ঢাকা শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সাগরে অঢেল সম্পদ : গবেষণা ও নীতিসহায়তার এখনই সময়

সাগরে অঢেল সম্পদ : গবেষণা ও নীতিসহায়তার এখনই সময়

বিশাল নীল জলরাশি পরিবেষ্টিত সমুদ্র শুধু একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, বরং এটি একটি অবারিত অর্থনৈতিক দিগন্ত। বর্তমান বিশ্বে স্থলভাগের সম্পদ যখন ক্রমান্বয়ে নিঃশেষিত হয়ে আসছে, তখন মানবজাতির সব নজর গিয়ে ঠেকেছে সাগরের নীল অর্থনীতি বা ‘ব্লু-ইকোনমি’র ওপর। বাংলাদেশের জন্য বঙ্গোপসাগর শুধু একটি জলসীমা নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টিকে থাকার এবং সমৃদ্ধির প্রধান উৎস। তবে এই অঢেল সম্পদকে জাতীয় অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী গবেষণা ও শক্তিশালী নীতিসহায়তা।

সম্ভাবনা যেখানে আকাশচুম্বী মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা জয়ের পর বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা লাভ করেছে। এই বিশাল এলাকায় কী নেই? মৎস্য সম্পদ থেকে শুরু করে মূল্যবান খনিজ- সবই এখানে বিদ্যমান। বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছ এবং বিপুল পরিমাণ শামুক, ঝিনুক ও কাঁকড়া রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন। মৎস্য সম্পদের বাইরেও সমুদ্রের তলদেশে রয়েছে গ্যাস হাইড্রেট বা মিথেন গ্যাসের জমাট বরফ। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় যে পরিমাণ গ্যাস হাইড্রেট রয়েছে, তা দিয়ে কয়েক দশকের জ্বালানি চাহিদা মেটানো সম্ভব। এ ছাড়া ভারী খনিজ যেমন ইলমেনাইট, রুটাইল, জিরকন এবং ম্যাগনেটাইটের মতো মূল্যবান উপাদানের উপস্থিতি আমাদের শিল্পায়নের গতি পাল্টে দিতে পারে। পর্যটন, শিপ-বিল্ডিং এবং গভীর সমুদ্রবন্দরের সম্ভাবনা তো রয়েছেই।

বড় বাধা সম্ভাবনা যতটা বিশাল, আমাদের প্রস্তুতি কি ততটা জোরালো? দুর্ভাগ্যবশত, উত্তরটি ইতিবাচক নয়। আমাদের সমুদ্র সম্পদের সঠিক মানচিত্রায়নের জন্য যে ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণা প্রয়োজন, তাতে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে। সাগরের গভীরতায় কী পরিমাণ মৎস্য বা খনিজ সম্পদ আছে, তার কোনো হালনাগাদ ও পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ আমাদের নেই। গবেষণা বলতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগ বা ছোটখাটো জরিপ নয়, বরং একটি সমন্বিত ‘ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ কালচার’ প্রয়োজন। আধুনিক গবেষণা জাহাজ (Research Vessel), উন্নত ল্যাবরেটরি এবং বিশেষজ্ঞ জনশক্তির অভাবে আমাদের অনেক সম্পদ এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। নীতিসহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সমুদ্র সম্পদ আহরণের জন্য শুধু আগ্রহ থাকলেই চলে না, প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও নীতিগত কাঠামো। বাংলাদেশে ব্লু-ইকোনমি নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও এর জন্য আলাদা কোনো মন্ত্রণালয় বা শক্তিশালী কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বালানি মন্ত্রণালয়, মৎস্য মন্ত্রণালয় এবং জাহাজ চলাচল মন্ত্রণালয় ভিন্ন ভিন্নভাবে কাজ করছে, ফলে অনেক ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয়।

বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে হলে ট্যাক্স হলিডে, সহজশর্তে ঋণ এবং সমুদ্রগামী জাহাজের জন্য বিশেষ বিমাব্যবস্থার মতো নীতিসহায়তা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমুদ্র সম্পদ আহরণের প্রযুক্তি ও কৌশল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই বিদেশি বিনিয়োগ বা যৌথ উদ্যোগ (Joint Venture) আকর্ষণ করার মতো ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন করা সময়ের দাবি।

সমুদ্র সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিবেশ রক্ষা। অনিয়ন্ত্রিত মাছ শিকার, সাগরে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা এবং তেল নিঃসরণ সাগরের বাস্তুসংস্থানকে ধ্বংস করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অমøতা বাড়ার ফলে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। তাই সম্পদ আহরণের নীতি এমন হতে হবে যাতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট না হয়। সাগরের অঢেল সম্পদকে কাজে লাগাতে আমাদের নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো দ্রুত নিতে হবে-

জাতীয় সমুদ্র কমিশন গঠন : সমুদ্রের যাবতীয় কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন বা পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে।

গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ : আন্তর্জাতিক মানের ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা এবং গভীর সমুদ্রের সম্পদ শনাক্ত করতে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া।

দক্ষ জনশক্তি তৈরি : সমুদ্রবিজ্ঞান ও ব্লু-ইকোনমি নিয়ে উচ্চশিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রসার ঘটানো।

বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ : সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন ও শিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগের পথ সুগম করা।

আঞ্চলিক সহযোগিতা : বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা ও সম্পদ সুরক্ষায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথ তদারকি বৃদ্ধি করা।

সাগরের বুক চিরে যে বিপুল সম্ভাবনা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে অবহেলা করার বিলাসিতা আমাদের নেই। একবিংশ শতাব্দীতে অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে নীল অর্থনীতিতে। সঠিক গবেষণা এবং সাহসী নীতিসহায়তা প্রদান করা গেলে বঙ্গোপসাগরই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের আগামীর ‘লাইফলাইন’। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বুদ্ধিজীবী ও গবেষকদের সমন্বিত প্রয়াসই পারে এই নীল স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করতে। সাগরের অঢেল সম্পদ শুধু আমাদের অধিকার নয়, এটি আমাদের সমৃদ্ধির মূলভিত্তি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত