
সরকার থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে, দেশে কোথাও জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি তেলের অভাবে বহু পেট্রলপাম্প বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। কিছু পাম্পে সীমিত পরিমাণে জ্বালানি সরবরাহ থাকলেও সেখানে গাড়ির দীর্ঘলাইন তৈরি হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চালকরা জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন না। এতে পরিবহন খাতসহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, সরকার সংকট না থাকার কথা বললেও বাস্তবে সরবরাহ ঘাটতি স্পষ্ট। এ অবস্থায় দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কয়েকদিন সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকার প্রবেশদ্বার মাতুয়াইলের রাজধানীর পেট্রলপাম্পে জ্বালানি সংকটে দিনের অর্ধেক সময় বন্ধ রাখা হয়। রাজধানী পেট্রল পার্শ্বের মতোই আশপাশে যেসব পাম্প রয়েছে সবগুলোর দৃশ্য একই রকম। ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ না থাকায় ঈদের পরদিন থেকে ভোগান্তিতে পড়েছেন যানবাহন চালকরা। অনেক জেলায় ফিলিং স্টেশনগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চগড়-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের ৯৩ কিলোমিটারের ৪৬টি ফিলিং স্টেশনের ৪৩টি বন্ধ। কুড়িগ্রামের ২০টি স্টেশনের প্রতিটি জ্বালানি ‘তেলশূন্য’। সবমিলিয়ে জেলাজুড়ে হাজার হাজার গ্রাহক তেল কিনতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিপো থেকে চাহিদার বিপরীতে অর্ধেক পেট্রল মিলছে। অকটেনের সরবরাহ বন্ধ। তবে চাহিদার বিপরীতে ডিজেল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে না পেরে গ্রাহকদের গালিগালাজ শুনছেন। সেজন্য অধিকাংশ সময় পাম্ব বন্ধ রাখা হচ্ছে।
রাজশাহীতে বন্ধ অর্ধেকের বেশি ফিলিং স্টেশন : রাজশাহীতে ৪৪টি ফিলিং স্টেশন, এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি বন্ধ। আর যেসব ফিলিং স্টেশন চলছে তাও ধুকে ধুকে। জ্বালানি না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন যানবাহন চালকরা। জেলার গণমাধ্যমকর্মী মাহী ইলাহি বলেন, ‘গত সোমবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত জেলা ও মহানগরীর ২০টি পাম্প ঘুরেছি। কোথাও তেল পাইনি। ঈদের দিন থেকেই বন্ধ আছে জেলার অধিকাংশ পাম্প। যে পাম্পে যাচ্ছি বলছে তেল নেই। এর মধ্যে কিছু পাম্প তেল পেলেও তা বিক্রি করছে না। যারা ডিপো থেকে নিয়ে আসছে তারা বিক্রি না করে মজুত করে রাখছে।’ রাজশাহী জেলা পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান শিমুল বলেন, ‘পাম্পগুলোতে যা মজুত ছিল তা ঈদের আগেই শেষ হয়ে গেছে। এ কারণে ঈদের তৃতীয় দিন পর্যন্ত কোনো পাম্পে আর পেট্রল ও অকটেন নেই। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকরা এসে পাম্পগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন। তেল নেই অধিকাংশ পাম্পে নোটিশ দিয়ে দড়ি টানিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাঘাবাড়ী ডিপোতে আমাদের লরি গেছে। লরিতে সাড়ে ১৩ হাজার লিটার তেলের ধারণক্ষমতা। কিন্তু পাওয়া গেছে তিন হাজার লিটার। আমরা পরিবেশকদের বলেছি পর্যাপ্ত তেল দিতে। যদি তেল মিলে তবেই বিক্রি হবে। ডিপো থেকে শুধু ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। পেট্রল-অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘তেল বিক্রি শুরু হলে গ্রাহকদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা হতে পারে। পুলিশ দিয়ে কাজ হয় না। এজন্য আমরা জেলা প্রশাসককে বলেছি, যেন পাম্পগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। তা না হলে তেল বিক্রি করা সম্ভব হবে না।’
পঞ্চগড়-দিনাজপুর সড়কের ৪৩টি ফিলিং স্টেশন বন্ধ : তেলের সরবরাহ না থাকায় ঈদের পরদিন থেকে ভোগান্তিতে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের চালকরা। ঈদের আগের রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের হানিফ ফিলিং স্টেশনে ভবনের কাচ ভাঙচুর করেন তারা। কয়েকজন গ্রাহক বলছেন, তেল থাকতেও দিচ্ছে না, দাম বাড়ার অপেক্ষায় মজুত করেছেন পাম্পমালিকরা। সিন্ডিকেট করে খুচরা পাইকারদের তেল দেওয়া হচ্ছে। ছোট ছোট বাজারে তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। পঞ্চগড়-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের ৯৩ কিলোমিটারের ৪৬টি ফিলিং স্টেশন চোখে পড়ে। এর মধ্যে পঞ্চগড় থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের সীমানায় ২৫টি পাম্প বন্ধ; সেখানে অকটেন ও পেট্রল নেই। বীরগঞ্জ থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত ২১টি পাম্পের মধ্যে তিনটিতে শুধু পেট্রল বিক্রি করতে দেখা গেছে। সেখানে গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি। কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে পাম্পে হাজির হয়েছেন, কেউ বোতল নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। গ্রাহকদের ভিড়ে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্পের কর্মীরা। সিরিয়াল ভাঙতে দেখলেই শুরু হয় হইহুল্লোড়, চিৎকার, চেঁচামেচি।
কয়েকটি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক ও কর্মচারী জানান, প্রতিটি লরিতে (তেলবাহী ট্রাক) ডিজেল, পেট্রল, অকটেনের জন্য তিনটি চেম্বার থাকে। ডিপো থেকে শুধু ডিজেল পেয়েছেন। বাকি দুটি চেম্বার খালি। এতে পরিবহন খরচও বাড়ছে। পাম্পগুলোয় দৈনিক পেট্রলের চাহিদা রয়েছে ৭০০ থেকে দেড় হাজার লিটার, অকটেন ৩৫০ থেকে ৭০০ লিটার। আর ডিজেলের চাহিদা দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার লিটার। তারা ঈদের আগে জ্বালানি পেয়েছেন; তাও অর্ধেক।
ঠাকুরগাঁওয়ের চৌধুরী ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী বলেন, ‘গত শুক্রবার তেল পেয়েছি। তিন দিন পর মঙ্গলবার সাড়ে তিন হাজার লিটার পেট্রল পেয়েছি। রেশনিং পদ্ধতিতে (প্রতিজন ২০০ টাকার) দেওয়া ছাড়া উপায় নাই। এখানে আমাদের হাতে কিছু নাই। ডিপো থেকে তেল না পেলে আমরা কী করব?’
পঞ্চগড় ধাক্কামাড়া এলাকায় একটি পাম্পের কর্মচারী ফারুক আলম বলেন, ‘একটা অ্যাম্বুলেন্স যদি আসে, একফোঁটা জ্বালানি দিতে পারব না। আর পেট্রল, যার দুই লিটার হলেও চলবে, সে নিচ্ছে পাঁচ লিটার। আমরা দুই লিটারের বেশি দিই না। অনেকে এ পাশ থেকে তেল নিয়ে, আবার পেছন থেকে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। যদি তেলের সংকট আরও বাড়ে, এই ভেবে মানুষ রিজার্ভও করছে।’
চট্টগ্রামের পাম্পগুলোতেও নেই তেল : চট্টগ্রামের বেশকিছু পেট্রলপাম্পে গত কয়েকদিন ধরে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মিলছে না। কিছু পাম্প বন্ধ রয়েছে। কোনো কোনো পাম্পে অকটেন থাকলেও নেই ডিজেল। আবার কোনো পাম্পে ডিজেল থাকলেও নেই অকটেন। এ নিয়ে বিপাকে চালকরা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগে পেট্রলপাম্প ৩৮৩টি, এজেন্ট ডিস্টিবিউটর ৭৯৯ জন এবং প্যাকড পয়েন্ট ডিলার ২৫৫ জন। পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম বিভাগের সদস্যসচিব মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৪৬টির মতো পেট্রল পাম্প আছে। কোনও কোনও পাম্পে ডিজেল থাকলে অকটেন নেই, আবার অকটেন থাকলেও নেই ডিজেল। তবে গতকাল মঙ্গলবার বিকালে এই সংকট কাটবে বলে তিনি মনে করেন। কারণ ঈদের ছুটিতে ব্যাংক বন্ধ থাকায় তেল কেনায় পে-অর্ডার করা যায়নি। সেজন্য পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হয়নি। ব্যাংক খোলা হলে পে-অর্ডার জমা দেওয়া হবে। এতে পাম্পগুলোতে তেল স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।
ময়মনসিংহের বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন বন্ধ : ময়মনসিংহের বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন ঈদের দিন সকাল থেকেই বন্ধ। ফলে বিপাকে পড়েন যানবাহন চালকরা। তবে বেশি বিপাকে মোটরবাইক চালকরা। এর মধ্যে গত রোববার দু’একটি ফিলিং স্টেশন মাঝেমধ্যে খুলে যানবাহন চালকদের তেল দিতে দেখা গেছে। ময়মনসিংহ নগরীর পুলিশ লাইনস সংলগ্ন সাইফুল ফিলিং স্টেশনে ঈদের দিন সকাল থেকে গত সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্ধ পাওয়া গেছে। সাইফুল ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার কামরুল হাসান বলেন, ‘ফিলিং স্টেশনে মজুতকৃত জ্বালানি তেল ঈদের আগের দিন রাতেই শেষ হয়ে গেছে। তেল না থাকায় ঈদের দিন সকাল থেকে স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। জ্বালানি তেল পাওয়া গেলেই আবার খোলা হবে।’
নগরীর চুরখাই রওশন ফিলিং স্টেশন ঈদের আগের দিন থেকেই বন্ধ। এখানকার কর্মচারী শফিকুল ইসলাম জানান, ‘জ্বালানি তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় ঈদের আগের দিন থেকেই আমাদের স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। কর্মচারীরা সবাই ঈদ করতে বাড়ি চলে গেছেন। তেল পাওয়া গেলে স্টেশন খোলা হবে।’
তবে নগরীর শিকারিকান্দা সওদাগর ফিলিং স্টেশনে গত সোমবার দুপুরে গিয়ে খোলা পাওয়া যায়। দুই ঘণ্টার জন্য খোলা রেখে যানবাহন চালকদের তেল দিতে দেখা গেছে। সওদাগর ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী রমজান জানান, জ্বালানি তেলের মজুত একেবারেই শেষের দিকে। কিছু ছিল, এজন্য ফিলিং স্টেশন খুলে চালকদের তেল দেওয়া হয়েছে। মজুত শেষ হওয়ার পরপরই বিকালের দিকে পেট্রলপাম্প বন্ধ করা হয়।
কুড়িগ্রামের ২০ ফিলিং স্টেশন বন্ধ : কুড়িগ্রামে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার ২০টি ফিলিং স্টেশনের প্রতিটি জ্বালানি ‘তেলশূন্য’ হওয়ায় গত
রোববার থেকে সেগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। হাজার হাজার গ্রাহক তেল কিনতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফিরে যাচ্ছেন। তেলসংকটে গ্রাহকদের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ‘তেল নেই’ শুনে মজুত যাচাই কর?তে স্টেশনগুলোতে অভিযান শুরু করেছে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন। গত সোমবার সকাল থেকে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের তত্ত্বাবধায়নে এ অভিযান শুরু হয়। তবে স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত তেলের সন্ধান মেলেনি। তেল না পাওয়ায় শহরের খলিলগঞ্জে অবস্থিত এসএস ফিলিং স্টেশনে কয়েকজন গ্রাহক উত্তেজিত হয়ে হামলার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। গত রোববার সন্ধ্যায় ওই পেট্রল পাম্পে পুলিশকে পাহারা দিতে দেখা গেছে।
জেলার ফুয়েল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, জেলায় ২০টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। কিন্তু কোনটিতেই পেট্রল, ডিজেল কিংবা অকটেন- কোনো প্রকার জ্বালানি তেল নেই। ঈদের আগেই তেলশূন্য হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে রশি টেনে সেগুলো বন্ধ থাকার নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। গ্রাহকরা জ্বালানি তেল কিনতে গিয়ে ফেরত যাচ্ছেন। দিনভর একই চিত্র দেখা যায়।
ফুয়েল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জামান আহমেদ বলেন, ‘তেল না থাকায় মালিকরা জেলার পেট্রলপাম্পগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু গ্রাহকরা তেল না পেয়ে উত্তেজিত হচ্ছেন। তেল না থাকলে আমরা দেব কীভাবে। কিন্তু কিছু গ্রাহক পাম্পের কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। কোথাও কোথাও হামলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’
বগুড়ায় ৩৫টি পাম্প বন্ধ : বগুড়ায় তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার ৭২টির মধ্যে অর্ধেকের বেশি ফিলিং স্টেশনে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন নেই। এতে যানবাহন চলাচলে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গত সোমবার বিকালে বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন রাজশাহী বিভাগীয় সভাপতি মিজানুর রহমান রতন জানান, সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় এ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কিছু জ্বালানি আসছে। তা দিয়ে সংকট পরিস্থিতির কিছুটা লাঘব হবে।
রংপুরের ২০ স্টেশন বন্ধ : রংপুরের ৪০ ফিলিং স্টেশনের বেশিরভাগে জ্বালানি নেই। গত সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার অন্তত ২০টি স্টেশন বন্ধের খবর পাওয়া গেছে। ফিলিং স্টেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, গত রোববার থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ না থাকায় গত সোমবার দুপুরের পর থেকে মজুতশূন্য হয়ে পড়ায় পাম্পগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। এদিন তাদের তেলবাহী লরিগুলো পার্বতীপুরে গিয়ে কোনো জ্বালানি পায়নি। যানবাহন চালকরা বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে জ্বালানি না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, জেলা প্রশাসনের কোনো নজরদারি না থাকায় এমন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এব্যাপারে ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তফা মহসিন জানান, ডিপু থেকে জ্বালানি না পাওয়ায় তারা তেল বিক্রি করতে পারছেন না। জেলার ২০টির বেশি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে।
খুলনার ৩৬টি পাম্প বন্ধ : খুলনা জেলা পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির সহ- সভাপতি মহিবুল হাসান বলেন, ‘খুলনা জেলায় ৩৬টি পাম্প রয়েছে। চাহিদা মতো তেল না পাওয়ায় সব পাম্পই সংকটে রয়েছে। ডিপো থেকে যা তেল দেওয়া হয়, চাপ বেশি থাকার কারণে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। ফলে গত সোমবার বিকাল ৫টার পর থেকে সব পাম্পই বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন করে তেল পাওয়ার পর আবার পাম্পগুলো চালু হবে।’ খুলনা বিভাগীয় ট্যাংক লরি মালিক সমিতির সভাপতি সুলতান মাহমুদ পিন্টু বলেন, ‘ব্যাংক ড্রাফটের জন্য উত্তরা ব্যাংক খালিশপুর শাখা ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য ২৩ মার্চ বন্ধের দিনও খোলা রেখেছিল। কিন্তু ডিপো থেকে সময়মতো তেল দিতে পারেনি। চাহিদা অনুযায়ী তেল ডিপো দিচ্ছেও না। ফলে যেটুকু তেল পাওয়া যায় তা পাম্পে নিতেই শেষ হয়ে যায়। ফলে পাম্পগুলো চালিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে বরিশালের সব পাম্প : বরিশাল নগরী থেকে শুরু করে ১০ উপজেলার মহাসড়কের পাশে স্থাপিত পেট্রল পাম্পগুলো ঠিকমতো জ্বালানি তেল দিতে পারছে না। বিশেষ করে ডিজেল না হয় পেট্রল কিংবা অকটেনের সংকট লেগেই আছে। এজন্য পাম্পের মেশিনগুলোর ওপরে লিখে রাখা হচ্ছে ডিজেল-অকটেন অথবা পেট্রল নেই লেখা কাগজ। একাধিক পাম্পের কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি সংকটে জেলার অধিকাংশ পেট্রলপাম্প বন্ধ রাখা হচ্ছে। কারণ তেলের সংকটে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টাও পাম্প চালু রাখতে পারছেন না তারা। খোলা রাখলে ক্রেতারা তেল নিতে এসে নেই বললে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। এ সময় তাদের হামলার শিকার হতে হচ্ছে পাম্পের কর্মচারীদের। এ কারণে পাম্পগুলো বন্ধ রাখা হচ্ছে।
বরিশাল পেট্রলপাম্প ও ট্যাংক লরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শওকত আকবর জানান, ‘গত কয়েকদিন ধরে প্রতিদিনই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টার বেশি পাম্পে তেল থাকে না। যে পরিমাণ তেল সরকার থেকে নির্ধারিত করা রয়েছে তা দিয়ে ১০ ঘণ্টাও চলার মতো না। এজন্য জেলার অধিকাংশ পাম্প দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল আছে, পাম্পে দীর্ঘলাইন দেওয়ার প্রয়োজন নেই- জ্বালানিমন্ত্রী : পেট্রলপাম্পগুলোতে অযথা দীর্ঘলাইন না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল আছে। পেট্রলপাম্পে দীর্ঘলাইন দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি এবং সরবরাহও কমায়নি। তাই পেট্রলপাম্পের সামনে দীর্ঘলাইন ধরে জ্বালানি তেল সংগ্রহের কোনো যৌক্তিকতা নেই। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। ইকবাল হাসান মাহমুদ আরও বলেন, ‘জনগণের কাছে এবং যারা নাকি গাড়ি চালান, তাদের কাছে আমার একটা আহ্বান থাকবে যে আপনারা প্রয়োজনের বেশি তেল নিবেন না, সে ক্ষেত্রে স্টক করলে ভিড় বাড়বে, লাইন বাড়বে।’ গত বছরের তুলনায় এই বছর ২৫ শতাংশ বেশি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, পর্যাপ্ত পরিমাণে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ঈদের দিন আর ঈদের পরের দিন সরকারি ছুটি ছিল। সে সময় ডিপোগুলো বন্ধ ছিল। সে জন্য ডিপোগুলো থেকে তেল সরবরাহ করা হয়নি। এ জন্য হয়তোবা পেট্রলপাম্পগুলোতে তেলের স্বল্পতা থাকতে পারে। তবে আজ সকাল থেকে আবার ডিপোগুলো চালু হয়ে গেছে। পেট্রলপাম্প তেল পাবে। তেলের জন্য পেট্রলপাম্পগুলোতে লাইন দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে তিনি মনে করেন।
ইকবাল হাসান মাহমুদ আরও বলেন, ‘আমি সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে আহ্বান জানাব যে আপনারা প্যানিক হবেন না এবং আপনারা প্রয়োজনের বেশি তেল ক্রয় করে অযথা অস্থিরতা তৈরি করবেন না। প্রয়োজনের বেশি তেল নিয়ে স্টক করলে ভিড় বাড়বে, লাইন বাড়বে।’ তেল নিয়ে কোনো সংকট হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সবাইকে সংযমী হতে বললেন অর্থমন্ত্রী : চলমান ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সবাইকে সংযমী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলেন। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আইএমএফ কী পরামর্শ দিল- এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধের প্রেক্ষাপট আছে, ব্যাংক খাতে চ্যালেঞ্জ আছে, পুঁজিবাজারে চ্যালেঞ্জ আছে, কর-জিডিপি অনুপাত আমাদের একেবারে নিম্নপর্যায়ে। এটাতে উন্নতির জন্য আমরা কী করতে পারি, সে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সরকারের মাত্র এক মাস হয়েছে। এই এক মাসের মধ্যে রমজান মাস ছিল, এর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও পরিবহনে কোনো সমস্যা হয়নি। ঈদের সময় সবাই বাড়িতে যেতে পেরেছে, ভাড়া বাড়েনি, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ছিল। অর্থমন্ত্রী বলেন, গার্মেন্ট খাতে প্রতি বছর ঈদের আগে যে সমস্যাগুলো হয়, এবার তেমন কোনো অস্থিরতা ছিল না। কারণ এগুলো আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফল। আমরা আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে রমজানজুড়ে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ছিল।
তিনি বলেন, তেলের বড় সংকট থাকা সত্ত্বেও তেলের অভাবে কোনো পরিবহন বন্ধ ছিল না এবং গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন সময়মতো দেওয়া হয়েছে। কোনো অস্থিরতা ছিল না। অর্থমন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু সরকার একা পারবে না। আমরা দেশবাসীর কাছে আবেদন করব- সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে, সহানুভূতিশীল হতে হবে, সংযম আমাদের মধ্যে আনতে হবে।
তিনি বলেন, যেহেতু যুদ্ধ কোনো সরকারের হাতে নেই, যুদ্ধ হচ্ছে অন্য জায়গায়, এর প্রভাব আমরা ভোগ করছি। এজন্য আমাদের সংযমী হতে হবে এবং সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। সবাই মিলে আমরা সংকট থেকে উত্তরণ করতে পারব এবং অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারব। বৈঠকের আলোচনার বিষয় জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, আইএমএফের সঙ্গে আমাদের একটি কর্মসূচি চলছে এবং এটি কয়েক বছর ধরেই অব্যাহত রয়েছে। এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে এবং পরবর্তী মূল্যায়নেও যাবে।
তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত অর্থনীতি খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। সেখান থেকে উত্তরণের জন্য যে কর্মসূচিগুলো রয়েছে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ঘোষণাপত্রে যে বিষয়গুলো বলা হয়েছে, সেগুলো নিয়েই আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে এ ধরনের অবস্থা থেকে উত্তরণে আমাদের অনেক সংস্কার প্রয়োজন, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ প্রয়োজন। ব্যাংক খাত খুবই খারাপ অবস্থায় আছে, শেয়ারবাজারও দুর্বল, কর-জিডিপি অনুপাতও কঠিন অবস্থায় রয়েছে- বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এগুলো থেকে উত্তরণ করতে হলে ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি এবং বাকিগুলো শিগগির নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এরইমধ্যে সামাজিক খাতে অনেক কাজ শুরু হয়েছে- ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।