ঢাকা শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

প্রযুক্তির আড়ালে এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক সংকট

চৌধুরী জওহর দুদায়েভ
প্রযুক্তির আড়ালে এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক সংকট

একবিংশ শতাব্দীর শিশু-কিশোরদের হাতে হাতে আজ শুধু আধুনিক স্মার্টফোন নয়, বরং এটি যেন এক অদৃশ্য শিকল। যে বয়সে কিশোরদের মন উন্মুক্ত হওয়ার কথা ছিল অসীম জ্ঞানের সন্ধানে এবং সৃজনশীলতার আকাশে ডানা মেলার উদ্দেশ্যে, সেখানে তারা আজ এক অদৃশ্য ডিজিটাল শিকলে বন্দি। ফেসবুক রিলস্, ইউটিউব শর্টস্ এবং টিকটকের আ্যলগরিদমের ফাঁদে এই প্রজন্ম আজ এক চরম মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মুখে। আপাতদৃষ্টিতে এসব প্ল্যাটফর্মকে নিছক বিনোদন মনে হলেও, এর গহিনে লুকিয়ে আছে তরুণ প্রজন্মের মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে ‘হাইজ্যাক’ বা কবজা করে নেওয়ার এক সূক্ষ্ম কারিগরি।

অ্যালগরিদমের মরণফাঁদ ও ডোপামিন : এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম মূলত কাজ করে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের তথ্য বিশ্লেষণ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন বুঝতে পারে ব্যবহারকারী কোন ধরনের কনটেন্টে বেশি সময় দিচ্ছে, তখন সে একের পর এক ঠিক সেই ধরনের ভিডিও সামনে নিয়ে আসে। এই নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ যখন চলতে থাকে, তখন আমাদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ (Dopamine) নামক এক প্রকার হরমোনের নিঃসরণ ঘটে। এটি আমাদের তাৎক্ষণিক আনন্দের এক তীব্র অনুভূতি দেয়। সমস্যা হলো, মস্তিষ্ক যখন এই কৃত্রিম এবং সহজলভ্য আনন্দের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন কিশোরদের মাঝে এক ভয়াবহ আসক্তি তৈরি হয়। তারা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে সময় কাটাতে থাকে।

এর আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো গভীর মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা (Attention Span) আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দেওয়া। রিলস্ বা শর্টসের মাধ্যমে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অনেকগুলো তথ্য বা উত্তেজনাকর দৃশ্য সরবরাহ করা হয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও দেখতে অভ্যস্ত একটি মস্তিষ্ক যখন দীর্ঘ সময়ের কোনো পাঠ্যবই পড়তে যায় বা গভীর কোনো আলোচনা শোনে, তখন সে খুব দ্রুত ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। কারণ গভীর পড়াশোনায় সেই ‘তাৎক্ষণিক মজা’ নেই যা অ্যালগরিদম সেকেন্ডে সেকেন্ডে প্রদান করে। ফলে বর্তমান প্রজন্মের মাঝে গভীর চিন্তা (Deep Thinking) এবং স্বকীয় সৃজনশীলতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাদের ‘ক্রিটিকাল থিংকিং’ বা বিশ্লেষণমূলক চিন্তার দক্ষতা হ্রাস পাওয়ায় তারা বাস্তব সমস্যার গভীরে পৌঁছাতে পারে না এবং সমাধানের পথ খুঁজতে বেগ পায়। যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে নিজে, তার সমাজ এবং রাষ্ট্র।

প্রতিকার ও ডিজিটাল লিটারেসি : এই সংকটের সমাধান শুধু বলপ্রয়োগ বা মোবাইল কেড়ে নিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন শিশুকাল থেকেই ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ (Digital Literacy) বা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের শিক্ষা। শিশুদের এবং তরুণদের বুঝতে শেখাতে হবে যে প্রযুক্তি আমাদের চালক নয়, বরং আমরাই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রক। ডিজিটাল লিটারেসির মাধ্যমে শিশুদের প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং এর অন্ধকার দিক সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দিতে হবে।

পাশাপাশি যারা এরইমধ্যে এই চক্রে জড়িয়ে পড়েছে, তাদের জন্য প্রয়োজন সহমর্মিতার সাথে যথাযথ কাউন্সিলিং। অভিভাবকদের সচেতন হওয়া এখন সময়ের দাবি। তরুণদের আবার মাঠের খেলাধুলা, সামাজিক মেলবন্ধন এবং বই পড়ার চিরচেনা অভ্যাসে ফিরিয়ে আনতে হবে। পরিবারের ভেতরে সুস্থ কথোপকথনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যদি আমরা এই ‘ব্রেন হাইজ্যাকিং’ থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে না পারি, তবে এক মেধাহীন ও লক্ষ্যহীন প্রজন্মের দায়ভার পুরো জাতিকে বহন করতে হবে।

চৌধুরী জওহর দুদায়েভ

একাদশ শ্রেণি, উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত