প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ আগস্ট, ২০২৬
সকালবেলা জানালা খুললে যে আলোটি ঘরে ঢোকে, তার কোনো দল নেই, মত নেই, পক্ষ নেই। সে শুধু জানে- অন্ধকারের কাজ অন্ধকারে থাকা, আর আলোর কাজ এসে পড়া। রাষ্ট্রের জীবনও বোধহয় এমনই। অনেক হিসাবের ভেতরেও কিছু ছোট ছোট আলো থাকে; শুধু আমাদের চোখ যেন সেদিকে তাকাতে শেখে। এ কদিনের সবচেয়ে স্বস্তির খবরটি এসেছে অর্থনীতির দিক থেকে। জুলাইয়ে দেশের মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে; জুনে ছিল ৯ দশমিক ১৬। দীর্ঘদিনের বাজার-যন্ত্রণার পর সংখ্যাটি তাই মন্দ নয়। অবশ্য আট দশমিক বত্রিশ শতাংশকে স্বস্তি বললে অর্থনীতিবিদ খুশি হতে পারেন, কিন্তু বাজারের গৃহিণী সম্ভবত বলবেন ‘স্বস্তি কোথায়? একটু কম কষ্ট।’ অর্থনীতির পরিভাষা বড় সুন্দর; মানুষের জীবন তার চেয়ে অনেক সরল।
কিন্তু এ সামান্য স্বস্তির মধ্যেই তেলের খবরটি এসে কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে-বেশি নিশ্চিন্ত হবেন না। সরকার বেসরকারি খাতকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের সুযোগ দেওয়ার একটি নীতির খসড়া নিয়ে কাজ করছে। উদ্দেশ্য-সরবরাহের উৎস বাড়ানো, রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো এবং বাজারে প্রতিযোগিতা আনা। শুনতে বেশ আধুনিক কথা। বাজারে প্রতিযোগিতা থাকলে ভোক্তারই লাভ হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে বাজারের গল্পটি একটু অন্যরকম- এখানে কখনও কখনও প্রতিযোগিতা শুরু হয় তিনজনকে নিয়ে, শেষ হয় একজনকে নিয়ে; তারপর সেই একজনকে আমরা খুব আদর করে ‘সিন্ডিকেট’ বলি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনও এই জায়গাটিতেই সংশয় জানিয়েছে। সংকটের সময়ে বেসরকারি আমদানিকারকেরা সরবরাহ বন্ধ করলে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই আবার বাজার সামলাতে হবে- এমন আশঙ্কা আছে। জ্বালানি তো আর বিস্কুট নয় যে দোকানে না পেলে মানুষ কাল কিনবে। তেল বন্ধ হলে গাড়ি থামে, কৃষির যন্ত্র থামে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়, শিল্প থামে; অর্থাৎ রাষ্ট্রের শরীরের রক্তসঞ্চালনেই সমস্যা হয়।
এখানে তাই আসল প্রশ্ন ‘বেসরকারি খাত ঢুকবে কি ঢুকবে না’- এটি নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি বাজার খুলবে, নাকি বাজারের দরজা খুলে চাবিটিও কাউকে দিয়ে দেবে? বেসরকারি বিনিয়োগের বিরোধিতা করার কোনো যুক্তি নেই; কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা, মজুত সক্ষমতা, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, প্রতিযোগিতার নিয়ম, জরুরি সময়ে সরবরাহের বাধ্যবাধকতা এবং একচেটিয়া ব্যবসা ঠেকানোর শক্তিশালী ব্যবস্থা ছাড়া এই সংস্কার বিপজ্জনক হতে পারে।
কারণ তেলের ব্যবসায় লাভের গন্ধ আছে, আর যেখানে বড় লাভের গন্ধ থাকে সেখানে আমাদের কিছু পুরোনো লোকজনের নাক অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যবস্থার দুর্বলতা যদি সমস্যা হয়, তার চিকিৎসা হতে পারে প্রতিযোগিতা; কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে নতুন কোনো তেল-সাম্রাজ্য তৈরি করা চিকিৎসা নয়।
তখন মানুষ বলবে- আগে তেল ছিল সরকারের হাতে, এখন মাফিয়ার হাতে; শুধু পাম্পের সাইনবোর্ড বদলেছে।
সরকার এরইমধ্যে জানিয়েছে, এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সেটিই ভালো খবর। কারণ এত বড় সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। তেল একটু দেরিতে আসতে পারে, কিন্তু ভুল নীতি একবার এলে তাকে ফেরত পাঠানো বেশ কঠিন।
এ জ্বালানি-প্রশ্নের সঙ্গে আজকের পৃথিবীর খবরটি অদ্ভুতভাবে জুড়ে যায়। হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের টানাপোড়েন এখনও কাটেনি। ইরান বলছে, মার্কিন কিছু শর্ত পূরণ না হলে প্রণালি পুরোপুরি খুলবে না; অন্যদিকে ওয়াশিংটনও হাস?্যকর ক্ষতিপূরণসহ নানা দাবি তুলছে। পৃথিবীর এক প্রান্তে দুটো দেশ একে অপরকে শর্ত দিচ্ছে, আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তে আমরা হিসাব করছি- ডিজেলের দাম কত হতে পারে। ভূগোলের সবচেয়ে মজার ব্যাপার বোধহয় এটাই: তেহরানে কেউ দরজা বন্ধ করলে ঢাকার কোনো এক গলিতে রিকশাওয়ালা তার প্রভাব টের পান।
তাই আমাদের জ্বালানি নীতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাস্তবতারও হিসাব রাখতে হবে। আমদানি উৎস যত বহুমুখী হবে, সরবরাহ ব্যবস্থাও তত স্থিতিস্থাপক হবে- এটি সত্য। কিন্তু বহুমুখীকরণ আর নির্ভরতাণ্ডবদল এক জিনিস নয়। সরকারি একচেটিয়াকে ভাঙতে গিয়ে বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি হলে বাজার হাসবে, রাষ্ট্র কাঁদবে, আর ভোক্তা যথারীতি বিল দেবে।
এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে একটি ভালো খবর এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রায় এক হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করছে, যেখানে জামানত ছাড়াই ঋণের সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
একটি দেশ তার তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে দেখবে, না কি উদ্যোক্তা হিসেবেও দেখবে- এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতের অর্থনীতি নির্ধারণ করবে। তবে এখানেও একই কথা: তেলের লাইসেন্স যেমন যোগ্যতার চেয়ে পরিচয়ের পুরস্কার হওয়া চলবে না, উদ্যোক্তা ঋণও তেমন ‘চেনাজানা যুবকদের উন্নয়ন প্রকল্প’ হওয়া চলবে না।
তরুণের হাতে টাকা দেওয়ার চেয়ে তার যোগ্যতার ওপর আস্থা রাখা বড় ব্যাপার।
এদিকে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কেও কিছু নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে। ঢাকায় বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতের হাইকমিশনার দিল্লিতে গিয়ে তার প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকা আলোচনার বিষয়বস্তু জানিয়েছেন। কূটনীতির সৌন্দর্য হলো- দুই দেশ অনেক কথা না বলেও অনেক কথা বলে। কূটনীতির ভাষা সাধারণত খুব ভদ্র- ‘পারস্পরিক স্বার্থ’, ‘গঠনমূলক পরিবেশ’, ‘আলোচনার মাধ্যমে সমাধান’ ইত্যাদি। কিন্তু ভদ্র কথার আড়ালে বাস্তব জিনিসগুলো বেশ শক্ত: পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, যোগাযোগ, মানুষের চলাচল এবং আস্থা। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার অর্থ মাথা নত করা নয়; আবার সম্পর্ক খারাপ রাখার মধ্যেও কোনো জাতীয় গৌরব নেই। রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদা সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ পায় যখন সে বন্ধুত্ব করে চোখে চোখ রেখে।
কিন্তু রাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি এখনও হাসপাতালের বিছানায়। দেশে হাম এখনও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে আছে; শিশুদের মৃত্যু অব্যাহত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বছরের শুরু থেকেই রোগটির বিস্তার দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, আর সহায়তা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, আক্রান্ত পরিবারগুলোর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠকে চিকিৎসার খরচ জোগাতে ঋণ করতে হয়েছে।
রোগটি প্রতিরোধযোগ্য- এই কথাটিই খবরটিকে আরও বেদনাদায়ক করে।
একটি শিশুর চিকিৎসার খরচ মেটাতে যদি একটি পরিবার ঋণ নেয়, সেটি শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়; সেটি সামাজিক সুরক্ষারও ব্যর্থতা। রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তার নাগরিক অসুস্থ হলে চিকিৎসা পায়, সন্তান নিরাপদে বড় হয়, তরুণটি কাজের সুযোগ পায় এবং বাজারে গিয়ে তার মাসের হিসাবটি একেবারে ভেঙে পড়ে না। বাজেটের অঙ্ক যত বড়ই হোক, একটি মায়ের চোখের জল দিয়ে তার হিসাব মেলানো যায় না।
আজকের সম্পাদকীয় ভাবনাটি তাই খুব সরল: রাষ্ট্রকে বাজার থেকে পালাতে হবে না, আবার বাজারের কাছেও আত্মসমর্পণ করা যাবে না। রাষ্ট্রের কাজ ব্যবসা করা নয়- এ কথাটি যেমন সত্য, তেমনি রাষ্ট্রের কাজ শুধু দর্শক হয়ে বসে থাকা নয়- এটিও সত্য। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, যোগাযোগের মতো কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রক, নীতিনির্ধারক এবং শেষ আশ্রয় হিসেবে শক্ত থাকতে হয়। বেসরকারি খাত আসুক, বিনিয়োগ আসুক, প্রতিযোগিতা আসুক; কিন্তু নিয়মের মালিকানা যেন রাষ্ট্রের কাছেই থাকে। কারণ বাজারের ভুলের দাম ব্যবসায়ী কখনও কখনও লোকসান দিয়ে মেটাতে পারেন, রাষ্ট্রের ভুলের দাম মেটায় জনগণ।
গাজার দিক থেকেও আজ শান্তির কোনো সহজ সকাল নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রত্যাখ্যান করেছেন; গাজায় যুদ্ধ, জিম্মি, নিরস্ত্রীকরণ ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে অবস্থানগুলো এখনও পরস্পর থেকে অনেক দূরে। যুদ্ধের ইতিহাসে একটি অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি আছে- প্রথমে সবাই জয় চায়, শেষে সবাই শান্তির টেবিলে বসে। মাঝখানে শুধু মৃত মানুষের সংখ্যা বাড়ে।
সুতরাং আজকের সকালটি তেলের গন্ধে শুরু হলেও তেলের কাছে শেষ হতে হবে না। আমাদের সামনে আসল প্রশ্ন আরও বড়- কেমন রাষ্ট্র চাই? এমন রাষ্ট্র, যে সবকিছু নিজে করবে? না কি এমন রাষ্ট্র, যে সবকিছু অন্যের হাতে তুলে দিয়ে বলবে, ‘বাজার দেখুক’? কোনোটিই নয়। দরকার এমন রাষ্ট্র, যে জানে কোথায় হাত বাড়াতে হয়, কোথায় হাত সরিয়ে নিতে হয়, আর কোথায় শক্ত করে লাগাম ধরে রাখতে হয়।
আজকে বলতে হচ্ছে- রাষ্ট্র চালানো বোধহয় চা বানানোর মতো; পানি বেশি হলে চা ফিকে, পাতা বেশি হলে তিতা, আর চিনি বেশি হলে ডাক্তার রাগ করেন। আমাদের রাষ্ট্রের চায়ের কাপটিও তাই মাপজোক করে বানাতে হবে। বেসরকারি উদ্যোগ থাকবে, কিন্তু জনস্বার্থের চিনি যেন ফুরিয়ে না যায়; বাজার থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রের বুদ্ধি যেন চুলায় পুড়ে না যায়।
আজকের আলোটুকু তাই খুব সামান্য হলেও যথেষ্ট। মূল্যস্ফীতি একটু কমেছে, তরুণের জন্য দরজা খোলার কথা হচ্ছে, প্রতিবেশীর সঙ্গে কথাবার্তা চলছে। আর তেলের দরজায় আমরা এখনও দাঁড়িয়ে আছি- চাবি কার হাতে দেব, সেই সিদ্ধান্তটি নেওয়ার আগে অন্তত একবার পকেটের দিকে তাকানো যাক। কারণ শেষ পর্যন্ত তেলের দাম যে-ই ঠিক করুক, বিলটি কিন্তু জনগণকেই দিতে হয়।
শামসুল আলম
লেখক : সাবেক সচিব ও সিনিয়র ব্যুরোক্রেট বিশ্লেষক