
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার দোবাড়িয়া গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলমের দিন এখন কাটছে মাঠের সবুজ শসার পরিচর্যায়। এক সময় ভাগ্যের অন্বেষণে নানা দিকে ছুটে চলা এই পরিশ্রমী যুবক এখন নিজের মাটিতেই খুঁজে পেয়েছেন সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। মাত্র ৪০ শতাংশ জমিতে শসা চাষ করে তিনি এলাকায় এক চাঞ্চল্যকর সাফল্যের উদাহরণ তৈরি করেছেন। তার এই অভাবনীয় সাফল্য দেখে এখন স্থানীয় অন্য কৃষকদের মধ্যেও নতুন করে আশার আলো সঞ্চার হচ্ছে। জাহাঙ্গীর ৪০ শতাংশ জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে শসা চাষ শুরু করেন। সঠিক যত্ন আর সুপরিকল্পিত চাষাবাদের ফলে ফলনও হয়েছে আশাতীত। বর্তমানে তার খেতে শসার বাম্পার ফলন দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিনের সকালটা তার শুরু হয় শসা তোলার ব্যস্ততা দিয়ে।
জাহাঙ্গীর জানান, প্রতি সপ্তাহে তিনি তার জমি থেকে গড়ে ৫০ মণ করে শসা তুলছেন। খেত থেকে সদ্য তোলা টাটকা শসার মান ভালো হওয়ায় বাজারেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা সরাসরি মাঠ থেকেই তার উৎপাদিত পণ্য সংগ্রহ করছেন। বাজারদরের বর্তমান পরিস্থিতি জাহাঙ্গীরের জন্য বেশ অনুকূল। প্রতি কেজি শসা তিনি পাইকারি বাজারে বিক্রি করছেন ৫০-৫৫ টাকা দরে। শসার এই ভালো দাম পাওয়ায় তার মুখে এখন তৃপ্তির হাসি। বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় তাকে বিক্রির জন্য কোনো বাড়তি ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে না। বরং খুচরা ও পাইকারি বাজারে স্থানীয় শসার কদর বেশি হওয়ায় জাহাঙ্গীর ভালো মুনাফার মুখ দেখছেন। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে যে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র বদলে যেতে পারে, জাহাঙ্গীরের শসা খেত তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম ও পুঁজি বিনিয়োগের গল্প। জাহাঙ্গীর জানান, এই ৪০ শতাংশ জমিতে শসা চাষের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বীজ, সার, কীটনাশক, মাচা তৈরি এবং শ্রমিকের মজুরি বাবদ তার প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। প্রথম দিকে বিনিয়োগের পরিমাণ কিছুটা বেশি মনে হলেও ফলন আসার পর সেই দুশ্চিন্তা এখন দূর হয়েছে। তার দীর্ঘদিনের শ্রম ও মেধা আজ সার্থক হতে চলেছে। তিনি আশা করছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বাজারের বর্তমান গতিধারা বজায় থাকলে এই মৌসুমে তিনি ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকার শসা বিক্রি করতে পারবেন। সব খরচ বাদ দিয়ে তার পকেটে বড় অঙ্কের মুনাফা থাকবে বলে তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাসী। চান্দিনার দোবাড়িয়া গ্রামের এই সফল চাষি মনে করেন, প্রথাগত ধান বা পাটের বাইরেও সবজি চাষ করে অতি দ্রুত ভাগ্য বদলানো সম্ভব। জাহাঙ্গীরের এই সাফল্যে স্থানীয় কৃষি বিভাগও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকদের যে কতোখানি বদলে দিতে পারে, জাহাঙ্গীর তার বাস্তব প্রমাণ। শসা চাষের মাধ্যমে তার এই অভাবনীয় উপার্জন এখন গ্রামবাসীর মুখে মুখে। অনেক বেকার যুবক এখন জাহাঙ্গীরের কাছে আসছেন শসা চাষের পদ্ধতি শিখতে। তারা মনে করছেন, বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি না খেটে নিজ দেশে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে সচ্ছলতা আনা সম্ভব। জাহাঙ্গীরের স্বপ্ন শুধু এই ৪০ শতাংশ জমিতেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান ভবিষ্যতে চাষাবাদের পরিধি আরও বাড়াতে এবং এলাকার আরও অনেককে এই লাভজনক সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করতে। তার এই পরিশ্রমী মানসিকতা আর মাটির প্রতি মমতা তাকে আজ এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। চান্দিনার দোবাড়িয়ার জাহাঙ্গীর আলম এখন আর শুধু একজন সাধারণ কৃষক নন, তিনি হাজারো তরুণের অনুপ্রেরণা। ফসলের মাঠের এই সবুজ বিপ্লব শুধু জাহাঙ্গীরের ভাগ্যই বদলাচ্ছে না; বরং স্থানীয় অর্থনীতিতে রাখছে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান।