প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৯ জানুয়ারি, ২০২৬
শীত মানে কনকনে ঠান্ডা। এই শীতকাল অনেকের কাছে আনন্দদায়ক। শীতেই ভ্রমণ পিপাসুরা ভ্রমণ করতে ছুটে, খেজুরের রস, মজার মজার পিঠাণ্ডপুলি খাওয়া। বলতে গেলে জমকালো একখানা ঋতু এই শীতকাল। কিন্তু অনেকের কাছে এটি জমকালো হলেও রাস্তার ধারে কিংবা নদীর ধারে কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে থাকা মানুষদের কাছে শীত যেন বেঁচে থাকার একমাত্র লড়াই। যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, তাদের জন্য শীত মানে ভয়াবহ দুঃসংবাদ। শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এক টুকরো শীতের কাপড় তাদের জন্য যেন শত আরাধনার ধন। একটা প্রবাদ আছে- মাঘের শীতে নাকি বাঘও কাঁপে; কিন্তু মাঘ আসার আগেই বাঘ কাঁপানো শীত এসে গেছে এবার। প্রচণ্ড শীত ও ঠান্ডা বাতাসে জনজীবনে নেমে এসেছে দুর্বিষহ।
বাংলাদেশে শীতকাল খুব বেশিদিন স্থায়ী হয় না, তবে ডিসেম্বরের শেষের দিক থেকে শুরু করে পুরো জানুয়ারি মাসে এ দেশে বিরাজ করে তীব্র শীত। যা কি না পথশিশুদের জীবনকে করে তোলে অসহনীয়। তাদের অবস্থা আরও দুর্বিষহ হয় শৈত্যপ্রবাহ শুরু হলে। তখন সাধারণ মানুষদের অবস্থা হয় অনেক খারাপ, তাহলে ভাবেন কীভাবে বেঁচে পথের ধারে বসে থাকা মানুষের? সাধারণ মানুষ যেখানে কম্বল, চাদর কিংবা শীতের হরেক রকম বস্ত্র পরিধান করেও শীত নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খায়, ঠিক সেখানে পথশিশুরা ছেঁড়া কাথা কিংবা পাতলা একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে যে যেখানে যেভাবে পারে শীত নিবারণের চেষ্টা করে। নিজেদের খাবার জোগাড় করতে করতেই সারাদিন কেটে যায় তাদের। কোনোদিন দু’বেলা খাবার জোটে আবার কোনোদিন না খেয়েই রাত পার করতে হয় তাদের। তার মাঝে শীত আর বৃষ্টি তাদের জীবনে নিয়ে আসে আরো অসহনীয় অবস্থা।
কারও কারও ভাগ্যে আবার খাবার তো দূরে শীতের কাপড়ও জোটে না। তীব্র শীতে আরামদায়ক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত পথশিশুরা জ্বর, হাঁচি, কাশি এবং নানান রোগে আক্রান্ত হয়। পর্যাপ্ত টাকা-পয়সা না থাকায় তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পর্যন্ত নিতে পারে না। আবার অসুস্থতার কারণে সারাদিন রোজগার করতে না পারায় তাদের খাবারও জোটে না। অসহায়, দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষরা দিন কাটাচ্ছে সীমাহীন কষ্টে। ফুটপাত ও বস্তিতে থাকা মানুষরা গরম পোশাকের অভাবে পার করছে নির্ঘুম রাত। পথে-ঘাটে, খোলা আকাশের নিচে শৈত্যপ্রবাহে অনেকে যাপন করছে দুর্বিষহ জীবন। এ কষ্টে কখনও নিভে যায় কারও জীবন প্রদীপ।
সমাজের অসহায় ও শীতার্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সকলেরই নৈতিক দায়িত্ব। অসহায়দের সাহায্যে এগিয়ে আসার মাধ্যমেই রচিত হবে মানবিক সেতুবন্ধন। আমাদের সামান্য সহযোগিতা তাদের জীবনে এনে দিতে পারে এক টুকরো সুখ। কনকনে শীতে ঠকঠক করে কাঁপা মানুষের গায়ে শীতবস্ত্র জড়িয়ে তার মুখে হাসি ফোটানোর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! এর মাধ্যমে প্রকাশ পায় মানুষের প্রতি আমাদের মমত্ব ও ভালোবাসার।
মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকেরাও করতে পারেন অনেক কিছু। এসকল অসহায়দের প্রতি তাদেরও রয়েছে কিছু নৈতিক দায়িত্ব। বড় অংকের অর্থ দান করা জরুরি নয়। আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সাথে অল্প দানও অনেক মূল্যবান। তাছাড়া আমাদের অতিরিক্ত সোয়েটার, জ্যাকেট, কম্বল ইত্যাদি শীতবস্ত্র দান করার মাধ্যমেও আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি। আমাদের সামান্য উপার্জনের থেকেও সাহায্য করে একজন শীতার্ত মানুষের মুখে হাসি ফুটানো সম্ভব।
বর্তমানে অবশ্য বাংলাদেশে পথশিশুদের নিয়ে অনেক এনজিও নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ ছাড়া বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের নিজ উদ্যোগে এবং নিজ অর্থায়নে পথশিশুদের সেবায় কাজ করে আসছে। পথশিশুদের জন্য এটি একটি মহৎকর্ম। কিন্তু অবহেলিত সেসব পথশিশুর জন্য এ কার্যক্রমগুলোর পাশাপাশি আরও সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে অনেককেই শীতার্ত পথশিশুদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে। প্রতি বছর তারা অসংখ্য শীতার্তদের মাঝে শীতের কাপড় বিতড়ন করে যাচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পথশিশুদের জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। যার ফলে তাদের কষ্ট লাঘব করতে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা খুবই প্রয়োজন। নিজ নিজ অবস্থান থেকে যদি সবাই সম্মিলিতভাবে অসহায় পথশিশুদের পাশে দাঁড়ায়, তবেই তাদের কষ্ট ঘুচবে বলে আশা করা যায়।
উম্মে সালমা
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ