ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ভিন্নতার মধ্যে বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য : বামহাতি মানুষের প্রতি বদলাতে হবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
ভিন্নতার মধ্যে বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য : বামহাতি মানুষের প্রতি বদলাতে হবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

প্রতিবছর ১৩ আগস্ট পালিত হয় আন্তর্জাতিক বামহাতি দিবস। বিশ্বজুড়ে বাম হাতকে প্রধানত ব্যবহারকারী মানুষের স্বাতন্ত্র্য, দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা এবং তাদের প্রতি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে দিবসটি পালিত হয়। মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের বৈচিত্র্যের মধ্যে বামহাতি হওয়াও একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। অথচ দীর্ঘদিন ধরে অনেক সমাজে বাম হাতে কাজ করাকে অস্বাভাবিক বা ভুল হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে অনেক শিশুকে ছোটবেলা থেকেই জোর করে ডান হাতে লেখানো বা কাজ করানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, মানুষ কোন হাত বেশি ব্যবহার করবে- এটি তার স্বাভাবিক বিকাশের একটি অংশ। অধিকাংশ মানুষ ডানহাতি হলেও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বামহাতি। কারও ক্ষেত্রে দুই হাত ব্যবহারের দক্ষতাও তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি হতে পারে। তাই শিশুর হাতের স্বাভাবিক পছন্দকে সম্মান করা তার আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

পরিসংখ্যান : ২০২৬ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা আনুমানিক ৮৩০ কোটি। গবেষণায় বাঁহাতি মানুষের সামগ্রিক হার ১০.৬% ধরা হলে বিশ্বে বাঁহাতি মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ৮৮ কোটি। অর্থাৎ বিশ্বে গড়ে প্রতি ১০ জনে প্রায় ১ জন বাঁহাতি।

২০২০ সালের বৃহৎ মেটা-অ্যানালাইসিসে ২০ লাখের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাঁহাতিত্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সামগ্রিক হিসাব নির্ধারণ করা হয়। ওই গবেষণায় বাঁহাতিত্বের বিভিন্ন গবেষণাভিত্তিক হিসাব প্রায় ৯.৩% থেকে ১৮.১% পর্যন্ত পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হিসাব ১০.৬%, অর্থাৎ মোটামুটি প্রতি ১০ জনে একজন। গবেষণায় দেখা গেছে, বাঁহাতিত্বের হার নির্ধারণে দেশ, সংস্কৃতি, বয়স, লিঙ্গ এবং বাঁহাতি নির্ধারণের পদ্ধতি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিশ্বের বাঁহাতি মানুষের সুনির্দিষ্ট মোট সংখ্যা বলা সম্ভব নয়; প্রায় ৮৮ কোটি একটি আনুমানিক হিসাব।

বামহাতি হওয়া কোনো রোগ নয় : বামহাতি হওয়া কোনো রোগ, প্রতিবন্ধকতা বা দুর্বলতার লক্ষণ নয়। এটি মানুষের স্বাভাবিক বৈচিত্র্যের অংশ। একজন শিশু যদি স্বাভাবিকভাবে বাম হাতে লিখতে, আঁকতে, খেতে বা কোনো কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তাহলে শুধুমাত্র সামাজিক প্রচলিত ধারণার কারণে তাকে জোর করে ডান হাতে অভ্যস্ত করার প্রয়োজন নেই। শিশুরা সাধারণত বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কোন হাতটি সূক্ষ্ম কাজের জন্য বেশি ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তা প্রকাশ করতে শুরু করে। তাই অভিভাবক ও শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো শিশুর স্বাভাবিক প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া।

কেন কেউ বামহাতি হয় : মানুষের হাতের প্রাধান্য বা ‘হ্যান্ডেডনেস’ গঠনের পেছনে জটিল জৈবিক ও বিকাশগত বিষয় কাজ করে। জিনগত বৈশিষ্ট্য, মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্রম এবং পরিবেশগত বিভিন্ন প্রভাব এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। তবে কোনো একটি কারণ দিয়ে সব মানুষের বামহাতি হওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না।

মস্তিষ্কের দুই অর্ধগোলকের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে হাতের প্রাধান্যের সম্পর্ক রয়েছে। তবে ‘বামহাতি মানেই ডান মস্তিষ্ক বেশি সক্রিয়’- এ ধরনের সরলীকৃত ধারণাকে বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক নয়। মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত জটিল এবং বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে দুই অর্ধগোলকই পারস্পরিকভাবে কাজ করে।

শিশুকে জোর করে হাত বদলানো কেন ঠিক নয় : একটি শিশু যখন স্বাভাবিকভাবে বাম হাতে কোনো কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তখন তাকে বারবার হাত বদলাতে বাধ্য করলে অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হতে পারে। লেখার ক্ষেত্রে এতে শিশুর স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট হতে পারে এবং শেখার প্রতি অনীহা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষ করে বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিষয়টি খেয়াল রাখা প্রয়োজন। বামহাতি শিশুকে ডানহাতি সহপাঠীর সঙ্গে তুলনা না করে তার প্রয়োজন অনুযায়ী বসার জায়গা, খাতা রাখার অবস্থান এবং লেখার সুবিধা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

একজন শিক্ষক যদি বলেন, ‘তুমি বাম হাতে কেন লিখছ?’- তাহলে শিশুর মনে নিজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সংকোচ তৈরি হতে পারে। বরং বলা উচিত, ‘তুমি যে হাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করো, সেই হাতেই ভালোভাবে লেখো।

স্কুলে প্রয়োজন সচেতনতা : শিক্ষাব্যবস্থায় বামহাতি শিক্ষার্থীদের জন্য খুব বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন মূলত সচেতনতা ও সহানুভূতি। অনেক শ্রেণিকক্ষে চেয়ার-টেবিলের বিন্যাস এমনভাবে করা হয়, যাতে পাশাপাশি বসা শিক্ষার্থীদের কনুই বা হাতের চলাচলে সমস্যা হয়। বামহাতি শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে একটু ভিন্নভাবে বসার ব্যবস্থা করলে লেখার সময় তার স্বাচ্ছন্দ্য বাড়তে পারে। শিক্ষকদের উচিত বামহাতি শিশুকে আলাদা বা ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত না করে অন্যদের মতোই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা। পরীক্ষার সময়ও তাকে পর্যাপ্ত জায়গা ও আরামদায়ক অবস্থান দেওয়া যেতে পারে।

অভিভাবকদের ভূমিকা : শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু বাম হাতে কাজ করলে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করা, ‘উল্টো হাত’ বলা কিংবা বারবার হাত পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়া উচিত নয়। অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে- শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে পরিবারের আচরণ থেকেই। শিশুকে তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে ইতিবাচক ধারণা দিতে হবে। তার দক্ষতা, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দিতে হবে; কোন হাতে সে লিখছে, সেটিকে নয়।

একই সঙ্গে শিশুর হাতের ব্যবহার নিয়ে যদি বয়স অনুযায়ী অস্বাভাবিক কোনো সমস্যা দেখা যায়, যেমন সূক্ষ্ম কাজ করতে অতিরিক্ত অসুবিধা, সমন্বয়ের সমস্যা বা বিকাশ নিয়ে অন্য কোনো উদ্বেগ থাকে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যপেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

দৈনন্দিন জীবনে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ : বর্তমান বিশ্বে অনেক পণ্য ও সরঞ্জাম মূলত ডানহাতি ব্যবহারকারীদের কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়। কাঁচি, কিছু বাদ্যযন্ত্র, নির্দিষ্ট ধরনের যন্ত্রপাতি, ডেস্ক ও লেখার উপকরণ ব্যবহারে বামহাতিদের কখনো কখনো বাড়তি অসুবিধার মুখোমুখি হতে হয়। এখানে সমাধান হলো বৈচিত্র্যকে বিবেচনায় রেখে পণ্য ও পরিবেশ তৈরি করা। বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার, যাতে মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক বৈশিষ্ট্য কোনো অপ্রয়োজনীয় বাধায় পরিণত না হয়।

বামহাতিদের নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা : বামহাতিদের নিয়ে সমাজে নানা ধরনের কুসংস্কার ও ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ বামহাতি হওয়াকে দুর্ভাগ্যের সঙ্গে যুক্ত করেন, কেউ আবার এটিকে মেধা বা ব্যক্তিত্বের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখেন। উভয় ধারণাই অতিরঞ্জিত কোনো মানুষ বামহাতি হলেই সে বেশি মেধাবী হবে- এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে বামহাতি হওয়া কোনো দুর্বলতারও লক্ষণ নয়। মানুষের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষা, পরিশ্রম, দক্ষতা, সুযোগ, মানসিক দৃঢ়তা এবং পরিবেশসহ অসংখ্য বিষয়ের ওপর।

বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করাই সভ্যতার পরিচয় : সমাজে মানুষের পার্থক্য থাকবেই। কারও উচ্চতা বেশি, কারও কম; কেউ দ্রুত শেখে, কেউ ধীরে; কেউ ডানহাতি, কেউ বামহাতি। এসব বৈচিত্র্যকে সম্মান করা একটি মানবিক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে- ভিন্নতা মানেই ভুল নয়। বরং প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও সক্ষমতা রয়েছে। এই শিক্ষা শুধু বামহাতি শিশুদের জন্য নয়; এটি সব শিশুর আত্মমর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে সহায়ক।

স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বস্তির দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ : শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে অযথা চাপ বা উপহাস শিশুর মানসিক স্বস্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই কোনো শিশুকে তার স্বাভাবিক হাত ব্যবহারের জন্য লজ্জা দেওয়া উচিত নয়। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

শিশুর আচরণ বা শেখার কোনো সমস্যা দেখা দিলে শুধু সে বামহাতি- এই কারণকে দায়ী না করে সমস্যার প্রকৃত কারণ খুঁজে দেখা উচিত। প্রয়োজন হলে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে শিশুকে সহায়তা করা প্রয়োজন।

আমাদের করণীয় : অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে, শিক্ষকদের সংবেদনশীল হতে হবে এবং সমাজকে বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তায় এগিয়ে যেতে হবে। মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে পরিবর্তন করার চেয়ে তার সক্ষমতাকে বিকশিত করার দিকেই আমাদের বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত।

পরিশেষে বলা যায়, মানুষের সৌন্দর্য একরকম হওয়ার মধ্যে নয়, বৈচিত্র্যের মধ্যেই। একজন মানুষ কোন হাত দিয়ে লেখে বা কাজ করে, তা তার মূল্য নির্ধারণ করে না। তার চরিত্র, জ্ঞান, দক্ষতা, মানবিকতা ও কর্মই তার প্রকৃত পরিচয়।

তাই বামহাতি শিশুকে ‘সংশোধন’ করার পরিবর্তে তার স্বাভাবিক প্রবণতাকে সম্মান করি। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজে এমন পরিবেশ তৈরি করি, যেখানে কোনো শিশু নিজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সংকোচ বোধ করবে না। কারণ একটি শিশুকে তার মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া মানেই তার সম্ভাবনাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া। আর সেই সম্ভাবনাই একদিন পরিবার, সমাজ ও দেশের সম্পদে পরিণত হতে পারে।

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত