ঢাকা শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ২০ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে আতঙ্ক

সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তদের সংখ্যা বেড়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু। তবে বিভিন্ন রোগীরাও রয়েছেন- আলোকিত ডেস্ক
হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে আতঙ্ক

ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম রোগের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ২৬ শিশুভর্তি হয়েছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এতথ্য নিশ্চিত করেছেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. মাইনউদ্দিন খান জানান, নতুন ভর্তি হওয়া ২৬ শিশুর মধ্যে এরইমধ্যে ১০ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৭৯ শিশু। গত ১৭ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম রোগের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৭২ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯৪ শিশু। ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জেলার সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ফয়সল আহমেদ বলেন, জনসংখ্যার তুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা এখনও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই ৯ মাসের নিচে বয়সী, যাদের এখনও হাম প্রতিরোধী টিকা নেওয়ার সময় হয়নি। তিনি আরও জানান, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ শিশু এক ডোজ এবং বাকি ১০ শতাংশ দুই ডোজ টিকা গ্রহণ করেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। তাই শিশুদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা প্রদান, আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

নোয়াখালী : জলায় হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গেল দুই সপ্তাহে জেলায় শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জায়গার অভাবে হাসপাতালের পুরাতন ভবনে ডায়রিয়া ওয়ার্ডের একটি কক্ষে ‘হামের’ চিকিৎসা চলছে। তবে, সেখানেও গাদাগাদি করে চলছে চিকিৎসা। একটি বেডে দুই-তিন শিশুকেও রাখা হয়েছে। কাউকে আবার মেঝেতেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শিশু এবং ডায়রিয়া ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসাদের হামণ্ডউপসর্গ দেখা দেওয়ার পর এখানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সীমিত জনবল ও ওয়ার্ড সংকটের মধ্যে চিকিৎসায় হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক, নার্সরা। হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহমুদে কায়নাত। তিনি বলেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া জরুরি। কিন্তু আমাদের নতুন ভবন হস্তান্তর না করায় এবং পুরাতন ভবনে জায়গার অভাবে ডায়রিয়া ওয়ার্ডের একপাশে হামের উপসর্গের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে, কাল থেকে আলাদা ওয়ার্ডে রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিশুর হামের লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা বা আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী জানান, তিন মাসে হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা ৪৩ শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত হাসপাতালে এরকম শিশু আছে ৪৩ জন। প্রতিদিন এ ধরনের রোগী বাড়ছে বলে জানান হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, হামের পাশাপাশি যেসব শিশু ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত তাদের সময়মত চিকিৎসা দিতে না পারলে মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে। এ হাসপাতালে এ পর্যন্ত তেমনটা না ঘটলেও সামনে সংক্রমণ ঠেকাতে নতুন ওয়ার্ড এবং আরও ওষুধের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন আনোয়ার হোসেন বলেন, নোয়াখালীতে এ পর্যন্ত ৩৬ শিশুর নমুনা ঢাকায় পাঠানোর পর পাঁচজনের হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে সদর হাসপাতালের ৩১ জন হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছে। তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া জেলায় প্রতি মাসে হামের ১৯ হাজার ৪৫ ভায়াল চাহিদার বিপরীতে মজুত আছে ৪ হাজার ৩৯১টি ভায়াল।

টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে হামে আক্রান্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় আট মাসের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়ে আরও ১৩ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। নিহত সায়ফাল সদর উপজেলার হাতিলা গ্রামের সোহেল রানার ছেলে। গত বুধবার রাত প্রায় ৩টার দিকে শিশুটি মারা যায়।

জেনারেল হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। বুধবার বিকাল ৪টার দিকে সদর উপজেলার হাতিলা গ্রামের সোহেল রানার ছেলে সায়ফালকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদিন রাত প্রায় ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ সাইফুল ইসলাম জানান, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ- যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করা, আক্রান্তদের আলাদা রাখা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। তিনি শিশুদের নির্ধারিত সময়ে টিকা প্রদান এবং জ্বর, ফুসকুড়ি বা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান।

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের উপ-পরিচালক খন্দকার সাদিকুর রহমান জানান, গত কয়েকদিনে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে আলাদা একটি ওয়ার্ডের প্রয়োজন পড়ে। সেজন্য হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ড হামের চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বৃহস্পতিবার হামের ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যা ১৩ জন। জেনারেল হাসপাতালে হামে আক্রান্ত ১৭ জন ভর্তি রোগী ছিল। এর মধ্যে ৩ জন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি গেছে। অপর এক আট মাসের শিশু মারা গেছে।

রাজশাহী : রাজশাহী অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজশাহীতে হামের উপসর্গ নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তপুর উপজেলার আরও একজন ৫ মাসের শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। রামেক মিডিয়া মুখপাত্র ও ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ডাঃ শঙ্কর কুমার বিশ্বাস জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ১৩২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। হাম থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে চারজন রোগী। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে উপসর্গ ও আক্রান্ত হয়ে ৩৪০ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ মেডিকেল টিম নিরলসভাবে কাজ করছে বলে জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

খাগড়াছড়ি : খাগড়াছড়ির ৩ উপজেলায় হামের লক্ষণ থাকায় ১১ শিশুর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় প্রেরণ করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন সিভিল সার্জন ডা. মো. ছাবের।

সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য মতে, খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলায় ৪ জন, রামগড় উপজেলায় ৪ জন ও দীঘিনালা উপজেলায় ৩ শিশুর হামের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেয়ায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সংগৃহীত নমুনা স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে ঢাকায় রোগতত্ত্ব নির্ণয় বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে। লক্ষণ থাকা শিশুরা বাড়িতে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা নিচ্ছে। এ ছাড়া শিশুদের বেশি পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ানোর পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সিভিল সার্জন ডা. মো. ছাবের জানান, খাগড়াছড়ির ৩ উপজেলা থেকে ১১ শিশুর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকা পাঠানো হয়েছে। নমুনা প্রেরণের পর ৩ দিন সময় লাগে ফলাফল হাতে পেতে। হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যার হাম কর্ণার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চিকিৎসার সবধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।

পটুয়াখালী : পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৫ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায়ই নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১৪ জন। বর্তমানে ৬ শয্যার হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২৫ জন রোগী। অন্যদিকে, ২৫০ শয্যার এ হাসপাতালে বর্তমানে রোগী ভর্তি রয়েছে ৭০০-এরও বেশি। ৪০ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে দুই শতাধিক শিশু। ফলে বেডের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এক বেডে দুই থেকে তিনজন রোগীকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, আবার অনেকেই মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডসহ অন্যান্য ওয়ার্ডে রোগীর উপচে পড়া ভিড়। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় হামে আক্রান্ত রোগীদের রাখা হচ্ছে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে। এতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগীর স্বজন অভিযোগ করে বলেন, একটা বেডে তিনজন রোগী রাখতে হচ্ছে। অনেক রোগী মেঝেতে শুয়ে আছে। এ অবস্থায় ঠিকমতো চলাফেরা করাও কঠিন। শিশুদের নিয়ে আমরা খুব কষ্টে আছি। চিকিৎসাসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রোগীর চাপ অনেক বেশি। একদিকে বেড সংকট, অন্যদিকে জনবল কম, সব মিলিয়ে সেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি সবার সর্বোচ্চ সেবা দিতে। পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমীন বলেন, আমাদের হাসপাতালে রোগী ভর্তি ৭০০-এর বেশি, যা ধারণক্ষমতার অনেক বেশি। সীমিত বেড ও জনবল নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। তারপরও আমরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত