
উত্তরে ঘন কুয়াশায় রোপা আমন ধানের কাটা-মাড়াই শেষ করে এখন পুরোদমে চলছে বোরো আবাদের প্রস্তুতি। এরই মধ্যে বীজতলাও তৈরি করা হয়েছে। তবে কয়েক দিনের ঘন কুয়াশা আর হাড়কাঁপানো শীতে কচি চারা বিবর্ণ হয়ে গেছে। ফলন দ্বিপর্যয়ের শঙ্কায় রয়েছেন এই অঞ্চলের চাষিরা। রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলা নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় পাঁচ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো আবাদ করা হবে। বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৩ হাজার ১৭৫ হেক্টর।
রংপুরে বিভাগে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকছে ফসলের মাঠ। এতে রবি ফসল আলু এবং বোরো ধানের বীজতলা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সরিষা, অংজু গম ও তামাক উত্তোলনের পর একই জমিতে বোরো চাষের জন্য কৃষকরা বীজতলা তৈরি করেছেন। কিন্তু আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় অনেক জায়গাতেই চারা হলদে বর্ণ ধারণ করেছে।
কৃষকরা চারা রক্ষায় তারা বিভিন্ন আধুনিক ও স্থানীয় কৌশল অবলম্বন করছেন। শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশা থেকে বাঁচাতে চারা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হচ্ছে। রাতের বেলা বীজতলা পানিতে ডুবিয়ে রাখা হচ্ছে এবং সকালে পানি বের করে দেওয়া হচ্ছে। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে চারার ওপর জমে থাকা শিশির ঝরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। চারা পচা রোধে কৃষি বিভাগের পরামর্শে ছত্রাকনাশক স্প্রে করা হচ্ছে।
কাউনিয়া উপজেলার মীরবাগ এলাকার কৃষক আব্দুল গফুর বলেন, ‘শীতোত নিজের কষ্ট হয় হউক, ধানের বেছন (চারা) তো বাঁচা নাগবে। বোরোর আবাদ না হইলে তো হামাক না খ্যায়া মরা নাগবে।’ একই চিত্র নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ ও রংপুরের পীরগাছাতেও। কিশোরগঞ্জের গাড়াগ্রামের কৃষক আবু নছর জানান, ৬০ কেজি ধানের বীজতলা করেছেন।
কুয়াশার কারণে সদ্য গজানো চারাগুলো হলদে বর্ণ ধারণ করেছে। পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখছেন। তিনি বলেন, বীজতলা নষ্ট হলে নতুন করে চারা তৈরির সময় আর থাকবে না, আবার চারা কিনে আবাদ করাও ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। পীরগাছা উপজেলার তালুক উপাসু গ্রামের সহিদুল ইসলাম এক একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করবেন। এর জন্য চার কেজি ধানের বীজতলা তৈরি করেছেন। চারার বয়স ১৫ দিন পার হয়েছে। ঘন কুয়াশায় ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলা নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় পাঁচ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো আবাদ করা হবে। বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৩ হাজার ১৭৫ হেক্টর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, রোদ উঠলে এই সমস্যা কেটে যাবে এবং চারার সজীবতা ফিরে আসবে। বড় কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই যদি কৃষকরা আমাদের পরামর্শ মেনে চলেন। এজন্য কৃষি অফিস থেকে আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি নিয়মিত। সেই সঙ্গে মাঠে মাঠে গিয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখছেন আমাদের কৃষি কর্মকর্তা। কৃষকরাও আমাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করছেন। যার কারণে বীজতলা নষ্টের আশঙ্কা নেই।
বিনার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডক্টর রফিকুল ইসলাম জানান- রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় বিনা ধান ২৪ জাতের ৬ হাজার কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। ভালো ফলন হলে প্রতি হেক্টরে ৮৫০ টন উৎপাদন হবে। তিনি বলেন, বিনা ধান-২৫ ফলন ভালো হলে ৭.৫০ হেক্টর জমিতে ফলন হবে।
তিনি কৃষককে ক্ষতির আশঙ্কা থেকে রক্ষ পেলে হলে যন্ত্র নেওয়ার জন্য আহ্বান জানান। এ সময় বীজতলা ভালো রাখার পরামর্শে তিনি বলেন, বীজতলা নষ্ট হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে তীব্র শীত। এজন্য রাতের বেলায় বীজতলায় পানি রাখতে হবে এবং দিনের বেলায় পানিটা সরিয়ে ফেলতে হবে। তাহলে এটি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এসব বোরো ধানের বীজতলা রক্ষার জন্য ইউরিয়া ও জিপসাম সার প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিদিন বীজতলার কুয়াশা ঝেড়ে দিতে হবে।
সম্ভব হলে চারাগুলোকে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। এসব পরামর্শ মানলে বীজতলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না বলে জানান তিনি।