
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চায় দলটি। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে যার নেতৃত্বের ভার পড়েছে সাবেক এই প্রধামন্ত্রীর বড় ছেলে তারেক রহমানের ওপর। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তারা খালেদা জিয়ার নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে দেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চান। স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসা খালেদা জিয়া চার দশকের বেশি সময় বাংলাদেশের অন্যতম বড় দল বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিন দফায় ১০ বছরের বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে করেছেন দেশ শাসন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ‘আপসহীন নেত্রী’ হয়ে ওঠা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের বড় সময় কেটেছে আন্দোলনে আন্দোলনে। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, জেল খেটেছেন; তবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে কখনো তিনি হারেননি।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠা বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, দেশনেত্রীর নেত্রীর ইন্তেকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হল এবং এই ক্ষতির পূরণ সহজে সম্ভব নয়। আজকে এমন একটা সময়ে তিনি চলে গেলেন যখন তাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। যখন গণতন্ত্রের উত্তোরণের জন্য একটা নির্বাচনের দিকে জাতি যাচ্ছে, যখন সমস্ত জাতি তৈরি হয়েছে নির্বাচন করে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করবে। সেই সময় তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এই শোক, এই বেদনা আমাদের পক্ষে ধারণ করা খুব কঠিন। তারপরেও আমরা এই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চাই। আমরা দেশনেত্রীর নির্দেশিত যে পথ সেই পথকে অনুসরণ করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আমরা একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাই এবং সেই পথকে লক্ষ্য করে একটা সুষ্ঠু, আবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আসুন আমরা আজকে সবাই শোককে শক্তিকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে একটা অপ্রতিরোদ্ধ দল হিসেবে গড়ে তুলি। বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থেই একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আমরা প্রতিষ্ঠিত করি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন দিয়ে গেছেন, সেই পতাকা খালেদা জিয়া বহন করেছেন। একইভাবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সেই পতাকা তুলে ধরে তারেক রহমান জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশের স্বাধীনতা রক্ষা, জনগণকে সুরক্ষা এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন- এটাই মানুষের প্রত্যাশা। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে যে গণমানুষের ভালোবাসা ও আবেগের বর্হিপ্রকাশ ঘটেছে, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে আরও শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পতাকা এখন তারেক রহমানের হাতে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। মির্জা ফখরুল বলেন, নীতির প্রশ্নে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে খালেদা জিয়া কখনও আপস করেননি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন, লড়াই করেছেন এবং বারবার কারাবরণ করেছেন।
জীবনের শেষ সময়ে গুরুতর অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো দেশ ছেড়ে যাননি। দেশের মাটি, মানুষ ও সার্বভৌমত্বের প্রতি তার গভীর ভালোবাসাই সাধারণ মানুষকে আবেগাপ্লুত করেছে। তিনি বলেন, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে যখন খালেদা জিয়ার অভিভাবকত্ব সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, ঠিক সে সময় তার প্রয়াণে মানুষ গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছে। এ কারণেই বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশনেত্রীর জানাজায় অংশ নিয়েছেন, তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং চোখের পানি ফেলেছেন।
বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, খালেদা জিয়ার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের জনগণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে কর্তব্য রয়েছে, তা তারা পালন করবেন। একই সঙ্গে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করার মাধ্যমে দেশের পক্ষে যে শক্তি রয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে বিজয়ী করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, তাঁর মা খালেদা জিয়া সারা জীবন নিরলসভাবে মানুষের সেবা করেছেন। আজ তাঁর সেই দায়িত্ব ও উত্তরাধিকার তিনি গভীরভাবে অনুভব করছেন। একাগ্রতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে তিনি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, যেখানে তাঁর মায়ের পথচলা থেমেছে, সেখান থেকে তিনি চেষ্টা করবেন সেই পথযাত্রাকে এগিয়ে নিতে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, গভীর শোক ও কৃতজ্ঞতায় ভাস্বর হয়ে আমি আমার প্রিয় মা, জীবনের প্রথম শিক্ষক, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আমার বাবা, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করেছি। তাঁর অনুপস্থিতির শূন্যতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তবু, এই কঠিন মুহূর্তে দেশের মানুষের অভূতপূর্ব উপস্থিতি আমাকে একাকিত্বে ভুগতে দেয়নি।
অগণিত নেতাকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী, পরিবার ও দেশবাসীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় আমি গভীরভাবে আবেগাপ্লুত। লাখ লাখ মানুষ একসঙ্গে এসে যেভাবে সম্মান জানিয়েছে, ভালোবাসা দিয়েছে এবং এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছে; তা আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে: তিনি শুধু আমার মা ছিলেন না; অনেক দিক থেকে, তিনি ছিলেন সমগ্র জাতির মা।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শীর্ষ প্রতিনিধি, বৈশ্বিক কূটনীতিক এবং উন্নয়ন সহোযোগীরা সশরীরে উপস্থিত থেকে শ্রদ্ধা জানান এবং আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। যেসব দেশ সমবেদনা প্রকাশ করেছে, তাদের প্রতিও আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আপনাদের এই সহমর্মিতা আমাদের হৃদয় গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছে।
শোকের এই মুহূর্তে আমি আমার প্রাণপ্রিয় বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে স্মরণ করছি। আজ এত মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মনে হচ্ছে, নিকটজন হারানোর শূন্যতা পেরিয়ে, পুরো বাংলাদেশই আমার পরিবার হয়ে উঠেছে।
আমার মা সারাজীবন নিরলসভাবে মানুষের সেবা করেছেন। আজ তাঁর সেই দায়িত্ব ও উত্তরাধিকার আমি গভীরভাবে অনুভব করছি। একাগ্রতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি: যেখানে আমার মা’র পথচলা থেমেছে, সেখানে আমি চেষ্টা করবো সেই পথযাত্রাকে এগিয়ে নিতে। সেই মানুষদের জন্য, যাদের ভালোবাসা ও বিশ্বাস তাঁকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শক্তি দিয়েছে, প্রেরণা যুগিয়েছে। আল্লাহ যেন আমার মা’র রূহকে শান্তি দান করেন, আর তিনি যে অসীম ভালোবাসা, ত্যাগ ও উদারতার উদাহরণ আমাদের সবাইকে দিয়ে গেছেন, সেখান থেকেই আমরা শক্তি, ঐক্য এবং দেশপ্রেম খুঁজে পাই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আমরা সত্যিকার অর্থে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শোককে শক্তিতে পরিণত করতে চাই। কিন্তু এটা দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনের কাজে ব্যবহার করার মতো এত সংকীর্ণ আমরা নই। তার শোকের শক্তিকে জাতি বিনির্মাণের জন্য ব্যবহার করতে চাই। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারতের পর সাংবাদিকেদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। তারেক রহমান সম্পর্কে বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, তারেক রহমান একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাকে শক্ত মনোবলের অধিকারী হতে হবে, তার কোনো বিকল্প নেই। যত শোকই হোক জাতির স্বার্থে তাকে শক্ত থাকতে হবে।
প্রসঙ্গত, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। গত বুধবার বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তার জানাজা ঘিরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসহ আশপাশের এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। স্বতঃস্ফূর্ত মানুষের ঢল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সংসদ ভবন এলাকা ছাড়িয়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে উপচে পড়ে। ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে মানুষ জানাজায় অংশ নেয়। জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় খালেদা জিয়াকে শেরেবাংলা নগরে স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়।