
শেরপুরের নকলা উপজেলায় পতিত জমিতে ও বাড়ির আঙিনায় ভোজ্য ও ঔষধি তেলবীজ ফসল সূর্যমুখী চাষের অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আর এই সম্ভাবনার কথা বলছে কৃষি বিভাগ। সূর্যমুখীতে শতাংশে আয় হচ্ছে ২ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে। নাম মাত্র শ্রমে ও স্বল্প ব্যয়ে বাড়তি আয়সহ সূর্যমুখীর দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য সবার নজর কেড়েছে। সূর্যমুখীর প্রতিটি ক্ষেতে প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সের দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
নকলার মাটি ও আবহাওয়া সূর্যমুখী চাষের উপযোগী। স্বল্প সময়, অল্প ব্যয়ে ও নামমাত্র শ্রমে সূর্যমুখী চাষ করে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই কৃষি বিভাগ সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সূর্যমুখী আবাদ করেছেন।
এ বছর উপজেলার ৬টি ব্লকে বাংলাদেশ চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প (১ম সংশোধিত) এর আওতায় ৭টি কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সূর্যমুখীর চাষ পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা ব্যক্ত করছে কৃষি বিভাগ। যদিও নকলায় পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু হয়েছিল ২০১৬ কি ২০১৫ সাল থেকে। চলতি রবি মৌসুমে উপজেলার লয়খা ব্লকে ২টি প্রদর্শনী এবং চন্দ্রকোনা, চরমধুয়া, বাছুর আলগা, কাজাইকাটা ও চরভাবনা ব্লকে ৩৩ শতাংশ করে জমিতে একটি করে কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিসের বাস্তবায়নে নকলায় ২ হেক্টর জমিতে ৮-১০ জন কৃষক-কৃষানি সূর্যমুখী চাষ করেছেন। তারা নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে এল.টি সানফ্লাওয়ার-১ জাতের সূর্যমুখী রোপণ করেছেন। প্রতিটি ক্ষেতে সূর্যমুখী ফুল ফুটেছে। কিছু কিছু ক্ষেতে সূর্যমুখীর ৫০%-৭০% বীজ হয়ে গেছে।
লয়খা ব্লকের লয়খা গ্রামের কৃষক ফখরুল হাসান জানান, তার বাড়ির আঙ্গিনার ৩৩ শতাংশ জমিতে সূর্যমুখী আবাদ করেছেন। বীজের ধরন দেখে তিনি আশা করছেন এ বছর ফলন ভালো হবে।
তিনি জানান, জমি তৈরি করা থেকে এ পর্যন্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (এসএএও) মো. মিন্টু খানসহ কৃষি অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তাগণ তাকে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন। তার জমিতে প্রথমে আমন ধান চাষ করা হয়েছিল। এখন সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে। এরপরে রোপা আমন বা পাট রোপণ করা হবে। মধ্যবর্তী ও অপ্রধান এ তেলবীজ ফসল চাষে অন্যরা আগ্রহী হলেও, ব্যাপকহারে বাজারজাতের সুযোগ না থাকায় কৃষকরা চিন্তিত। তাই কৃষকদের মধ্যে সূর্যমুখী আবাদে পিছুটান রয়েছে।
একই ব্লকের অন্য এক কৃষক সারোয়ার জাহান জানান, কৃষি বিভাগের সার্বিক তত্ত্বাবধানে চাষ করা সূর্যমুখীর বাম্পার ফলন হবে।
তিনি জানান, এরই মধ্যে শেরপুরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান, অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ তাবাসসুম মকবুলা দিশা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ ফারিহা ইয়াসমিন ও কৃষিবিদ সাগর চন্দ্র দে মাঠ পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ সেবা প্রদান করেছেন। তাদের সূর্যমুখী ক্ষেতের ফুলের সৌন্দর্য দেখতে এসে অনেক দর্শনার্থী এই ফসল চাষের পদ্ধতিও শিখছেন বলে জানান তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাগর চন্দ্র দে জানান, উপজেলার ৬টি ব্লকের পতিত জমিতে বাংলাদেশ চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প (১ম সংশোধিত) এর আওতায় ৭টি কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। এতে কৃষকরা লাভবান হওয়ায় অন্যান্য কৃষকরা আগ্রহী হয়েছেন। এ ফসল চাষ করে অনেকে স্বাবলম্বী হয়েছেন, ফলে সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান। আগামীতে উপজেলায় সূর্যমুখী আবাদের পরিমাণ ও কৃষকের সংখ্যা বাড়বে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন। ফলন দেখে অন্যান্য কৃষকরা তাদের পতিত জমিতে তেলবীজ ফসল হিসেবে সূর্যমুখী চাষের দিকে ঝুঁকছেন। সেইসাথে উপজেলার বিভিন্ন বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ও পতিত জমিতেও সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে।
পুষ্টি বিজ্ঞানের মতে, ভোজ্যতেলের মধ্যে সূর্যমুখীর তেল মানব শরীরের জন্য খুব উপকারী। সূর্যমুখী তেলে থাকা ম্যাগনেসিয়াম মানুষের মানসিক চাপ দূর করে এবং লিনোলিক এসিড মানব হার্ট ভালো রাখে। সূর্যমুখীর তেল অন্যান্য তেলের চেয়ে বেশ আলাদা। কোলেস্টেরলমুক্ত সূর্যমুখীর তেলে প্রচুর পরিমাণ প্রাণশক্তি থাকায় এটি মানব শরীরের দুর্বলতা কমিয়ে কর্মক্ষমতা বাড়ায়। রান্নার জন্য সয়াবিন বা সরিষা তেলের চেয়ে সূর্যমুখী তেল প্রায় ১০ গুণ বেশি পুষ্টিসমৃদ্ধ। শরীর সুস্থ রাখতে ও হাড় মজবুত করতে সূর্যমুখী তেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে স্থানীয় পুষ্টিবিদরা জানান। এই তেলের উৎপাদন বাড়লে একদিকে মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত ও অতিউপকারী তেল পাবেন, অন্যদিকে লাভবান হবেন চাষিরা। এটি মানবদেহের জন্য অনেকটাই মহৌষধ হিসেবে ভূমিকা পালন করে বলে মন্তব্য করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান জানান, চলতি মৌসুমে কৃষি বিভাগের সহায়তায় নকলা উপজেলায় ২ হেক্টর জমিতে কৃষকরা সূর্যমুখীর চাষ করেছেন। ৩ মাস মেয়াদি এই ফসলে লাভ বেশি পেলেও, স্থানীয় ভাবে বাজারজাত করার সুযোগ না পাওয়ায় কৃষকদের মাধ্যমে এই আবাদ বাড়াতে বেগ পেতে হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি জানান, ব্যাপকহারে বাজারজাতের ব্যবস্থা করলে কৃষকরা অধিক আগ্রহী হবেন। নভেম্বর মাসের প্রথমার্ধে সারিবদ্ধভাবে সূর্যমুখীর বীজ বপন করা হয়। বীজ বপনের ৯০ দিন থেকে ১০০ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করা যায়। সামান্য রাসায়নিক সার ও ২-৩ বার প্রয়োজনীয় সেচ দেওয়া ছাড়া বাড়তি যত্ন নিতে হয় না। সূর্যমুখী গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায় এবং এই তেল মানব দেহের জন্য বেশ উপকারী। এই তেলবীজ আবাদে ব্যয়ের তুলনায় কৃষকরা কয়েকগুণ লাভ পেয়ে থাকেন। পতিত জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে যেকেউ স্বাবলম্বী হতে পারেন বলে মন্তব্য করেন কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান।