ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পাবনায় কোরবানির পশু চাহিদার দ্বিগুণ

পাবনায় কোরবানির পশু চাহিদার দ্বিগুণ

পাবনায় এবার পবিত্র ঈদুল আজহাকে (কোরবানি ঈদ) সামনে রেখে চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলার ৩৩ হাজার ৪০টি খামারে এবার মোট ৬ লাখ ৫৩ হাজার ৫৮৮টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলায় কোরবানির সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৭২টি পশু। চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত পশু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হবে বলে জানিয়েছেন খামারিরা। তবে লাভের দেখা পাওয়া নিয়ে সন্দিহান তারা। মণ প্রতি ৩২-৩৪ হাজার টাকা দর না পেলে লোকসানে পড়তে হবে বলে দাবি করেছেন খামার মালিকরা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে জেলায় গরু প্রস্তুতের শেষ দিবে খামারিরা ব্যস্ততা সময় পার করছেন। এ বছর দেশি ও সংকর প্রজাতির গরু প্রস্তুত করেছে খামারিরা। নিয়মিত খাবার দেওয়া ও পরিচর্যায় এখন শেষ ভাগের ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের। তবে এই ব্যস্ততার মধ্যেও খামারিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। কয়েকজন খামারি জানান, গত দুই বছরে দানাদার গো-খাদ্যের দাম বস্তাপ্রতি বেড়েছে ৪০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। বেড়েছে শ্রমিকের মজুরিও। পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের কারণে এবার হাটে গরু পরিবহন খরচও বাড়বে। সে অনুপাতে পশুর দাম না বাড়ায় সারা বছরের খরচ সমন্বয় আর ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।

পাবনার বেড়া উপজেলার চাকলা গ্রামের লালচাঁদ মোল্লা। নিজ বাড়িতে খামার স্থাপন করে ৫টি দেশি ষাড় লালন পালন করছে গত একবছর ধরে। এই খামারের পাশাপাশি তিনি গরু ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। এরইমধ্যে কোরাবানির বাজারে দেশের বিভিন্ন জেলার হাটগুলোতে গরু বেচাকেনা শুরু করেছেন তিনি।

বর্তমান বাজার সম্পর্কে তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহে এক থেকে দেড়লাখ টাকার গরুপ্রতি বাজার কমেছে ১০-১২ হাজার টাকা করে। বর্তমানে ৪ মণ ওজনের একটা দেশি গরুর দাম যাচ্ছে এক লাখ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মতো। এভাবে যদি দরপতন হয় তবে খামারিরা এবারও বিপদে পড়বে। আর যদি ভারতসহ দেশের বাইরের গরু বাজারে ঢোকে তাহলে একেবারে শেষ হয়ে যাবে খামারিরা। এ দিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন এ খামারি ও গরু ব্যবসায়ী।

তিনি আরও বলেন, গতবছরের তুলনায় ৪০ কেজি ওজনের বস্তা প্রতি গমের ভূসিতে ৩০০, মসুরের ২০০, এ্যাংকারের ২০০ ও ধানের গুড়ায় ৩০০ টাকা করে দাম বেড়েছে। ধানের শুকনা খড়ের দামও মণ প্রতি ২০০-৩০০ টাকা বেড়েছে। কোনোটায় হাজার টাকাও বেড়েছে। এভাবে সবক্ষেত্রে খরচ বেড়েছে। এক্ষেত্রে গরুতে মণ প্রতি এরইমধ্যে ব্যয় হয়েছে ২৮ হাজার টাকার মতো। যারা খামারে লোক রেখে গরু পালন করেন তাদের এর বেশি খরচ হয়েছে। এক্ষেত্রে মণ প্রতি দেশি গরুতে কমপক্ষে ৩৩-৩৪ হাজার টাকা দাম পেতে হবে। আর সংকর জাতের গরুগুলোর দাম হতে ৩২ হাজার টাকার মতো। না হলে অধিকাংশ খামারি তাদের লোনই পরিশোধ করতে পারবে না।

পাবনা সদর উপজেলার দ্বীপচর এলাকার হামিদ ক্যাটল ফার্মের পরিচালক সিফাত রহমান বলেন, মূলত নিজেদের কোরবানির চাহিদা মেটানো ও শখের বসে শুরুতে খামার করি। কিন্তু এখন এটির পরিসর বেড়েছে। এবার খামারে গরু আছে ১৮টি। আমাদের নিজস্ব মিল আছে। সেখান থেকে খাবারের সাপোর্ট পাই। অর্থাৎ উৎপাদন খরচের দামে গরুকে অনেক খাদ্য খাওয়াতে পারছি। এক্ষেত্রে খাদ্যে খরচ আমাদের কিছুটা কম।

তবুও লেবারসহ সব ব্যয় হিসেব করতে গিয়ে বছর শেষে দেখা যায় গায়ে গায়ে শোধ যাচ্ছে। দুইটা টাকাও অতিরিক্ত থাকে না। যারা নিজেরা বাড়িতে দুই একটা পোষে তাদের দুই এক টাকা ঘরে আসে। তবে তাদের পারিশ্রমিক ধরলে আবার সেটি থাকবে না। তিনি বলেন, অন্যান্য বছরগুলোতে এ সময়ে খামারগুলোতে কোরবানির গরুর জন্য অনেকের আনাগোনা দেখা যায়। অনেকে গরু ক্রয়ও করেন। কিন্তু এবার তেমনহারে লোক দেখছি না। একজন এসেছিল, সে ঘুরে ঘুরে দেখলেও কোনো দামই বললেন না। এবার বাজার নিয়ে শঙ্কা আরও বেড়েছে।

পাবনা সদর উপজেলার গয়েশপুরের খামারি বেলাল হাজি বলেন, বড় গরুতে লোকসানই বেশি হয়। এর আগে লোকসান হইছে। এবারও ২০ মণ ওজনের একটা গরু আছে। গতবছর ১৩ মণ ওজনে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকায় কিনেছিলাম। এই গরুর পেছনে এক বছরে আমার খরচ গেছে ২ লাখের বেশি। এখনও কেউ দাম বলছে না। বাজারের অবস্থা আরও খারাপ হলে আমাদের বিপদ।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য মতে, চলতি বছর জেলায় ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৭২টি পশুর চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে ৩৩ হাজার ৪০টি খামারে কোরবানি পশু প্রস্তুত রয়েছে ৬ লাখ ৫৩ হাজার ৫৮৮টি। এরমধ্যে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫টি গরু ও ৩ লাখ ৭৯ হাজার ১৭৭টি ছাগল রয়েছে। সবমিলিয়ে চাহিদার দ্বিগুণ থাকা উদ্বৃত্ত পশু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হবে বলে জানিয়েছেন প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, খামারিদের স্বার্থ ও গরুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার। এরইমধ্যে বাইরের গরু যেনো দেশে না ঢোকে সেক্ষেত্রে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার হাটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আশা করছি এবার বাইরের গরু বাজারে ঢুকবে না। বাইরের গরু বাজারে না আসলে খামারিরা সঠিক দামে লাভবান হবেন জানিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, খামারিদের সঙ্গে আমি একমত পোষণ করছি। মণপ্রতি ৩২-৩৪ হাজার টাকা দাম পেলে খামারিরা লাভবান হবেন। আর নানা সংকটে গোখাদ্যের দাম কিছুটা বাড়লেও এটি শিগগিরই কমে আসবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত