকবে না জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর তাদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে। প্রক্রিয়াটি যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করা হবে। এমপিরা শপথ নেওয়ার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি তিন দিনের মধ্যেই সম্পন্ন হতে পারে। আমার মনে হয় না, এটি ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারির বেশি সময় নেবে।
এলপি গ্যাসের আগাম কর ও ভ্যাটে অব্যাহতি : সংবাদ সম্মেলনে প্রেস সচিব আরও জানান, সাধারণ মানুষের স্বস্তি দিতে এলপি গ্যাসের ওপর কর কমানোর বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এলপি গ্যাসের স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে আরোপিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ২ শতাংশ আগাম কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আমদানিকৃত এলপি গ্যাসের ক্ষেত্রেও ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। শফিকুল আলম জানান, এই কর ছাড়ের ফলে এলপি গ্যাসের ওপর করের বোঝা কিছুটা হলেও লাঘব হবে। এর ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি স্থানীয় বাজারে পড়বে এবং সাধারণ ভোক্তারা আগের চেয়ে কম দামে এলপি গ্যাস কিনতে পারবেন।