প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৭ আগস্ট, ২০২৬
শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা, নাকি এমন মানুষ তৈরি করা, যারা বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান করতে পারে, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারে এবং সমাজের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে? বর্তমান বিশ্বের শিক্ষা-ভাবনা ক্রমেই দ্বিতীয় প্রশ্নটির দিকেই ঝুঁকছে। কারণ চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক শ্রমবাজারের এই সময়ে শুধু সনদ বা উচ্চ নম্বরই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ, সৃজনশীল, সহযোগিতাপূর্ণ এবং অভিযোজনক্ষম মানবসম্পদ।
শিক্ষা এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিক মূল্যবোধ ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে নিজেকে এবং সমাজকে সমৃদ্ধ করে। তবে শিক্ষা শুধু তথ্য বা তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করার সক্ষমতা গড়ে তোলাই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য। সহজভাবে বলতে গেলে, জ্ঞান (Knowledge) হলো কী করতে হবে তা জানা, আর দক্ষতা (Skill) হলো সেই কাজটি বাস্তবে সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারা।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন শিক্ষার্থী যদি কম্পিউটার সম্পর্কে বই পড়ে এর বিভিন্ন অংশের নাম, কাজ কিংবা ব্যবহার সম্পর্কে জানে, তাহলে সে জ্ঞান অর্জন করেছে। কিন্তু সে যদি বাস্তবে কম্পিউটার পরিচালনা করতে পারে, সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারে, একটি নথি তৈরি করতে পারে কিংবা সাধারণ প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান করতে পারে, তখন বলা যাবে সে দক্ষতা অর্জন করেছে। এই ধারণার ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা (Competency-Based Education ev CBE)। এ শিক্ষা পদ্ধতির মূল লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়; বরং একজন শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান, ব্যবহারিক দক্ষতা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অর্জন করেছে কি না, তা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, এখানে মুখস্থ করে পরীক্ষা পাস করাই সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড নয়; শেখা বিষয় বাস্তব জীবনে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকৃত শিক্ষা মূলত চারটি স্তরে মানুষের দক্ষতা গড়ে তোলে। সমালোচনামূলক চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা (Critical Thinking and Problem Solving) মানুষকে অন্ধভাবে তথ্য গ্রহণ করতে নয়, বরং বিশ্লেষণ করতে, প্রশ্ন করতে এবং যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়। প্রযুক্তিগত ও পেশাগত দক্ষতা (Hard Skills) মানুষকে নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্রে কাজ করার সক্ষমতা দেয়। যোগাযোগ, নেতৃত্ব ও দলগত কাজের মতো সফট স্কিল (Soft Skills) আধুনিক কর্মক্ষেত্রে প্রায় প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা (Emotional Intelligence) মানুষকে ধৈর্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহমর্মিতা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রদান করে।
বর্তমান সরকারের শিক্ষানীতিতেও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা এখনও জ্ঞান ও দক্ষতার মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারেনি। এর অন্যতম প্রধান কারণ অতিমাত্রায় প্রতিযোগিতানির্ভর শিক্ষা সংস্কৃতি।
প্রতিযোগিতা মানুষের অগ্রগতির জন্য অবশ্যই প্রয়োজনীয়। এটি শিক্ষার্থীদের আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে। কিন্তু যখন প্রতিযোগিতাই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন শেখার আনন্দ হারিয়ে যায় এবং নম্বর অর্জনই হয়ে ওঠে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য। ফলে সৃজনশীলতা, কৌতূহল এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে।
অতিরিক্ত প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে শিক্ষার্থীরা সহপাঠীকে সহযোগী নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করে। জ্ঞান ভাগাভাগির পরিবর্তে তথ্য গোপন করার প্রবণতা বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নকল, অসততা কিংবা অনৈতিক উপায়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতাও তৈরি হয়। একই সঙ্গে পরীক্ষার চাপ, উচ্চ প্রত্যাশা এবং ক্রমাগত তুলনার কারণে উদ্বেগ, হতাশা ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে শিক্ষা তার মানবিক উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে শুধু নম্বরনির্ভর প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
এ কারণেই বিশ্বের অনেক উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা এখন Competition to Collaboration অর্থাৎ প্রতিযোগিতা থেকে সহযোগিতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সহযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং শেখার অংশীদার। তারা দলগতভাবে সমস্যা সমাধান করে, মতবিনিময় করে, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে এবং সম্মিলিতভাবে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে। এখানে ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি সমষ্টিগত অগ্রগতিও সমান গুরুত্ব পায়।
এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হয়। দলগত আলোচনা তাদের সমালোচনামূলক চিন্তা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ায়। একই সঙ্গে যোগাযোগ দক্ষতা, সহযোগিতার মানসিকতা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও গড়ে ওঠে, যা আধুনিক কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতাগুলোর অন্যতম।
এ ক্ষেত্রে ফিনল্যান্ড বিশ্বের জন্য একটি অনুসরণযোগ্য উদাহরণ। দেশটির শিক্ষা দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হলো- Competition less, Collaboration more। ফিনল্যান্ড বিশ্বাস করে, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন নয়; বরং এমন নাগরিক তৈরি করা, যারা সহযোগিতাপূর্ণ, সৃজনশীল, দায়িত্বশীল এবং আজীবন শেখার মানসিকতাধারণ করে। তাই সেখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি না করে দলগত শিক্ষা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ফলস্বরূপ, ফিনল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম সফল শিক্ষাব্যবস্থার দেশ হিসেবে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নে দেশটি শিক্ষার মান, সমতা, শিক্ষার্থীদের কল্যাণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলাদেশও যদি দক্ষতাভিত্তিক মানবসম্পদ গড়ে তুলতে চায়, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু নম্বর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা থেকে বের করে আনতে হবে। পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শ্রেণিকক্ষের শিক্ষণকৌশলে সহযোগিতামূলক শিক্ষা, দলগত সমস্যা সমাধান, প্রকল্পভিত্তিক শেখা এবং বাস্তব দক্ষতা অর্জনের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষায় প্রশ্ন থাকে- কে সবার আগে? আর সহযোগিতামূলক শিক্ষায় প্রশ্ন থাকে- কীভাবে সবাই একসঙ্গে আরও ভালো করতে পারে? আগামী দিনের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের জন্য দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তরই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।
ড. মো. কুদরত-ই-জাহান
লেখক : উপাচার্য, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়।