
লিচুর জন্য বিখ্যাত দক্ষিণ চলনবিলের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর ও চাটমোহরের লিচু বাগানগুলো মৌমাছির গুণ গুণ শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে। সরিষা ক্ষেতের মৌ চাষিরা এখন এসেছেন লিচুর ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করতে। তিন উপজেলার প্রায় সহস্রাধিক লিচু বাগানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন এ সব চাষিরা। চলনবিল অধ্যুষিত এসব এলাকায় লিচু চাষ ভাল হওয়ায় প্রতি বছরের মতো এবারও বিভিন্ন জেলা থেকে মৌ চাষিরা মধু সংগ্রহ করতে এসেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বড়াইগ্রামের রয়না ভরট, গোয়ালফা, রোলভা, ভরতপুর, আগ্রাণ, গুরুদাসপুর উপজেলার বিয়াঘাট, চাপিলা, নাজিরপুরসহ চাটমোহরের বিভিন্ন এলাকার লিচু বাগানে মৌ মাছির বাক্স বসিয়ে মধু আহরণ করছেন চাষিরা। বর্তমানে এসব এলাকায় লিচু গাছের ফুল থেকে মধু সংগ্রহের ধুম পড়েছে। এতে একদিকে যেমন মৌ চাষিরা মধু সংগ্রহ করে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে মৌ মাছির মাধ্যমে মুকুলে মুকুলে পরাগায়ন ঘটায় চাষীরাও লিচুরও বাম্পার ফলনের আশা করছেন। বর্তমানে বাগানগুলোতে মণ্ডম গন্ধে গাছে গাছে বাতাসে দোল খাচ্ছে লিচু’র মুকুল। লিচু গাছগুলোতে এবার প্রচুর মুকুল ধরেছে। এ সুযোগে মৌ চাষিরা লিচুফুলের মধু সংগ্রহ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌ চাষি এসে বাগানে ছোট বড় বিভিন্ন আকৃতির মৌমাছির বাক্স বসিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মধু সংগ্রহ করছেন। বাগানে তারা শত শত ছোট বড় কাঠের বাক্স স্থাপন করেছেন।
পাবনা থেকে নাজিরপুর এলাকায় মধু সংগ্রহে আসা শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি বাক্সে একটি রানী মৌমাছি, একটি পুরুষ মৌমাছি ও অসংখ্য এপিচ মেইলিফ্রা জাতের কর্মী মৌমাছি রয়েছে। কর্মী মৌমাছিরা মণ্ডম গন্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে যায় লিচুর মুকুলে।
পরে মুকুল হতে মধু সংগ্রহ করে মৌমাছির দল নিজ নিজ কলোনিতে মৌচাকে এনে জমা করছে। প্রতি ৬-৭ দিন পর পর একেকটি বাক্স হতে চাষিরা ২-৩ কেজি মধু সংগ্রহ করছেন। বাজিতপুর গ্রামের লিচু চাষী জসীম উদ্দিন বলেন, যেসব গাছে মৌমাছির আগমন বেশি হয় সে গাছের মুকুলে পরাগায়ন ভাল হয়। ফলে ওই গাছে বা বাগানে লিচুর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা থাকে। এতে আমাদের যেমন লাভ হয়, তেমনি মৌ চাষিরা বেশি মধু সংগ্রহ করে বাণিজ্যিকভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারে।
রয়না ভরট বটতলা এলাকার একটি লিচু বাগানে মৌ-বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর থেকে আসা রিয়াব হোসেন। গতকাল শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিনিসহ মোট পাঁচজন শ্রমিক বাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করছেন। এসময় তিনি জানান, ১০ দিন যাবৎ তিনি এখানে এসেছেন। এখানে তার ১৬৫টি বক্স রয়েছে। প্রতিটি বক্স থেকে সপ্তাহে ২-৩ কেজি মধু পাওয়া যায়। এতে সপ্তাহে তিনি কমপক্ষে ৮ মণ মধু সংগ্রহ করেন। প্রতি কেজি মধু তিনি ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। বিভিন্ন কোম্পানীর কাছে তিনি মধু বিক্রি করেন বলে জানান।
বড়াইগ্রাম সরকারী অনার্স কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রধান জমশেদ আলী জানান, যেসব বাগানের লিচু ফুল থেকে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করে, সেসব ফুলে সঠিকভাবে পরাগায়ন ঘটে। ফলে সে বাগানের ফলন ২৫-৩০ ভাগ বেড়ে যায়।
এ ব্যাপারে বড়াইগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজীব আল মারুফ বলেন, বড়াইগ্রামসহ দক্ষিণ চলনবিলের তিন উপজেলায় প্রায় ৫০০ হেক্টর জমিতে লিচু বাগান রয়েছে। এসব লিচু বাগানে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত মৌ চাষিরা এসব বাগানের লিচুর মকুল থেকে মধু সংগ্রহ করে লাভবান হচ্ছেন। এছাড়া আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে এবার লিচুর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।