
দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে সতর্ক সংকেত দেখা দিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত, ২৬টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে, যা রপ্তানি বৃদ্ধির গতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে, ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাজারগুলোতে এই নেতিবাচক প্রবণতা চ্যালেঞ্জের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
নন-ট্র্যাডিশনাল মার্কেটের পরিস্থিতি : নতুন বাজারের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, চিলি, ভারত, জাপান, কোরিয়া, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, রাশিয়া, তুরস্ক এবং অন্যান্য দেশে রপ্তানি কমেছে। তবে চীন, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেতিবাচক প্রবণতা : ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশ হলো- বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া, চেক, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, পর্তুগাল, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া এবং সুইডেন। এদিকে, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, লাটভিয়া, স্লোভেনিয়া এবং কিছু ছোট দেশগুলোতে সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেছে।
মার্কিন ও অন্যান্য বাজার : যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি সামান্য হ্রাস (-০.১০ শতাংশ) রেকর্ড করা হয়েছে, যা বড় বাজারের জন্য সতর্কবার্তা। কানাডা ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে তা মোট হ্রাসের চাপকে ভারসাম্য করতে যথেষ্ট নয়। উল্লেখ্য, শুধু ২৬টি দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কেনা কমায়নি, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫), রপ্তানি প্রত্যাশিত গতিতে বৃদ্ধি পায়নি।
রপ্তানি উন্নয়ন সংস্থা এবং বাংলাদেশ পোশাক ব্যবসায়ী সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৯,৩৬৫ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.৬৩ শতাংশ কম। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, ক্রেতাদের ব্যয় সংকোচন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দাম কমানোর চাপ, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘এটি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শ্রম বাজার এবং রপ্তানিকারকদের আয়, সবকিছুর ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাজার মন্দা : বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। জুলাই-ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ইইউতে রপ্তানি হয়েছে ৯,৪৫৯ মিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক। তবে আগের বছরের একই সময়ে তুলনায় রপ্তানি আয় ৪.১৪ শতাংশ কমেছে। বড় বাজারগুলোতে যেমন- জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও বেলজিয়ামে উল্লেখযোগ্য পতন লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে- জার্মানি : ২৪৬৮ থেকে ২১৮৭ মিলিয়ন (-১১.৪ শতাংশ), ফ্রান্স : ১০৯১ থেকে ৯৭২ মিলিয়ন (-১০.৮৯ শতাংশ), ডেনমার্ক : ৫৫৭ থেকে ৪৯৮ মিলিয়ন (-১০.৫৪ শতাংশ), বেলজিয়াম : ২৯৫ থেকে ২৬৮ মিলিয়ন (-৯.২২ শতাংশ)। তবে সব দেশে পতন হয়নি। কিছু বাজারে উল্টো বাড়তি রপ্তানিও দেখা গেছে। যেমন- স্পেন : ১৬৯৯ থেকে ১৮০৪ মিলিয়ন (+৬.১৮ শতাংশ), নেদারল্যান্ডস : ১০৫৭ থেকে ১০৭৭ মিলিয়ন (+১.৮৫ শতাংশ), পোল্যান্ড : ৭৯০ থেকে ৮৬৪ মিলিয়ন (+৯.৪৩ শতাংশ)।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বড় বাজারে ক্রেতারা সংবেদনশীল। অর্ডার দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু দাম কমানোর চাপও আছে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ইউরোপীয় বাজারে সতর্কতা অবলম্বন এখন অত্যন্ত জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে পার্থক্যপূর্ণ চিত্র : যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার। জুলাই-ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে রপ্তানি হয়েছে ৩,৮৩৯ মিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির প্রায় ১৯.৮২ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি প্রায় নেই, মাত্র ০.১০ শতাংশ কম। নিট পোশাকে সামান্য বৃদ্ধি থাকলেও বোনা পোশাকে হ্রাসের কারণে মোট রপ্তানি আয় সামান্য কমেছে।
অন্যান্য বাজারের চিত্র : কানাডা : ৬৭১ মিলিয়ন (+৪.৬৬ শতাংশ), যুক্তরাজ্য : ২,২১২ মিলিয়ন (+২.১৩ শতাংশ)। এই বাজারগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক এবং স্থিতিশীল চাহিদা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক সংকেত।
অপ্রচলিত বাজার, মিলিত ধাক্কা : নতুন বাজার বা অপ্রচলিত বাজার বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই বাজারগুলোতে চাহিদা বেশি ভিন্ন এবং ক্রেতাদের মনোভাব অনিশ্চিত। জুলাই-ডিসেম্বরে রপ্তানি হয়েছে ৩,১৮৫ মিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ১৬.৪৫ শতাংশ। তবে আগের বছরের তুলনায় কমেছে ৫.৫২ শতাংশ। প্রধান পতনশীল দেশগুলো- রাশিয়া : ১৪৯ থেকে ১০৯ মিলিয়ন (-২৬.৬৩ শতাংশ), তুরস্ক : ২২৩ থেকে ১৬৫ মিলিয়ন (-২৫.৮০ শতাংশ), মেক্সিকো : ১৮৪ থেকে ১৫০ মিলিয়ন (-১৮.৬৬ শতাংশ), কোরিয়া : ২৩১ থেকে ২০১ মিলিয়ন (-১২.৮৪ শতাংশ), ভারত : ৩৭৬ থেকে ৩৩৭ মিলিয়ন (-১০.৪৪ শতাংশ)।
ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে চীন : ১১২ থেকে ১৪৬ মিলিয়ন (+২৯.৭৯ শতাংশ), সৌদি আরব : ৮৩ থেকে ১০২ মিলিয়ন (+২২.৮৪ শতাংশ), সংযুক্ত আরব আমিরাত : ১২৪ থেকে ১৪০ মিলিয়ন (+১২.৮৯ শতাংশ), মালয়েশিয়া : ৯৭ থেকে ১০৯ মিলিয়ন (+১২.১৯ শতাংশ), দক্ষিণ আফ্রিকা : ৫৭ থেকে ৬২ মিলিয়ন (+৬.৯৭ শতাংশ), এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, বাজার বহুমুখীকরণ ছাড়া স্থিতিশীল রপ্তানি প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।
পণ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ : বাংলাদেশের তৈরি পোশাক দুই ভাগে বিভক্ত : নিট ও বোনা। নিট পোশাক : ১০,৮৮৮ থেকে ১০,৪৮৮ মিলিয়ন (-৩.২২ শতাংশ), বোনা পোশাক : ৯,০৫০ থেকে ৮,৮৭৭ মিলিয়ন (-১.৯১ শতাংশ)। মোট রপ্তানি : ১৯,৮৮৮ থেকে ১৯,৩৬৫ মিলিয়ন (-২.৬৩ শতাংশ) বিশেষ করে ইউরোপীয় বাজারে নিট পণ্যের অর্ডার কমে যাওয়ায় সামগ্রিক রপ্তানি আয় নেতিবাচক ধারায় পড়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য : বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল মালিক সমিতি (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কহার সারা বিশ্বের রপ্তানি বাজারকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও, যেখানে আমাদের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে ধাক্কা খাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভারত ও চীনসহ যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্কের কারণে ওই বাজারে রপ্তানি করতে পারছে না, তারা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে অর্ডার নেওয়ার জন্য মূল?্য কমিয়ে প্রতিযোগিতা করছে। ফলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা একই ধরনের পণ্যের অর্ডার নিতে পারছেন না। তবে ভারত সরকার তাদের ব্যবসায়ীদের জন্য বিভিন্ন প্যাকেজ সহায়তা দিচ্ছে। সম্প্রতি তারা ৭ হাজার কোটি রুপির নতুন সহায়তা অনুমোদন করেছে।’
হাতেম যোগ করেন, ‘অন্যদিকে আমাদের সরকার আইএমএফ কর্মসূচি ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের যুক্তি দেখিয়ে রপ্তানিখাতের নগদ সহায়তা এবং অন্যান্য সুবিধা প্রত্যাহার করেছে। যে সামান্য সহায়তা অবশিষ্ট ছিল, তার মেয়াদও ডিসেম্বরে শেষ হয়ে গেছে। আমরা এরইমধ্যে সরকারকে নবায়নের জন্য অনুরোধ জানিয়েছি, যা রপ্তানিকারকদের টিকে থাকতে সহায়তা করবে। না হলে স্পিনিং মিল বন্ধ এবং একের পর এক গার্মেন্টস বন্ধ হওয়া রপ্তানি খাতের জন্য মারাত্মক সংকেত।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের আগে রপ্তানি আদেশ কিছুটা কমে যায়, এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে নির্বাচনের পর সরকার যদি শিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আগামী জুন থেকে রপ্তানি আবার ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে।’ বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘বিশ্ববাজারে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে সাময়িকভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি মন্দা দেখা দিয়েছে। তবে বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং নতুন বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাজারে চাহিদা বাড়াতে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রপ্তানিখাতের জন্য সরবরাহ চেইন, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনশীল চাহিদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে সচেতন হয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’ একজন পোশাক ব্যবসায়ী বলেন, ‘বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। ক্রেতারা অর্ডার দিচ্ছেন, তবে দাম কমানোর চাপও আছে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কিছু বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যদি তা ধরে রাখা যায়, ধীরে ধীরে পরিস্থিতি ভালো হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রপ্তানি উন্নয়নে সবচেয়ে জরুরি হলো দক্ষতা বৃদ্ধি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার বহুমুখীকরণ। এক বা দুই বাজারের ওপর নির্ভরশীল হলে বিপদ তৈরি হতে পারে। নতুন বাজার ও উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যের দিকে মনোযোগ দিলে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব।’