ঢাকা বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬, ১১ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

আজ ভয়াল ২৫ মার্চ, গণহত্যা দিবস

আজ ভয়াল ২৫ মার্চ, গণহত্যা দিবস

আজ ২৫ মার্চ, গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পাক-হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে হত্যা চালায়। ভয়াল সেই রাতে ঘটেছিল বিশ্ব ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ ছিল বাঙালির একটি প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এক নারকীয় পরিকল্পনা। ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস পালনের লক্ষ্যে সারা দেশে প্রতীকী ‘ব্ল্যাক আউট’ পালন করা হবে আজ রাত ১০টায়। ২৫ মার্চ এই দিনে পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান একটি বিমানে গোপনে পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত যাওয়ার পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের পূর্ব পরিকল্পিত পোড়া মাটি নীতি বাস্তবায়ন শুরু করে। এ জন্যই ঢাকাসহ সারা দেশে চালানো হয় অপারেশন সার্চ লাইট। সে সময় জেনারেল টিক্কা খান বলেছিলেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না’। ফলশ্রুতিতে বাঙালি জাতির জীবনে নেমে আসে বিভীষিকাময় ভয়াল কালরাত্রি। এক ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতার স্মৃতি হিসেবে চিহ্নিত এই রাত। ২৫ মার্চ কালো রাতে শুরু হওয়া পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা চলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় ধরে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সারা দিয়ে সে সময় চলামান অসহযোগ আন্দোলনের ২৪তম দিন। সে দিন সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। মধ্য রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা সাঁজোয়া ট্যাঙ্ক নিয়ে ‘আরেশন সার্চ লাইট’ এর নামে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপরে নির্বিচারে হত্যা করতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা এবং রাজারবাগে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ছাত্র-শিক্ষক, বাঙালি পুলিশ ও সামরিক সদস্যদের হত্যা করতে থাকে। পাকিস্তানি শোষকরা পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ে মিয়ানওয়ালী পাকিস্তানের। কারাগারে বন্দি করে।

১৯৭১ সালের ১৩ জুন পাকিস্তানি সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস যুক্তরাজ্যের ‘দি সানডে টাইস’ পত্রিকায় বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিদের নির্মম বর্বরতার বাস্তব চিত্রনির্ভর একটি বিস্তারিত নিবন্ধ প্রকাশ করেন। যা বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি ত্বরান্বিত করে। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক বর্বরোচিত হামলার সেই নৃশংস ঘটনার স্মরণে ২০১৭ সালের ১১ মার্চ দশম জাতীয় সংসদের চতুর্দশ অধিবেশনে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা করা হয়।

মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চ ভয়াল রাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সেই রাতে ৭০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেপ্তার করা হলো আর ৩০০০ লোক। ঢাকায় ঘটনার শুরু মাত্র হয়েছিল। এর পর সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে সৈন্যরা বাড়িয়ে চলল মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করল ঘরবাড়ি, দোকানপাট। লুট আর ধ্বংস যেন তাদের নেশায় পরিণত হলো। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা লাশগুলো কাক-শেয়ালের খাবারে পরিণত হলো। সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠল শকুন তাড়িত শশ্মশান ভূমি।’ পাকিস্তানি হানাদাররা সেই রাতে অগ্নিসংযোগ, মর্টার শেল ছুড়ে একে একে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, জাতীয় প্রেস ক্লাব ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। এ হামলায় জীবন দিতে হয় বেশ কয়েকজন গণমাধ্যম কর্মীকেও।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে গোপনে সামরিক প্রস্তুতি নিতে থাকে। মুক্তিকামী বাঙালি তখন স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বেলিত। আলোচনার নামে শাসকগোষ্ঠীর সময়ক্ষেপণকে বাঙালিরা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে থাকে।

২৫ মার্চ রাত সোয়া ১টার দিকে একদল সৈন্য শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে অবস্থিত বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। তারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। তখন বঙ্গবন্ধু বীরের মতো দোতলার ঝুল বারান্দায় এসে দাঁড়ান। রাত ১টা ২৫ মিনিটের দিকে এ বাড়ির টেলিফোনের লাইন কেটে দেওয়া হয়। এ সময় বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে চিরতরে নস্যাতের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় হায়েনার দল। অবশ্য গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই ২৫ মার্চ মধ্যরাতের পর অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে তৎকালীন ইপিআরের ওয়?্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতা ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দেন। এরপর ৯ মাসের যুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের আত্মদান, আড়াই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়।

গণহত্যা দিবস পালন উপলক্ষে গৃহীত জাতীয় কর্মসূচি : আজ ২৫ মার্চ যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সারা দেশে গণহত্যা দিবস পালন করা হবে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী প্রদত্ত বাণী প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হবে।

এদিন দেশের সব স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ২৫ মার্চের গণহত্যা ও মহান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে স্মৃতিচারণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। এছাড়া, ২৫ মার্চ দুপুর ১২টা থেকে ঢাকাসহ দেশের সব সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মিনিপোলসমূহে গণহত্যা বিষয়ক বস্তুনিষ্ঠ ও নৈর্ব্যক্তিক দুর্লভ আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে। এদিন বাদ জোহর বা সুবিধাজনক সময়ে ২৫ মার্চের রাতে নিহতদের স্মরণে সারাদেশের মসজিদে বিশেষ মোনাজাত এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা করা হবে।

দিবসটি উপলক্ষে ২৫ মার্চ রাত ১০টা ৩০ মিনিট থেকে ১০টা ৩১ মিনিট পর্যন্ত এক মিনিটের প্রতীকী ব্ল্যাকআউট পালন করা হবে। তবে কেপিআই ও জরুরি স্থাপনাগুলো এ কর্মসূচির বাইরে থাকবে। এছাড়া, ২৫ মার্চ রাতে কোনো অবস্থাতেই আলোকসজ্জা করা যাবে না। এদিন সকাল ১০টা বা সুবিধাজনক সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ব্যবস্থাপনায় দিবসটি উপলক্ষে একটি সেমিনার আয়োজন করা হবে।

২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস-২০২৬ পালন এবং ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত