ঢাকা শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আত্মত্যাগ থেকে আগামীর বাংলাদেশের অঙ্গীকার

সোনিয়া তাসনিম
আত্মত্যাগ থেকে আগামীর বাংলাদেশের অঙ্গীকার

ইতিহাস কি কেবলই স্মৃতিচারণ, নাকি ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার এক নির্ণায়ক? অতীতের গর্ভে ভ্রূণ হয়ে জন্ম নেওয়া বর্তমান সার্থকতা পায় ভবিষ্যৎ রূপে। ইতিহাসের ধূসরিত পাতায় এমন কিছু দিন থাকে, যা জাতির বিবেককে আলোড়িত করে। পুরাতন জীর্ণতার আবরণ ভেদ করে উন্মোচন করে নতুন সম্ভাবনা, জাগিয়ে তোলে নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন এবং আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ। ধ্বসে পড়া কোনো জাতি ক্রান্তিলগ্নে অবলোকন করে নতুন দিনের সূর্য। চব্বিশের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের জন্য তেমনি একটি দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ৩৬ দিনের শ্বাসরুদ্ধকর প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যেন নতুন করে নিজের দিশা খুঁজে নিয়েছিল। দিনটিকে ঘিরে মত ও মূল্যায়নের ভিন্নতা থাকলেও একটি বিষয়ে সবাই একমত, জাতীয় জীবনের প্রতিটি ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার সচেতন জনগণ ও সাহসী তরুণ সমাজ। তাই ৫ আগস্ট কেবল রাজনৈতিক ঘটনা বললে ভুল হবে। এটি নাগরিক প্রত্যাশা, আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা এবং উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নকে নতুনভাবে ভাবার এক উপলক্ষ্য। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে শিশু, তরুণ, যুবা, বৃদ্ধ; আপামর জনতা অকুতোভয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল। ভয়ংকর সেই লগ্নে তাদের ছিল না হারানোর ভয়; ছিল অদম্য সাহস আর আত্মত্যাগের প্রস্তুতি।

চব্বিশের জুলাইয়ে উত্তাল সময়ে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন অল্প সময়েই বৃহত্তর জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতা, সহিংসতা, দমন-পীড়ন ও প্রাণহানির পর জনতার ৯ দফা দাবি এসে থামে ১ দফায়। ৯০-এর শহিদ নূর হোসেন যেনো তখন হাজারো অস্তিত্বে নতুন করে ফিরে আসেন, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ইয়ামিন, ওয়াসীম, আনাস, ফারহান ফাইয়াজসহ আরও অগণিত নামে। দীর্ঘ এ সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে তৎকালীন সরকারের পতন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকের জন্ম দেয়। ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট-রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থা, কার্যকর সংলাপ এবং শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণই একটি স্থিতিশীল সমাজের অপরিহার্য ভিত্তি। যে কোনো জাতির অগ্রযাত্রায় এর বিকল্প নেই।

ইতিহাস সাক্ষী, যে কোনো জাতির জীবনে সংকটই নতুন সম্ভাবনার সূচনা করে। বাংলাদেশের ইতিহাসেও এ জাতি বহুবার কঠিন সময় অতিক্রম করে আরও পরিণত ও শক্তিশালী হয়েছে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ১৯৯০-এর গণ-আন্দোলন; প্রতিটি অধ্যায় আমাদের শিখিয়েছে, এ দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের দৃঢ়তা, সহমর্মিতা ও পুনর্গঠনের সক্ষমতা। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ও সেই সত্যেরই পুনরাবৃত্তি করেছে। বুঝিয়েছে, বিভেদ নয়- ঐক্যই জাতির প্রকৃত শক্তি। জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো আমাদের আরও শিখিয়েছে, ন্যায় কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ায় না; সহিংসতায় কোনো স্থায়ী সমাধান নেই, সংলাপ ও পুনর্মিলনই একটি সভ্য রাষ্ট্রের পথ। সেই অগ্নিঝরা আন্দোলনে নাম জানা-অজানা অগণিত শহিদ, যারা বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের প্রত্যাশায় নিজেদের উৎসর্গ করেছেন, তাদের প্রতি বাংলাদেশের দায় চিরন্তন। তাদের আত্মত্যাগের প্রকৃত সম্মান তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা অনুভব করবেন।

ঐতিহাসিক ৫ আগস্টের কাঙ্ক্ষিত বিজয়ে ছিল লাল-সবুজের নতুন দীপ্তি ও ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিজ্ঞা। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ কেবল সম্ভাবনার দেশ নয়, অর্জনের ভূখণ্ড। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি থেকে উঠে এসে দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যানুযায়ী, দারিদ্র্যের হার বর্তমানে প্রায় ১৮-১৯ শতাংশে নেমে এসেছে। কূটনৈতিক অবস্থানে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় এক গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সীমাবদ্ধতা আছে, ঠিক। তবুও কেবল ব্যর্থতার পরিসংখ্যান নয়, সফলতার দিকেও মনোযোগ দেওয়া জরুরি। কারণ, সফলতা ব্যর্থতার সঠিক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই জাতি এক সময়ে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছায়। বাংলাদেশের সামনে এক অপার সম্ভাবনার হাতছানি। আমাদের কাজ কেবল তাকে বিকশিত করতে নিজেদের প্রস্তুত করার। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি ও প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতি প্রশংসিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক নানা পরিসংখ্যানে পরিলক্ষিত, বর্তমানে পোশাকশিল্পে ৪০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান, যার বড় অংশই নারী। এ খাতে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এখান থেকে। কৃষির অগ্রগতি, মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তার, ১৯ কোটির বেশি মোবাইল সংযোগ, ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও নানা রাষ্ট্রীয় অর্জনে বাংলাদেশ আজ বিকশিত। অদূর ভবিষ্যতে একে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

এ অর্জনগুলো একদিনে আসেনি। পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক দুঃশাসন ও নিপীড়নের পথ। তাই এ চেতনাকে অতীতের খাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণায় রূপান্তর করা প্রয়োজন। তার জন্য সবার আগে দরকার নিজের পরিবর্তন। আত্মতুষ্টির সঙ্গে আত্মসমালোচনা যেমন জরুরি, তেমনি আত্মবিশ্বাসও। কারণ, স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়া একদিনের কাজ নয়; এটি দীর্ঘ জাতীয় প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার অংশ আমরা সবাই। দেশ গঠনের দায় কেবল সরকারের নয়; রাষ্ট্র, নাগরিক, তরুণ সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ, সবাই সমান অংশীদার।

আগামীদিনের বাংলাদেশ কেমন হবে, তার জবাব আজকের প্রজন্মকেই দিতে হবে। সেই জবাবের ভিত্তি সততা, দক্ষতা ও মানবিকতা। রাষ্ট্র পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার পাশাপাশি নাগরিকদের মাঝে সহিষ্ণুতা, ন্যায়বোধ ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা গড়ে তুলতে হবে। ৫ আগস্টের প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই। পরিবর্তন তখনই অর্থবহ, যখন তা জাতীয় পুনর্গঠন, সামাজিক আস্থা ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথ খুলে দেয়। যে কোনো গণ আন্দোলন একটি পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত করে সেটির সঠিক অবকাঠামোগত উন্নয়নেই আন্দোলনের প্রকৃত সফলতা নিহিত।

রাষ্ট্র উন্নয়নের সঙ্গে সুশাসনের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। সুতরাং আস্থার ক্ষেত্র হতে হবে শক্ত। এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সুপারিশ নয়, যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতার মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রে নৈতিকতার চর্চা যত বাড়বে, উন্নয়নের ভিত্তিও তত শক্তিশালী হবে।

কেবল অর্থনৈতিক অগ্রগতি নয়, সামাজিক ন্যায়ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। উন্নয়নের সুফল সর্বস্তরে পৌঁছাতে পারলেই দেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে বলা যাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে জ্ঞানই হবে সবচেয়ে বড় পুঁজি। তাই বৌদ্ধিক চর্চা এবং সঠিক ইতিহাস ও রাজনীতির চর্চা অপরিহার্য। বুঝতে হবে ইতিহাস ও রাজনৈতিক অজ্ঞতা জনতাকে বিভ্রান্ত করে। জনসচেতনতা তৈরিতে তাই সব বিষয়ে সুসংহত জ্ঞান থাকা আবশ্যক। গুজব বা উস্কানিতে বিভক্ত না হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে অশুভ চক্রান্ত প্রতিহত করা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে জনমত গঠন ও সচেতনতার বাহন হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। তথ্য যাচাই ও যুক্তিনির্ভর আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি।

সামাজিক সম্প্রীতি আমাদের দেশের এক অমোঘ সৌন্দর্য। পাহাড় হতে সমতলে রেনুর মতো ছড়িয়ে থাকা নানা ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়ের মানুষের সুদীর্ঘদিনের পাশাপাশি সহাবস্থান আমাদের সাংস্কৃতিক ও অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের ধারক- যা একই ভূখণ্ডে ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মাধ্যমে সুদীর্ঘ সময় ধরে গড়ে উঠেছে। কোনো প্রকার গুজব কিংবা উস্কানিতে তাই বিরোধে জড়ানো নয় বরং ঐক্যবদ্ধভাবে এসকল অশুভ চক্রান্ত রুখে দেওয়াটা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব।

মূলত ইতিহাসের যেকোনো পটপরিবর্তন আমাদের সামনে দুটি পথ উন্মুক্ত করে, একটি অতীতের আবেগে আটকে থাকা, অন্যটি ভবিষ্যতের সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়া। একটি প্রগতিশীল, আত্মবিশ্বাসী জাতি স্বভাবতই দ্বিতীয় পথ বেছে নেয়। অতীতের শিক্ষা ভবিষ্যতের গতি নির্ধারণ করে। জাতীয় অগ্রযাত্রার মূলশক্তি যেখানে প্রজ্ঞা, সেখানে প্রতিহিংসার স্থান নেই। তাই বিভাজন নয়, সহযোগিতা; হতাশা নয়, আশা- এটাই ৫ আগস্টের ইতিবাচক ধারা। একটি জাতি কোটি জনতার সততা, শ্রম, মেধা ও দেশপ্রেমের খুঁটিতে দাঁড়ায়। তাই ৫ আগস্টের চেতনাকে আমরা অন্তরে লালন করব। অগণিত শহিদের আত্মত্যাগে পাওয়া এ স্বাধীনতাকে উন্নয়নের অঙ্গীকারে রূপান্তরিত করাই আমাদের দায়িত্ব। ইতিহাস কখনো শুধু অতীত নয়, ভবিষ্যতের দায়টাও বহন করে। ৫ আগস্ট তাই আমাদের স্মরণ করায়, দিন শেষে আমরা সবাই এক, হৃদয়ে বাংলাদেশ। তাই আগামীর বাংলাদেশের জন্য এই দিনটি আশা, প্রেরণা ও আত্মবিশ্বাসের চিরস্থায়ী আলোকবর্তিকা হয়ে থাকুক- এটাই প্রত্যাশা।

সোনিয়া তাসনিম

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত