
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজ সবজি খেত। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোল ঘেঁষে অবস্থিত এই জনপদটি এখন সারা দেশের মানুষের কাছে সবজির এক বিশাল ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। চান্দিনার মাটি যেন এক জাদুকরী উর্বরতার আধার, যেখানে বীজ বপন করলেই সোনার ফসল ফলে।
এই অঞ্চলের সবজি চাষের গল্পটি শুধু ফসলের নয়, বরং এটি হাজার হাজার কৃষকের ভাগ্য বদলের এবং গ্রামীণ অর্থনীতির এক নীরব বিপ্লবের গল্প। একসময় এই অঞ্চলের কৃষকরা শুধু ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও, বর্তমানে তারা সবজি চাষকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এনেছেন।
চান্দিনার প্রতিটি গ্রাম এখন সবুজে ঢাকা; যেখানে শীত কিংবা গ্রীষ্ম, সব ঋতুতেই নানা জাতের সবজির সমারোহ থাকে। ভোর হওয়ার আগেই চান্দিনার মাঠগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়ে যায়। কৃষকরা পরম মমতায় খেত থেকে টাটকা সবজি সংগ্রহ করেন। কেউ লাউ কাটছেন, কেউবা নিড়ানি দিচ্ছেন ফুলকপির চারাগাছে।
এই অঞ্চলের উৎপাদিত লাউ, করলা, ঝিঙে, পটল, ফুলকপি আর বাঁধাকপি এখন শুধু কুমিল্লার চাহিদা মেটাচ্ছে না, বরং তা রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মানুষের রসুইঘরে জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত নিমসার বাজার এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ সবজির পাইকারি বাজারে পরিণত হয়েছে, যার বড় একটি জোগান আসে এই চান্দিনা থেকে। মহাসড়কের সুবিধা থাকায় দ্রুততম সময়ে পচনশীল এই সবজিগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে, যা এই অঞ্চলের কৃষকদের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চান্দিনার সবজি চাষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এখানকার কৃষকদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং পরিশ্রম। তারা এখন আর প্রথাগত চাষাবাদে সীমাবদ্ধ নেই। কৃষি অফিসের পরামর্শে তারা আধুনিক প্রযুক্তি, যেমন, মালচিং পদ্ধতি, ফেরোমোন ট্র্যাপ এবং জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে যেমন ক্ষতিকর রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমছে, অন্যদিকে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি উৎপাদন নিশ্চিত হচ্ছে। এখানকার কৃষকরা এখন বারোমাসি টমেটো এবং অফ-সিজন সবজি চাষে বেশ পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। আগে যে জমিগুলো বছরের একটি বড় সময় পড়ে থাকত, সেখানে এখন পর্যায়ক্রমে তিনটি থেকে চারটি ফসল ফলানো হচ্ছে। এই নিবিড় চাষাবাদের ফলেই চান্দিনার অর্থনীতি আজ এতোটা চাঙ্গা হয়েছে। গ্রামের সাধারণ কৃষকের বাড়িগুলোর দিকে তাকালে এখন আর দৈন্যদশা দেখা যায় না; বরং সবজি চাষের টাকায় নির্মিত পাকা ঘর আর সচ্ছল পরিবারই বেশি নজরে পড়ে।
তবে এই বিশাল সাফল্যের মধ্যেও চান্দিনার কৃষকদের কিছু আক্ষেপ রয়ে গেছে। সবজি একটি দ্রুত পচনশীল পণ্য হওয়ার কারণে মাঝেমধ্যেই তারা লোকসানের মুখে পড়েন। বিশেষ করে ফলন যখন খুব বেশি হয়, তখন যথাযথ সংরক্ষণাগার বা কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় অনেক সবজি মাঠেই নষ্ট হয়ে যায় অথবা পানির দরে বিক্রি করতে হয়। স্থানীয় চাষিদের দীর্ঘদিনের দাবি, যদি চান্দিনা বা এর আশপাশে একটি বিশেষায়িত সবজি সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা যেত, তবে তারা আরও লাভবান হতে পারতেন।
এছাড়া সরাসরি মাঠ থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত একটি শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত থেকে কৃষকরা রক্ষা পেতেন। অনেক সময় দেখা যায়, কৃষক যে লাউ দশ টাকায় বিক্রি করছেন, তা শহরের বাজারে গিয়ে ষাট টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই বিশাল মুনাফার বৈষম্য দূর করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেত।
চান্দিনার এই সমৃদ্ধি শুধু একক কোনো কৃষকের নয়, এটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। তরুণ সমাজ এখন বিদেশের মোহ ছেড়ে বা চাকরির পেছনে না ছুটে পৈত্রিক জমিতে আধুনিক সবজি চাষে নামছে, যা বেকারত্ব দূরীকরণে বড় ভূমিকা রাখছে। এখানকার নারীরাও বাড়ির কাজ সেরে মাঠের কাজে কিংবা সবজি বাছাইয়ের কাজে সহযোগিতা করছেন, যা নারী ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চান্দিনার সবজি চাষের এই মডেলটি যদি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায় এবং সরকারি উদ্যোগে সঠিক বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়, তবে বাংলাদেশের কৃষি খাতে এক অনন্য বিপ্লব ঘটে যাবে। সবুজে ঘেরা এই জনপদটি এখন আর শুধু একটি উপজেলা নয়, এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ কৃষির এক উজ্জ্বল স্মারক।